নানান জটিলতায় চলতি বছরের রিটার্ন জমায় ধীর গতি দেখা গেছে। তিন দফা সময় বাড়ানোর পরও রিটার্ন জমা পড়েছে প্রায় ৪৪ লাখ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও করদাতাদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে। দেশে রিটার্নধারীর সংখ্যা ১ কোটি ২০ লাখের ও বেশি।
আয়কর আইন অনুযায়ী, প্রতি বছরের ৩০ নভেম্বর ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার শেষ দিন। এরপর রিটার্ন জমা দিলে একজন করদাতাকে গুনতে হয় জরিমানা। সেই সঙ্গে বিনিয়োগে রেয়াতের সুবিধাও পান না। কম হারে কর দেওয়ার সুযোগও থাকে না। করমুক্ত আয়ের সুবিধাও হারাতে হয়।
তবে নির্বাচন, রোজাসহ বিভিন্ন কারণে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমার পরিমাণ খুবই কম হওয়ায় এরই মধ্যে তিন দফায় রিটার্ন জমার সময় বাড়ায় এনবিআর। আগামী ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেওয়া যাবে রিটার্ন।
জানা যায়, অনলাইনে রিটার্ন জমা পড়েছে প্রায় ৪১ লাখ। অফলাইনে রিটার্ন জমা দিয়েছেন প্রায় তিন লাখ করদাতা। সে হিসাবে এখনো প্রায় ৮০ লাখ করদাতা রিটার্ন জমা দেননি। গত বছর মোট রিটার্ন জমা পড়েছিল ৪৫ লাখ। ওই সময়েও তিন দফা সময় বাড়িয়ে ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের রিটার্ন দাখিলের সময় ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত করা হয়েছিল।
জানতে চাইলে এনবিআরে জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আল আমিন শেখ বলেন, ২০২৫-২০২৬ করবর্ষের জন্য কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া সব ব্যক্তি শ্রেণির করদাতা কর্তৃক অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করেছে। এরই মধ্যে আয়কর রিটার্ন দাখিলের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ই-রিটার্ন সিস্টেমে প্রায় ৫০ লাখ ব্যক্তি শ্রেণির করদাতা নিবন্ধন করেছেন এবং প্রায় ৪১ লাখ করদাতা রিটার্ন দাখিল করেছেন।
একাধিক করদাতা জানিয়েছেন অনলাইন জটিলতায় রিটার্ন জমা দিতে সমস্যা হচ্ছে। ই-রিটার্ন সার্ভারে করদাতার নিবন্ধন ও লগ ইনে ঝামেলা, মোবাইল ফোনে ওটিপি পেতে দেরি, আগের বছরের রিটার্ন আপলোড না হওয়া, একই তথ্য একাধিক জায়গায় ইনপুটের বিড়ম্বনা রয়েছে।
এছাড়া দুর্বল ই-রিটার্ন সার্ভার ও অনলাইন রিটার্ন সিস্টেমে অনভ্যস্ততা রয়েছে।
একটি বেসরকারি ট্রাভেল কোম্পানিতে চাকরি করেন শিহাবউদ্দিন। তিনি বলেন, সার্ভার লোড করেছে। তথ্য দিতে দেরি হয়েছে। ই-রিটার্ন সার্ভারে নিবন্ধন নিতে করদাতার বায়োমেট্রিক করা মোবাইল নম্বর দরকার হয়। সার্ভারের দুর্বলতার কারণে অনেক সময়ই এই সার্ভারে ঠিকমতো প্রবেশ করা যায়নি।
তিনি আরও বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মোবাইল নম্বরে ওটিপি আসার কথা থাকলেও, তা আসছে দেরিতে। তখন আবার নতুন করে প্রক্রিয়া শুরু করতে হয়।
মো. রফিকুল ইসলাম নামের আরেক চাকরিজীবী বলেন, পুরোনো করদাতার ক্ষেত্রে আগের তথ্যাদি সাবমিট করতে হচ্ছে। তবে সিস্টেমে আগের বছরে কাগুজে রিটার্ন জমা দিলেও আইডিতে তথ্য আপলোড করা হয়নি। কাগজ সংগ্রহ করতে সংশ্লিষ্ট কর অঞ্চলে যেতে হচ্ছে।
কর দাতারা জানান, নতুন-পুরোনো করদাতা-নির্বিশেষে তার সঞ্চয়পত্র, এফডিআর বা ডিপিএস থাকলে সেই তথ্য উল্লেখ করতে হচ্ছে পৃথক পৃথক চারটি জায়গায়। এসব বিনিয়োগ একজন করদাতার জন্য সম্পদ। যেমন- একজন করদাতা যদি সঞ্চয়পত্র কিনে থাকেন তিনি সম্পদ ও দায় সেকশনে গিয়ে ‘আর্থিক পরিসম্পদ’ ঘরটি নির্বাচন করবেন। সেখানে সঞ্চয়পত্রের নাম, ক্রয়ের তারিখ, ক্রয়মূল্য, প্রাপ্ত সুদ ও কেটে নেওয়া করের পরিমাণ উল্লেখ করছেন। যদিও একই তথ্য আবার সম্পদ বিবরণীর ‘বিনিয়োগ’ কলামে দেখাতে হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এসব বিনিয়োগ থাকলে আমানতকারী তার আমানতের বিপরীতে একটি অঙ্ক মুনাফা পাচ্ছেন। এই মুনাফার টাকা তার বিগত বছরের আয় হিসেবে বিবেচিত। তাই আয়ের ঘরে এই মুনাফার টাকা উল্লেখ করতে হচ্ছে। এসব মুনাফার বিপরীতে একটি নির্দিষ্ট অংশ ব্যাংক উৎসে কর হিসেবে আগেই কেটে নিয়েছে। সেই টাকার পরিমাণ কত, তা আলাদাভাবে আবার উল্লেখ করতে হবে, যেন উৎসে করের পরিমাণ প্রদেয় করের সঙ্গে সমন্বয় করা যায়। একই তথ্য বারবার বিভিন্ন কলামে বসানোর বিষয়টি বেশির ভাগ করদাতার জন্য খুবই কঠিন। এজন্য রিটার্ন জমা দিতে দেরি হচ্ছে। অনেকেই বারবার ‘রিভার্স রিটার্ন’ করছেন। সাধারণত রিটার্ন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে করদাতা কোনো ভুল করলেই তাকে রিভার্স রিটার্ন দিতে হয়।
জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, যেখানে যেখানে করদাতা সমস্যায় পড়ছেন আমাদের জানাচ্ছেন। আমরা সমাধানের উদ্যোগ নিচ্ছি। পর্যায়ক্রমে ই-রিটার্নের সমস্যাগুলো কমে আসছে। এছাড়া আমাদের হেল্প ডেস্ক থেকে সব সময়ই করদাতাদের সেবা দেওয়া হচ্ছে।
এসএম/এমআরএম