ঢালিউডে নারীদের উপস্থিতি দীর্ঘদিন ধরেই মূলত অভিনয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো গ্ল্যামার, নাচ-গান আর পর্দার আলোয়। কিন্তু ইতিহাস বলছে, এই ইন্ডাস্ট্রির ভিত গড়ার কাজেও নারীরা পিছিয়ে ছিলেন না। বরং প্রতিকূল সময়েই সাহসিকতার সঙ্গে নেতৃত্ব দিয়েছেন তারা। সেই পথচলার শুরুটা হয়েছিল রেবেকার হাত ধরে।তিনি ছিলেন সেই সত্তর দশকে ঢাকাই সিনেমার প্রথম নারী নির্মাতা ও প্রযোজক। ধারাবাহিকতার স্রোত ধরে আজ সেই ধারা নতুন করে প্রাণ পাচ্ছে শিরিন সুলতানা ও শেহরিন সুমিদের মতো নারী প্রযোজকদের মাধ্যমে।দেশের প্রথম নারী চলচ্চিত্র নির্মাতা ও প্রযোজক
১৯৭০ সালে রেবেকা নিজের পরিচালনা ও প্রযোজনায় নির্মাণ করেন ‘বিন্দু থেকে বৃত্ত’ সিনেমা। সেটি শুধু একটি চলচ্চিত্রই নয় বরং যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিলো। কারণ সেই সময়ে নারীদের জন্য ঘরের বাইরে কাজ করাই ছিল চ্যালেঞ্জিং। সেখানে দাঁড়িয়ে একটি চলচ্চিত্র পরিচালনা ও প্রযোজনার মতো দুটি জটিল দায়িত্বই নিজ হাতে তুলে নিয়েছিলেন তিনি।সুচন্দা-শাবানারাও প্রযোজনায় সাফল্য পেয়েছেন
এরপর কালে কালে সুচন্দা, শাবানা, রোজিনা, নার্গিস আকতারসহ আরও অনেক নারীই প্রযোজনার ব্যবসায় নাম লিখিয়েছিলেন। তবে তাদের প্রায় সবাই ছিলেন কেউ নির্মাতা বা নায়িকা। সেখানে ব্যতিক্রম এই প্রজন্মের শিরিন ও সুমি। তারা কেবল প্রযোজক হিসেবেই পর্দার আড়ালে থেকে সিনেমায় লগ্নি করে যাচ্ছেন।
প্রযোজনার মতো ঝুঁকিপূর্ণ ও জটিল জায়গায় পা রেখে নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছেন দুই নারী শেহরিন সুমি ও শিরিন সুলতানা।
চলচ্চিত্র প্রযোজনা কখনোই সহজ কাজ নয়। বিনিয়োগ, পরিকল্পনা, বাজার বিশ্লেষণ, সব মিলিয়ে এটি এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। আর সেই জায়গাটিতেই বরাবরই নারীদের উপস্থিতি ছিল সীমিত। তবে সেই চেনা চিত্র বদলে দিচ্ছেন সুমি ও শিরিন।
প্রথমবারের মতো প্রযোজনায় নাম লিখিয়ে আলোচনায় এসেছেন শিরিন সুলতানা। তার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘ক্রিয়েটিভ ল্যান্ড’-এর ব্যানারে নির্মিত হয়েছে এবারের ঈদের অন্যতম বড় বাজেট ও হাই-প্রোফাইল সিনেমা ‘প্রিন্স: ওয়ানস আপন আ টাইম ইন ঢাকা’।শিরিন সুলতানা
ছবিটির নির্মাতা আবু হায়াত মাহমুদ। এতে নায়ক হিসেবে আছেন ঢালিউডের শীর্ষ তারকা শাকিব খান, তার নামেই আজকের বাণিজ্যিক বাংলা সিনেমার বড় অংশ চিহ্নিত হয়। প্রথম সিনেমাতেই এমন বড় ক্যানভাসে কাজ করে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন শিরিন সুলতানা। এখন অপেক্ষা বক্স অফিসের ফলাফলের।নায়ক ও নির্মাতার সঙ্গে শিরিন সুলতানা
অন্যদিকে প্রযোজক হিসেবে ইতোমধ্যেই নিজের অবস্থান জানান দিয়েছেন শেহরিন সুমি। শিরিন সুলতানার মতো তিনিও প্রথম সিনেমাতেই শাকিব খানকে নিয়ে বাজি ধরেছিলেন। তার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘রিয়েল এনার্জি’-এর ব্যানারে গত ঈদে মুক্তি পাওয়া ‘বরবাদ’ সিনেমাটি বক্স অফিসে ব্যাপক সাফল্য পায়। প্রথম ছবিতেই ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি প্রশংসাও কুড়িয়েছেন তিনি।
এবার ঈদে তিনি নিয়ে এসেছেন নতুন সিনেমা ‘রাক্ষস’। তবে এবার তিনি ভিন্ন পথে হাঁটলেন। শাকিব খানের পরিবর্তে বাজি ধরেছেন তরুণ অভিনেতা সিয়াম আহমেদের ওপর। সিনেমাটি নিয়েও ইতোমধ্যে দর্শকদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।শেহরিন সুমি
হল সংকট, বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা, পেশাদারিত্বের ঘাটতি নিয়ে ঢালিউড যখন নানা সংকটে জর্জরিত ঠিক তখনই এই দুই নারী প্রযোজকের সাহসী পদক্ষেপ আলাদা করে চোখে পড়ার মতো। তারা শুধু সিনেমা নির্মাণই করছেন না, বরং বড় বাজেট, পরিকল্পনা ও নতুন ভাবনার মাধ্যমে ইন্ডাস্ট্রিকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
এই দুই উদাহরণ প্রমাণ করে, নারীরা কেবল পর্দার সামনে সীমাবদ্ধ নন। সুযোগ ও সাহস পেলে প্রযোজনার মতো কঠিন দায়িত্বও দক্ষতার সঙ্গে সামলাতে পারেন তারা।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়তো আরও অনেক নারী এগিয়ে আসবেন এই অঙ্গনে। আর সেই পথচলায় অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবেন শিরিন সুলতানা ও শেহরিন সুমি। তারা দেখিয়ে দিচ্ছেন, নারীরাও পারে এবং তারা পারছেনও।
এলআইএ