আন্তর্জাতিক

ইরানের হামলায় তছনছ ইসরায়েল, প্রশ্নের মুখে ‘নিশ্ছিদ্র’ প্রতিরক্ষা

দক্ষিণ ইসরায়েলের দিমোনা শহর থেকে মাত্র আট মাইল দূরে অবস্থিত দেশটির প্রধান পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র ও রিয়্যাক্টর। ইসরায়েলের অন্যতম সুরক্ষিত এই অঞ্চলের আকাশসীমায় ফাটল ধরিয়ে আছড়ে পড়েছে ইরানের দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। দিমোনা এবং নিকটবর্তী আরাদ শহরের আবাসিক এলাকায় এই ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে দম্ভ চূর্ণ হয়েছে ইসরায়েলের বহুল আলোচিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার।

শনিবার (২১ মার্চ) রাতের এই হামলায় অন্তত ১৭৫ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১০ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী স্বীকার করেছে, তারা ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ঠেকানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সফল হয়নি। প্রায় তিন ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি আঘাত আসার পর প্রশ্ন উঠেছে—বিশ্বের অন্যতম সেরা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কি তবে ব্যর্থ হতে শুরু করেছে?

ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী বর্তমানে এই ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান করছে। সাবেক এয়ার ডিফেন্স কমান্ডার র্যান কোচভ বলেন, ‘দিমোনা ইসরায়েলি ও মার্কিন—উভয় স্তরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে সুরক্ষিত। কিন্তু কোনো কিছুই শতভাগ নিখুঁত নয়। এটি একটি বড় ধরনের অপারেশনাল ব্যর্থতা।’

মজুত ফুরিয়ে আসছে?

বিশ্লেষকদের মতে, এই ব্যর্থতার পেছনে কারিগরি ত্রুটির চেয়েও বড় কারণ হতে পারে ‘ক্ষেপণাস্ত্র সংকট’। গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের পর গুঞ্জন উঠেছিল যে ইসরায়েলের উন্নত ইন্টারসেপ্টর বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধক ব্যবস্থার মজুত ফুরিয়ে আসছে। একটি ‘অ্যারো-৩’ ইন্টারসেপ্টর তৈরি করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। সামরিক সেন্সরশিপের কড়াকড়ি থাকলেও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, দিমোনা ও আরাদে আঘাত হানা ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর বিরুদ্ধে অ্যারো-৩ ব্যবহার করা হয়নি।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ডিরেক্টর জেনারেল আমির বারাম সম্প্রতি ওয়াশিংটন সফর করেছেন আরও ইন্টারসেপ্টর ও অস্ত্রশস্ত্রের খোঁজে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইসরায়েলকে এখন প্রতিটি ইন্টারসেপ্টর ব্যবহারের আগে ‘আগামীকালের যুদ্ধের’ কথা ভাবতে হচ্ছে।

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষার বিভিন্ন স্তর

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র কয়েক দশক ধরে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে এই ব্যবস্থার পেছনে।ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষার প্রধান স্তরগুলোর মধ্য রয়েছে

আয়রন ডোম: মূলত হামাসের স্বল্পপাল্লার রকেটের জন্য।ডেভিড’স স্লিং: মধ্যপাল্লার রকেট ও ক্রুজ মিসাইলের জন্য।অ্যারো-৩: বায়ুমণ্ডলের বাইরে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার জন্য সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তি।থাড: যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া উচ্চ উচ্চতার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।

কেন ঠেকানো যাচ্ছে না ‘ক্লাস্টার মিসাইল’?

ইরান বর্তমানে এমন কিছু ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে যা বায়ুমণ্ডলের কয়েক মাইল ওপরে ভেঙে গিয়ে কয়েক ডজন ছোট বোমা বা ‘ক্লাস্টার মিসাইলে’ পরিণত হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এগুলোকে বায়ুমণ্ডলের ওপরে ধ্বংস না করতে পারলে নিচে নেমে আসার পর ঠেকানো প্রায় অসম্ভব। এছাড়া কিছু ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র পথ পরিবর্তনের ক্ষমতাও রাখে, যা ইন্টারসেপ্টরের হিসাব ওলটপালট করে দিচ্ছে।

আতঙ্কে ইসরায়েলিরা

দিমোনা শহরের ৬২ বছর বয়সী বাসিন্দা আইজাক সালেম বলেন, ‘ক্ষেপণাস্ত্রটি যখন আঘাত হানলো, মনে হলো ভূমিকম্প আর ঘূর্ণিঝড় একসঙ্গে শুরু হয়েছে।’

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে একে একটি ‘অলৌকিক ঘটনা’ বলে অভিহিত করেছেন যে, কেউ নিহত হয়নি। তবে তিনি নাগরিকদের সতর্ক করে বলেছেন, ‘আত্মতুষ্টিতে ভুগবেন না, সতর্ক সংকেত পাওয়ামাত্রই আশ্রয়কেন্দ্রে যান।’

ইসরায়েলের দাবি, ইরান গত তিন সপ্তাহে প্রায় ৪০০ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে, যার মধ্যে মাত্র চারটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে সরাসরি আঘাত হানতে পেরেছে। কিন্তু এই চারটি আঘাতই ইসরায়েলের সামরিক কৌশলবিদদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ইসরায়েল তার আকাশ কতটা সুরক্ষিত রাখতে পারবে, তা নিয়ে এখন বড় ধরনের সংশয় দেখা দিয়েছে।

সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকেএএ/