বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলের প্রাণ প্রকৃতি ও জীববৈচিত্রের অন্যতম উৎস কুমার নদকে বাঁচাতে দরকার মাত্র আড়াই কিলোমিটার খনন। মাত্র আড়াই কিলোমিটার নদ খননে আটকে আছে প্রায় আড়াইশো কিলোমিটার কুমারের হৃৎস্পন্দন। এমনকি উৎসমুখের নদ খননের অভাবে ভেস্তে যেতে বসেছে সর্বশেষ সরকারি বড় পরিকল্পনাও।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কুমার নদের যৌবন ফেরাতে ২০১৬ সালে ২৫০ কোটি ৮১ লাখ টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পতে নদে গোসলের জন্য ঘাট নির্মাণ, নদী তীর সংরক্ষণ ও সৌন্দর্য বর্ধনসহ কুমার নদ পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এছাড়াও সেই প্রকল্পে নদের বিভিন্ন জায়গা অবৈধ দখলমুক্ত করা, বাসাবাড়ি-বাজারঘাট, দোকান-পাঠ, কলকারখানা থেকে নানা উপায়ে নদীকে দূষণের হাত থেকে রক্ষা করার বিষয়টিও ছিল। এতে কুমার নদটির ৭১ কিলোমিটার অংশ পুনঃখনন প্রকল্পের মাধ্যমে ১০ কোটি ঘনমিটার পানি প্রবাহ নিশ্চিত করে ২৩ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আড়াইশো কোটি টাকা খরচ করার পরও দখল দূষণ আর নাব্যতা সংকটে যৌবন ফেরেনি কুমারের। এতো টাকা খরচের পরও আসেনি কাঙ্ক্ষিত সুফল।
খননের পর কিছু কিছু এলাকায় নদে সামান্য পানি থাকে, যা চাহিদার তুলনায় খুবই কম। এছাড়া ময়লা আবর্জনা ও অবৈধ দখলে অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে কুমার নদ। যার কারণে কোনো সুফল পাচ্ছে না এলাকাবাসী।
খালটি পুনঃখননের টেন্ডার পায় খুলনা শিপইয়ার্ড কোম্পানি। কোম্পানির কাছ থেকে কাজটি সাব-কন্ট্রাক্টর হিসেবে বাস্তবায়ন করে বেঙ্গল গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ফিউচার ইনফ্রাস্ট্রাকচার। ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করা হয়। নদটি পুনঃখনন ছাড়াও গোসলের জন্য বিভিন্ন স্থানে ৬১টি পাকা ঘাট নির্মাণ ও নদীর পাড় পাকা করে বিনোদন কেন্দ্র করার কথা ছিল।
এদিকে নদ পুনঃখনন প্রকল্পের সিংহভাগ খনন কাজ সম্পন্ন হলেও তৎকালীন প্রভাবশালীদের বাধার মুখে পড়তে হয়। ফলে ফরিদপুর শহর সংলগ্ন প্রায় পাঁচ কিলোমিটার জায়গার খনন এবং উৎসমুখের আড়াই কিলোমিটার খনন করা সম্ভব হয়নি। এক পর্যায়ে ওই অংশে খনন ছাড়াই শেষ করা হয় প্রকল্পের কাজ। পুরো কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় বিনোদন কেন্দ্রগুলোর নির্মাণ কাজও করা হয়নি।
দেখা যায়, ফরিদপুর শহর সংলগ্ন এলাকায় প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এলাকা খনন করা যায়নি। তৎকালীন প্রভাবশালী ব্যক্তিরা তাদের নিজ প্রয়োজনে খনন কাজে বাধাগ্রস্ত করে। তবে খনন কাজে বাধা-বিঘ্ন সৃষ্টিকারী ব্যক্তিরা বর্তমানে আত্মগোপনে। এছাড়াও ফরিদপুর শহরের স্লুইচগেট এলাকায় মদনখালী রেগুলেটর থেকে সিএনবি ঘাট সংলগ্ন পর্যন্ত আড়াই কিলোমিটার স্থানে নদী নেই বললেই চলে। এখানে বর্তমানে রয়েছে সরু একটি খাল। সিএনবি ঘাট সংলগ্ন এলাকায় কুমার নদের উৎসমুখ পদ্মার সঙ্গে মিশেছে। এখন পুরো আড়াই কিলোমিটার জুড়েই বালুতে ভরে আছে। নদ খনন প্রকল্প চলাকালে জায়গাটি খনন করতে বাধা দেয় স্থানীয় জমির মালিক, ইট ভাটার মালিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও। নদীর জায়গায় তাদের মালিকানা দাবি করে তারা মামলা মোকদ্দমা করে নদী খনন প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত এবং বাধাগ্রস্ত করে।
ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, ফরিদপুর শহর ও এর আশপাশে কমপক্ষে ১২ কিলোমিটারের মধ্যে অবৈধ স্থাপনার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এ অংশে এক হাজারের অধিক পাকা, কাঁচা ও আধাপাকা স্থাপনা নদীর সীমানার মধ্যে অবৈধভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। এসব স্থাপনা অপসারণে ইতিপূর্বে নোটিশ করা হলেও কাজের কাজ হয়নি কিছুই। প্রয়োজনীয় কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি তৎকালীন প্রশাসন।
পরিবেশবাদী সংগঠন বিডি ক্লিন ফরিদপুর সদর উপজেলার সহ-সমন্বয়ক সুমাইয়া জাহান বলেন, নদ দখলের ব্যাপারে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করার পাশাপাশি শহরের প্রধান বাজারের পাশে ময়লা ফেলে নদী ভরাট করা হচ্ছে, তা বন্ধ করতে হবে। কুমার নদ না বাঁচলে ফরিদপুর শহর হবে মৃত শহর, ফরিদপুর অঞ্চল হয়ে পড়বে কৃষির অনুপযোগী।
লেখক ও গবেষক মফিজ ইমাম মিলন বলেন, ফরিদপুর নদীবেষ্টিত জেলা হিসেবে খ্যাত ছিল। পদ্মা, কুমার, আড়িয়াল খাঁ, ভুবেনেশ্বর এ সকল নদীর প্রবাহে এ অঞ্চল ছিল উর্বর ও প্রাণবন্ত। সব নদীগুলোতে ছিল যোগাযোগ চাষাবাদ ও জীবনধারার মূল ভিত্তি। পদ্মা এখন আর যেমন আগ্রাসী নয়, শুকিয়ে মরা পদ্মা নাম নিয়েছে। তেমনিভাবে খরস্রোতা কুমার নদ এখন চিকন খালে পরিণত হয়েছে।
এ ব্যাপারে ফরিদপুর পৌরসভার কনজারভেন্সি ইন্সপেক্টর বিকাশ দত্ত বলেন, আমরা বাজার সংলগ্ন পাকা সড়কে ময়লা স্তূপ করে রাখার জন্য ব্যবসায়ীদের অনুরোধ করেছি। বাজার সমিতিগুলো তাদের কমিটির মাধ্যমে সেই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করার কথা। কিন্তু আমরা স্পটগুলোতে ময়লা পাই না। প্রতিদিন সকালে বাজার এলাকা থেকে মাত্র এক ট্রাক ময়লা আমরা নিয়ে আসি। বাকি সব নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। এটা প্রতিরোধ করার জন্য স্থানীয়দের সতর্ক হতে হবে।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিব হোসেন বলেন, ইতিপূর্বে নদ খনন প্রকল্পের যে নকশা প্রণয়ন করা হয়েছে সেটি পর্যবেক্ষণে একটি তদন্ত দল সুপারিশ প্রণয়ন করে। সেই প্রতিবেদনে নদীর দুই পাড়ের চাপ কমানোর নির্দেশনা রয়েছে। সে অনুযায়ী নদীর দুই পাড়ের অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করা হয়েছে। সেই তালিকা জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরে রয়েছে। আমরা কুমার নদকে দখল ও দূষণমুক্ত করতে চাই। আমরা সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এসব স্থাপনা সরিয়ে নেয়ার জন্য মালিকদের অনুরোধ জানাবো। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাদের স্থাপনা সরিয়ে না নিলে উচ্ছেদ করা হবে।
তিনি বলেন, অনেকগুলো কম্পোনেন্টে কাজ হওয়ার কথা ছিল। খনন, নদীর তীর সংরক্ষণ, সৌন্দর্য বর্ধন, পাকা ঘাট নির্মাণ ও তীর সংরক্ষণের কাজটি আমরা সম্পন্ন করেছি। শহর অংশে স্থানীয়দের বাধার মুখে পাঁচ কিলোমিটার স্থানে খননের কাজ এবং উৎসমুখে আড়াই কিলোমিটার অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশে খননের কাজ করা যায়নি। জানতে পেরেছি, তখন খনন কাজে বাধা দিয়েছিল স্থানীয় ক্ষমতাশালীরা।
তিনি আরও বলেন, কুমার নদের উৎস মুখে আটকে পড়া ওই আড়াই কিলোমিটারের প্রস্তাবনা গত সপ্তাহে আমরা চিঠির মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। অনুমোদন পেলে ঈদের পর সম্প্রতি শুরু হওয়া সরকারের খাল খানন কর্মসূচির আওতায় দীর্ঘদিনের আটকে থাকা এই বাধা দূর করা সম্ভব হবে।
এফএ/জেআইএম