নীরব অথচ দীর্ঘস্থায়ী এক হুমকির নাম যক্ষ্মা। এখনো বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও এই সংক্রামক রোগটি জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ কাশি ভেবে অবহেলা করা হয়, আবার সামাজিক কুসংস্কার ও অজ্ঞতার কারণে রোগটি লুকিয়েও রাখা হয়, ফলে সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়ে। অথচ সময়মতো শনাক্ত করা গেলে এবং নিয়ম মেনে চিকিৎসা নিলে যক্ষ্মা পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য।
যক্ষ্মার লক্ষণ, ঝুঁকি, চিকিৎসা এবং প্রতিরোধ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। এই প্রেক্ষাপটে যক্ষ্মা নিয়ে বিস্তারিত জানতে কথা বলেছি মুন্সীগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের কনসালটেন্ট ও বিভাগীয় প্রধান ডা. মো. সাঈদ হোসেনের সঙ্গে। তার অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ থেকেই উঠে এসেছে যক্ষ্মা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ নানা তথ্য ও দিকনির্দেশনা।
ছবি: ডা. মো. সাঈদ হোসেন
জাগো নিউজ: যক্ষ্মা রোগ আসলে কী এবং এটি কীভাবে শরীরে সংক্রমিত হয়?ডা. মো. সাঈদ হোসেন: যক্ষ্মা একটি সংক্রামক ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ, যার প্রধান কারণ মাইকোব্যাকটেরিয়াম টিউবারকিউলোসিস নামক জীবাণু। এটি মূলত বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তি যখন কাশি, হাঁচি বা কথা বলেন, তখন তার শরীর থেকে জীবাণুমুক্ত ক্ষুদ্র কণিকা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। সুস্থ ব্যক্তি সেই বাতাসে শ্বাস নিলে জীবাণু তার ফুসফুসে প্রবেশ করে সংক্রমণ ঘটাতে পারে।
জাগো নিউজ: বর্তমানে বাংলাদেশে যক্ষ্মা পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগজনক?ডা. মো. সাঈদ হোসেন: বাংলাদেশ এখনো যক্ষ্মা-প্রবণ দেশের তালিকায় রয়েছে। প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হন। তবে আশার কথা হলো সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে এখন রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা অনেক উন্নত হয়েছে। সচেতনতা বাড়লে পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
জাগো নিউজ: যক্ষ্মার প্রাথমিক লক্ষণগুলো কী কী?ডা. মো. সাঈদ হোসেন: যক্ষ্মার প্রাথমিক লক্ষণগুলো অনেক সময় সাধারণ ঠান্ডা-কাশির মতো মনে হয়। তবে কিছু লক্ষণ দীর্ঘদিন থাকলে সতর্ক হতে হবে টানা ২ সপ্তাহের বেশি কাশি, কফের সঙ্গে রক্ত আসা, জ্বর, বিশেষ করে বিকেলের দিকে, রাতের বেলা অতিরিক্ত ঘাম, অকারণে ওজন কমে যাওয়া, দুর্বলতা ও ক্ষুধামন্দা- এই লক্ষণগুলো থাকলে দ্রুত পরীক্ষা করা জরুরি।
জাগো নিউজ: অনেক সময় যক্ষ্মার লক্ষণ অন্য রোগের সঙ্গে মিল থাকে-এ ক্ষেত্রে পার্থক্য বোঝার উপায় কী?ডা. মো. সাঈদ হোসেন: এটি সত্য যে যক্ষ্মার লক্ষণ নিউমোনিয়া, ব্রংকাইটিস বা সাধারণ শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণের সঙ্গে মিলে যেতে পারে। তবে যক্ষ্মার ক্ষেত্রে লক্ষণগুলো দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং ধীরে ধীরে খারাপের দিকে যায়। সঠিকভাবে পার্থক্য বোঝার জন্য অবশ্যই কফ পরীক্ষা, এক্স-রে বা অন্যান্য ল্যাব টেস্ট প্রয়োজন।
ছবি: ডা. মো. সাঈদ হোসেন
জাগো নিউজ: যক্ষ্মা কি সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য? চিকিৎসা প্রক্রিয়া কতদিনের?ডা. মো. সাঈদ হোসেন: হ্যাঁ, যক্ষ্মা সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। সাধারণত ৬ মাসের নিয়মিত ওষুধ সেবনে রোগ ভালো হয়ে যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে, বিশেষ করে জটিল বা ড্রাগ-রেজিস্ট্যান্ট যক্ষ্মায় চিকিৎসার সময় ৯ মাস থেকে ২ বছর পর্যন্তও হতে পারে।
জাগো নিউজ: যক্ষ্মা রোগ নির্ণয়ের জন্য বর্তমানে কী কী আধুনিক পরীক্ষা-পদ্ধতি ব্যবহার হচ্ছে?ডা. মো. সাঈদ হোসেন: বর্তমানে যক্ষ্মা শনাক্তে বেশ কিছু আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহৃত হচ্ছে। যেমন- কফের মাইক্রোস্কোপি, জিনএক্সপার্ট পরীক্ষা, চেস্ট এক্স-রে, কালচার টেস্ট। এর মধ্যে জিনএক্সপার্ট দ্রুত ও নির্ভুল ফল দেয় এবং ড্রাগ-রেজিস্ট্যান্ট যক্ষ্মাও শনাক্ত করতে সক্ষম।
জাগো নিউজ: যক্ষ্মা রোগীদের ক্ষেত্রে ওষুধ নিয়মিত খাওয়া কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?ডা. মো. সাঈদ হোসেন: যক্ষ্মার ওষুধ নিয়মিত ও নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত খাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাঝপথে ওষুধ বন্ধ করলে জীবাণু সম্পূর্ণ ধ্বংস হয় না। এতে রোগ আবার ফিরে আসতে পারে এবং আরও মারাত্মক আকার নিতে পারে।
জাগো নিউজ: ড্রাগ-রেজিস্ট্যান্ট যক্ষ্মা কতটা ভয়াবহ এবং এটি কেন বাড়ছে?ডা. মো. সাঈদ হোসেন: ড্রাগ-রেজিস্ট্যান্ট যক্ষ্মা খুবই বিপজ্জনক, কারণ এতে সাধারণ ওষুধ কাজ করে না। এর চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি, ব্যয়বহুল এবং জটিল। মূলত রোগীরা নিয়মমাফিক ওষুধ না খাওয়া বা মাঝপথে বন্ধ করার কারণেই এই ধরনের যক্ষ্মা বাড়ছে।
জাগো নিউজ: যক্ষ্মা কি শুধু ফুসফুসে হয়, নাকি শরীরের অন্য অঙ্গেও হতে পারে?ডা. মো. সাঈদ হোসেন: যক্ষ্মা শুধু ফুসফুসেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি শরীরের অন্যান্য অঙ্গেও হতে পারে, যেমন- লিম্ফ নোড, হাঁড়, মস্তিষ্ক, কিডনি- এগুলোকে এক্সট্রা-পালমোনারি যক্ষ্মা বলা হয়।
জাগো নিউজ: শিশু ও বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে যক্ষ্মার ঝুঁকি কতটা বেশি?ডা. মো. সাঈদ হোসেন: শিশু ও বৃদ্ধদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক কম থাকে, তাই তারা সহজেই যক্ষ্মায় আক্রান্ত হতে পারেন। তাদের ক্ষেত্রে রোগ দ্রুত জটিল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও বেশি।
জাগো নিউজ: অপুষ্টি ও দরিদ্রতা কি যক্ষ্মা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়?ডা. মো. সাঈদ হোসেন: অবশ্যই। অপুষ্টি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, ফলে যক্ষ্মা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। একই সঙ্গে দরিদ্রতা, ঘিঞ্জি পরিবেশ ও অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবাও এই রোগ বিস্তারে ভূমিকা রাখে।
জাগো নিউজ: যক্ষ্মা রোগীর সঙ্গে বসবাস করলে পরিবারের সদস্যদের কী সতর্কতা নেওয়া উচিত?ডা. মো. সাঈদ হোসেন: রোগীকে আলাদা কক্ষে রাখা, কাশি বা হাঁচির সময় মুখ ঢেকে রাখা, ঘরে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস নিশ্চিত করা, পরিবারের সদস্যদের পরীক্ষা করানো- এসব সতর্কতা মানলে সংক্রমণ ঝুঁকি কমানো যায়।
জাগো নিউজ: যক্ষ্মা প্রতিরোধে টিকাদান কতটা কার্যকর?ডা. মো. সাঈদ হোসেন: শিশুদের জন্য বিসিজি টিকা যক্ষ্মার গুরুতর রূপ থেকে সুরক্ষা দেয়। তবে এটি শতভাগ প্রতিরোধ করতে পারে না। তাই সচেতনতা ও সতর্কতাই প্রধান ভরসা।
জাগো নিউজ: যক্ষ্মা রোগ নিয়ে সামাজিক কুসংস্কার ও ভয় কীভাবে রোগ নিয়ন্ত্রণে বাধা সৃষ্টি করছে?ডা. মো. সাঈদ হোসেন: অনেক মানুষ এখনো যক্ষ্মাকে লজ্জার রোগ মনে করেন। ফলে তারা রোগ লুকিয়ে রাখেন, চিকিৎসা নিতে দেরি করেন। এতে রোগ ছড়িয়ে পড়ে এবং পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। এই কুসংস্কার দূর করা খুবই জরুরি।
জাগো নিউজ: যক্ষ্মা আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রায় কী পরিবর্তন প্রয়োজন?ডা. মো. সাঈদ হোসেন: যক্ষ্মা রোগীর জন্য পুষ্টিকর খাবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার (ডাল, মাছ, ডিম, মাংস), ভিটামিন ও মিনারেলসমৃদ্ধ শাকসবজি, পর্যাপ্ত পানি, এছাড়া পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জীবনযাপন জরুরি।
জাগো নিউজ: ধূমপান বা দূষিত পরিবেশ কি যক্ষ্মার ঝুঁকি বাড়ায়?ডা. মো. সাঈদ হোসেন: হ্যাঁ, ধূমপান ফুসফুসের প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, ফলে যক্ষ্মা হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। একইভাবে বায়ুদূষণও শ্বাসযন্ত্রের ক্ষতি করে, যা যক্ষ্মা সংক্রমণকে সহজ করে তোলে।
জাগো নিউজ: সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় যক্ষ্মা চিকিৎসা কতটা সহজলভ্য?ডা. মো. সাঈদ হোসেন: বাংলাদেশে সরকারি উদ্যোগে যক্ষ্মার চিকিৎসা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়া হয়। দেশের প্রায় সব উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও জেলা হাসপাতালে এই সেবা পাওয়া যায়। কমিউনিটি ক্লিনিক থেকেও রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা সহায়তা নেওয়া সম্ভব।
আরও পড়ুন: অসচেতন জীবনযাপনেই বাড়ছে কিডনি রোগের ঝুঁকি ঈদ প্রস্তুতিতে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় চিকিৎসকের বিশেষ পরামর্শ রোজায় নারীর শরীর ও মাতৃত্ব, যা বলছেন বিশেষজ্ঞজাগো নিউজ: করোনা মহামারির পর যক্ষ্মা শনাক্ত ও চিকিৎসা কার্যক্রমে কী প্রভাব পড়েছে?ডা. মো. সাঈদ হোসেন: করোনা মহামারির সময় অনেক মানুষ হাসপাতালে যেতে ভয় পেয়েছেন, ফলে যক্ষ্মা শনাক্তকরণ কমে যায়। অনেক রোগীর চিকিৎসাও ব্যাহত হয়েছে। তবে এখন পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে।
জাগো নিউজ: যক্ষ্মা নির্মূলে স্থানীয় হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের ভূমিকা কী হওয়া উচিত?ডা. মো. সাঈদ হোসেন: দ্রুত রোগ শনাক্ত করা, রোগীদের নিয়মিত ফলোআপ নিশ্চিত করা, সচেতনতা বৃদ্ধি করা, কমিউনিটি পর্যায়ে কাজ করা, চিকিৎসকদের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর্মীদেরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
জাগো নিউজ: বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস উপলক্ষে সাধারণ মানুষের জন্য আপনার বার্তা কী?ডা. মো. সাঈদ হোসেন: যক্ষ্মা ভয় পাওয়ার রোগ নয়, অবহেলা করারও নয়। সময়মতো পরীক্ষা ও নিয়মিত চিকিৎসা নিলে এই রোগ সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যায়। তাই কেউ দীর্ঘদিন কাশিতে ভুগলে দেরি না করে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে পরীক্ষা করান। যক্ষ্মা এখনো বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। তবে সচেতনতা, সময়মতো শনাক্তকরণ এবং নিয়মিত চিকিৎসার মাধ্যমে এই রোগ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সমাজের সব স্তরের মানুষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে, তবেই যক্ষ্মামুক্ত বাংলাদেশ গড়া সম্ভব।
জাগো নিউজ: আপনার মূল্যবান পরামর্শের জন্য ধন্যবাদ।ডা. মো. সাঈদ হোসেন: আপনাকেও ধন্যবাদ।
জেএস/