ফিচার

টকের সূক্ষ্ম ছোঁয়ায় জিলাপিতে ফিরেছে জাকির হোসেনের ভাগ্য

বড় কড়াইয়ে তেলে পাক খাচ্ছে জিলাপি। সোনালি রং ধরতেই তোলা হচ্ছে, ডোবানো হচ্ছে রসে। আর কাউন্টারের সামনে দীর্ঘ হচ্ছে মানুষের সারি। ২৪ কর্মচারী থাকা সত্বেও দম ফেলার সময় নেই। টক-মিষ্টি স্বাদের ছোট্ট আকারের এই জিলাপি একবার যিনি খেয়েছেন পরবর্তিতে বারবার দোকানে আসেন তিনি।

ময়মনসিংহ শহরের জিলা স্কুল মোড়ে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী ‘মেহেরবান’ হোটেলের চিত্র। এই জিলাপির নাম ‘টক-মিষ্টি’ জিলাপি। আবার অনেকে বলেন চুক্কা জিলাপি। স্বাদে আলাদা হওয়ায় দুপুরের পর থেকেই দোকানটিতে ক্রেতাদের ঢল নামে। বিকেল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লাইনে দাড়িয়ে জিলাপি কিনতে হয়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, অন্যান্য জিলাপির মতোই দেখতে টক-মিষ্টি জিলাপি। রং, আকার সবই পরিচিত। তবুও কার আগে কে জিলাপি পাবে, আদৌ পাওয়া যাবে কি না- এই দুশ্চিন্তা নিয়ে অনেকে লাইন ধরেছেন। অনেকে জিলাপি রাখার টেবিলের সামনে এলোপাতাড়ি দাড়িয়ে জটলা সৃষ্টি করেছেন। এতে সৃষ্টি হয়েছে হৈচৈ। দোকানে বেচাকেনার ধুম পড়েছে। এই জিলাপির ব্যতিক্রমী স্বাদের নেপথ্যে আছেন জাকির হোসেন (৫৯)। তিনি দোকানের মূল কারিগর। তিন দশক ধরে সুস্বাদু এই জিলাপির ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন তিনি। ঐতিহ্যবাহী জিলাপি হওয়ার পেছনে রয়েছে ভিন্ন এক গল্প।

জানা গেছে, ১৯৭৩ সালে শহরে এসে চায়ের দোকানে কাজ নেন জাকির হোসেন। এক বছর পর নগরীর জিলা স্কুল মোড়ের হোটেল মেহেরবানে কর্মচারী হিসেবে কাজ শুরু করেন জাকির। তখন দোকানটির মালিক ছিলেন নগরীর বাসিন্দা মইনুল হোসেন। দোকানে ডালপুরি, শিঙাড়া আর জিলাপি তৈরি হতো নিয়মিত। ১৯৯২ সালের দিকে তিনি হোটেল চালাতে না পেরে জাকির হোসেনকে দায়িত্ব দেন। পরের বছর ঘিয়ে ভাজা টক-মিষ্টি জিলাপি তৈরি করেন তিনি। একদিন বৃষ্টির কারণে দোকানে ক্রেতা না আসায় জিলাপির জন্য প্রস্তুত করা জিলাপির খামির পড়ে থাকে অব্যবহৃত। নষ্ট হওয়ার উপক্রম। পরে তিনি ময়দার সঙ্গে তেঁতুলের টক আর মাসকলাই মিশিয়ে তৈরি করেন বিশেষ ধরনের জিলাপি।

আরও পড়ুনহালিম রান্না করে মাস্টারশেফের বিচারকদের মন জিতলেন ইসমাইলজমাট বরফে রক্তধারা, ৫০ লাখ বছরের গোপন রহস্য

ক্রেতার অভাবে দোকানের অন্য কর্মচারীদের খেতে দেন সেই জিলাপি। সেগুলো খেয়ে অনন্য স্বাদ পাওয়া যায়। পরের দিনও এভাবেই জিলাপি বানিয়ে বিক্রি করলে ক্রেতারা জিলাপির প্রশংসা করেন। ধীরে ধীরে এটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। রমজান মাসে প্রতিদিন সাড়ে ৬ মণের বেশি জিলাপি বিক্রি হয়। সাধারণ টক জিলাপি কেজিপ্রতি ২২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। স্পেশাল জিলাপি ৩৬০ টাকা কেজি। তবে প্রায় সবাই স্পেশাল জিলাপি কিনেন। এ হিসেবে এই রমজান মাসে ২৫ লাখ টাকার জিলাপি বিক্রি হয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, দুপুরে অন্য দোকানগুলোর বিক্রেতারা জিলাপিসহ ইফতারসামগ্রী ভাজতে আর ডালায় সাজাতে ব্যস্ত থাকলেও ‘মেহেরবান’ হোটেলে তখন বিক্রির ধুম পড়ে। কারণ এই জিলাপির স্বাদ আলাদা। কড়া মিষ্টির ভেতর টকের সূক্ষ্ম ছোঁয়া- এই মিশ্রণই তৈরি করেছে আলাদা এক আকর্ষণ।

টক-মিষ্টি স্বাদের ছোট্ট আকারের এই জিলাপি একবার যিনি খেয়েছেন বারবার খেতে দোকানে আসেন। শহর, জেলাসহ জেলার বাইরে থেকেও ক্রেতারা এসে এই জিলাপি কিনে নেন। মূলত শহরে কোনো কাজে আসলে তখন ভিন্ন স্বাদ আর ঐতিহ্যের কারণে দূর-দূরান্তের অনেকেই এই জিলাপি কিনে নেন। প্রতিদিন দোকানে বেচাকেনার ধুম পড়ে।ইফতারের আগে দোকানের সামনে রীতিমতো হৈচৈ পড়ে যায়। অনেক সময় যানজটও তৈরি হয়।

নগরীর ভাটিকাশর এলাকা থেকে ঐতিহ্যবাহী টক- মিষ্টি জিলাপি কিনতে আসেন নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, নগরীর প্রধান প্রধান সড়কসহ প্রত্যেক অলিগলিতে ইফতার সামগ্রীসহ জিলাপি বিক্রি হচ্ছে। তবে এখানের জিলাপির স্বাদ ভিন্ন। মুখে তুললেই অন্যরকম চমক সৃষ্টি হয়। মিষ্টির সঙ্গে মিশে থাকে হালকা টক স্বাদ। এই স্বাদ অন্য কোথাও পাই না। তাই রমজান মাসজুড়ে এই জিলাপি নিয়েছি।

আরও পড়ুনরমজানে মুড়ি ভাজায় ব্যস্ত টাঙ্গাইলের নারীরাগৌরনদীর দইয়ের ২০০ বছরের ঐতিহ্য

আনোয়ার পারভেজ নামের আরেকজন বলেন, বাসার সবাই এই জিলাপি পছন্দ করেন। তাই প্রতিবছরের রমজান মাসজুড়ে টক-মিষ্টি জিলাপি কেনা হয়। ইফতারের আগমুহূর্তে ক্রেতাদের ঢল নামে। তাই প্রতিদিন আগেই দোকানে এসে পড়ি। আজ রমজানের শেষ দিন। আজকেও সুস্বাদু জিলাপি নিতে এসেছি।

কথা হয় জাকির হোসেনের ছেলে আশিকুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, সারা বছরই জিলাপি বানানো হয়। তবে রমজান এলে জিলাপি বিক্রির ধুম পড়ে। দুপুরের দিকে বিক্রি শুরু হয়, চলে ইফতারের আগমুহূর্ত পর্যন্ত। বিকেল ৪টা থেকে ৫টার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভিড় হয়। বর্তমানে দোকানে ২৪ জন কর্মচারী কাজ করছেন। ক্রেতাদের চাপ সামাল দিতে তাদের পাশাপাশি আমরা দুই ভাইও দোকানে সময় দিচ্ছি। এবারও আশানুরূপ বেচাকেনা হয়েছে।

কথা হয় জিলাপির এই ব্যতিক্রমী স্বাদের নেপথ্যে থাকা দোকান মালিক জাকির হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, সারা বছরই জিলাপি বানাই। তবে রমজানে চাহিদা সবচেয়ে বেশি। অনেক বড় বড় ইফতার আয়োজনেও আমাদের জিলাপি যায়। টক-মিষ্টি জিলাপির প্রধান উপকরণ হলো মাসকলাই ডাল, ময়দা, চালের গুঁড়ার সঙ্গে তেঁতুল।

তিনি বলেন, প্রতিবারই জিলাপি ভাজতে নতুন তেল ব্যবহার করা হয়। কোনো ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় না। মান ও স্বাদ ধরে রাখতে চেষ্টার কমতি নেই।

এমডিকেএম/এমআইএইচ