গ্রামবাংলার অতি আনন্দের খেলা ছিল ‘মার্বেল’। গত এক দশক আগেও গ্রামের পথে-ঘাটে-মাঠে কিংবা শহরতলির সরু রাস্তায় দেখা যেত মার্বেল খেলায় মেতে উঠেছে একদল শিশু-কিশোর। বৃষ্টির সময় ছাড়া বছরের সব সময়ই কমবেশি মার্বেল খেলার আয়োজন হতো। তবে শীতকাল এলেই মার্বেল খেলার বহর সৃষ্টি হতো। যদিও এখন হারিয়ে যেতে বসেছে এই খেলা। প্রাকৃতিক নিয়মে প্রতিবছর শীত ফিরে এলেও, তেমন আর জমে ওঠে না সেই মার্বেল খেলা।
মার্বেল সাধারণত পাঁচ-ছয়জন মিলে খেলে। তবে দুজনেও খেলা যায়। যে ধরনের জায়গায় ছোট গাছ বা ঘাস-গুল্ম নেই, অর্থাৎ সমান মাটির জায়গা মার্বেল খেলার জন্য সুবিধাজনক। এই খেলার জন্য একটি ছোট্ট গর্ত করতে হয়। নির্দিষ্ট সীমারেখার বাইরে দাঁড়িয়ে খেলোয়াড়রা সবাই একটি করে মার্বেল গর্তের দিকে গড়িয়ে দেয়।
প্রথমত গর্তের খুব কাছে বা গর্তের ভেতরে যার মার্বেলটা থাকে সে প্রথম পর্যায়ে প্রথম বলে বিবেচিত হয়। এরপর নিয়ম অনুযায়ী সবাই ৩/৪/৫টা করে মার্বেল জমা দেয় প্রথম স্থান অধিকারী খেলোয়াড়ের কাছে। এরপর শুরু হয় দ্বিতীয় পর্যায়ের খেলা, সবার জমা দেওয়া মার্বেলগুলো মাটিতে গড়িয়ে দিতে হয় দাগের ওপারে। এরপর একটি মার্বেল দিয়ে নিশানা ঠিক করে দূরে নির্দিষ্ট একটি মার্বেলের গায়ে লাগাতে হয়। মার্বেলটি গড়িয়ে দেওয়ার সময় একাধিক মার্বেলের গায়ে লেগে গেলে প্রথমজন বাদ, খেলতে আসবে দ্বিতীয় জন।
আরও পড়ুনবাংলায় রয়ে যাওয়া পর্তুগিজ স্মৃতিডিম পাড়তে এসে জীবন দিতে হচ্ছে কচ্ছপদেরএকইভাবে দ্বিতীয়জন বাদ হয়ে গেলে খেলতে আসবে তৃতীয়জন। যার গড়িয়ে দেওয়া মার্বেল কোনো মার্বেল স্পর্শ না করে নির্দিষ্ট মার্বেলের গায়ে লাগবে সে জয়ী। সে তখন মাঠে থাকা ঐ মার্বেলের মালিক হয়ে যাবে। এই হলো মার্বেল খেলার সংক্ষিপ্ত নিয়ম। এ ছাড়াও মার্বেল খেলার আরও অনেক প্রকরণ ও নাম রয়েছে। যেমন আংটিস, বিঘাতি ইত্যাদি। বিগত ৫-৭ বছর আগে ১ টাকায় দোকানিরা ১০-১২টি মার্বেল বিক্রি করতো। এখন ১ টাকায় ৪-৫টি মার্বেল পাওয়া যায়। মার্বেল হলো কাচের ছোট বল।
আবহমান বাংলায় মার্বেল খেলা এখন বিলুপ্তপ্রায়। এখনো মাঝেমধ্যে যা একটু দেখা যায় তা খুবই কম। হয়ত আরও ১০ বছর পর এই খেলা মোটেই দেখা যাবে না। এখনকার সমাজের অনেকের কাছেই মার্বেলসহ আরও অনেক গ্রামীণ খেলা যেন শুধুই স্মৃতি।
ফসল কাটার পর শূন্য জমিতে জমে উঠত নানা ধরনের খেলা। কানামাছি, এক্কা দোকা, বৌছি, লাটিম, গোল্লাছুট, ডাংগুলি, ওপেন টু বায়োস্কোপ, দাড়িয়াবান্দা, বোম-বাস্টিং, চারাপাতিসহ নানা ধরনের খেলার আয়োজন। স্কুল থেকে ফিরেই ঘরে কোনোমতে বই রেখেই সবাই ছুটতো খেলার মাঠে। সবাই মিলে হৈ-হুল্লোড়ে জমে উঠতো মাঠ। সেই দিনগুলোতে স্কুল ব্যাগের ভেতরে কোনো কৌটায় ভরে কিংবা হাফ প্যান্টের পকেটে রাখা হতো মার্বেল। স্কুল চলাকালে বা টিফিন পিরিয়ডে লুকিয়ে মার্বেল বা লাটিম খেলে স্যারের দু’চার ঘা বেতের বারি বা কানমলা খায়নি এমন ভালো ছেলে খুব কমই ছিল। এমন দিনগুলো হারিয়ে গেছে। এগুলো এখন শুধুই স্মৃতিকথা। বর্তমানে গ্রামের মাঠে খেলা বলতে ফুটবল বা ক্রিকেট।
মার্বেল তো দূরের কথা, হারিয়ে গেছে জাতীয় খেলা হাডুডু। এই খেলাগুলো বাঁচিয়ে রাখতে নেই কোনো সরকারি উদ্যোগ বা পৃষ্ঠপোষকতা। সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান জীবন ও জীবিকার তাগিদে শহুরে বাবা-মায়ের মতো ব্যস্ত থাকেন গ্রামের বাবা-মায়েরাও। তারা শিশুদের খুব কম সময় দিচ্ছেন। অপরদিকে খেলাধুলার জন্য যে সঙ্গীদল দরকার গ্রামের শিশুরাও এখন তা খুব একটা পাচ্ছে না। শহরের ভাবধারায় গ্রামের শিশুদের পাঠ্যক্রমেও এসেছে নানামুখী পরিবর্তন। দেখা যাচ্ছে স্কুল থেকে ফিরেই শিশুদের যেতে হচ্ছে প্রাইভেট পড়তে। সন্ধ্যায় ফিরে একটু টিভি দেখা ছাড়া আর কোনো বিনোদন তারা নিতে পারছে না। এতে তাদের শারীরিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি মানসিক বিপর্যয় ঘটছে।
আরও পড়ুনলাঙল-যন্ত্র, আশির দশকের কৃষি ও আজকের কৃষকের পরিবর্তনজাপান থেকে গ্রামগঞ্জে মানবতার আলো ছড়াচ্ছেন কুমিল্লার আমিরদেশ হচ্ছে ডিজিটাল আর মানুষের চিন্তা চেতনায় আসছে নানামুখী পরিবর্তন। সময়ের এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামীণ খেলাধুলা ও বিনোদনও পালটে গেছে। শিশুদের জীবনেও লেগেছে সেই পরিবর্তনের ছোঁয়া। বাংলাদেশের শিশুরা যেখানে অহরহ মার্বেল খেলতো তা কমে এসেছে শূন্যের কোঠায়। গ্রামের শিশুদের মাঝেও বাঁচতে দেওয়া হচ্ছে না গ্রামীণ ঐতিহ্য। পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিষেধাজ্ঞা ও আধুনিকতার ছোঁয়া গলা টিপে হত্যা করছে গ্রামের পুরোনো সব খেলা।
বাংলাদেশের গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলোর কোনো ক্ষতিকর দিক নেই। এসব খেলা কখনো শিশুদের বিকৃত মানসিকতায় ধাবিত হতে দেয় না। বরং এসব খেলা শিশুদের মেধাগত বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করে। শারীরিক ক্ষতিসাধন না ঘটিয়ে বরং শরীর ও মন সুস্থ রাখে।
খেলাধুলার এত সব উপকারিতার মাঝেও বাস্তবতার নিরিখেই আমাদের ভেবে নিতেই হচ্ছে, হয়ত গ্রামীণ শিশুদের মধ্যেও আর ফিরবে না আগের দিনগুলো, হয়ত আগের মতো সেই মার্বেল খেলাও আর জমবে না!
এমআইএইচ