সাহিত্য

তানজিদ শুভ্রর গল্প: ঈদের ছুটি

মাত্র অন-এয়ার শেষ করেছে শায়ান। ব্যাকগ্রাউন্ডে তখন বাজছে ‘স্বপ্ন যাবে বাড়ি আমার’। কিন্তু শায়ানের স্বপ্ন কি এবার বাড়ি যাবে? এই প্রশ্ন গ্রামের বাড়িতে থাকা শায়ানের মায়ের। একটু আগেই মাকে ফোন করেছিল সে। অন-এয়ারে থাকায় তখন কথা বলতে পারেনি। এখন ফ্রি হয়েই কল দিলো। ‌‘আসসালামু আলাইকুম, আম্মা, ভালো আছেন?’ ‘ওয়ালাইকুম সালাম। এই তো আছি রে, তুই কেমন আছিস বাবা?’ ‘আমিও বেশ ভালো আছি মা। এখন অফিসে, শো শেষ করলাম। বাসায় ফিরে আবার কথা বলি?’ ‘আচ্ছা, সাবধানে বাসায় ফিরিস।’কথা শেষ হয় খুব তাড়াতাড়ি। কিন্তু মায়ের কানে সেই কথার রেশটুকু থেকে যায়। আঁচল দিয়ে চোখের কোণে জমে থাকা জলটুকু মুছে নিজের কাজে মন দিলেন তিনি।

শায়ান রেডিও স্টেশনে কাজ করে। স্টেশনের অন্যতম জনপ্রিয় আরজে হিসেবে তার বেশ পরিচিতি। শায়ান যে শো হোস্ট করে, সেখানে শ্রোতার অভাব হয় না। এখন রমজান মাসের শেষদিক। আজই শেষ রোজা। ঈদের ছুটিতে অফিসের অধিকাংশই বাড়ি চলে গেছে। নিউজ টিমের কয়েকজন আর তিনজন আরজে এবার ছুটিতে যায়নি। তাদের জন্য ঈদুল আজহায় ছুটি বরাদ্দ রয়ে গেল। এই তালিকায় শায়ানের নামও রয়েছে। তাই এবার আর ঈদে বাবা-মায়ের সাথে থাকা হচ্ছে না, ঈদ কাটাতে হবে অফিসের কয়েকজন সহকর্মীর সাথেই।

মন কিছুটা খারাপ। মনের ভেতর এসব ভাবনা ঘুরপাক খেলেও পেশাদারিত্বের সাথে শো চালিয়ে যাচ্ছিল শায়ান। প্রতি বছর অন্তত শেষ ইফতারটা বাড়ির সবার সাথে করলেও এবার তা হলো অফিসে। রাত দশটায় শো শেষে অফিস থেকে বের হওয়ার সময় ডাক পড়ল প্রযোজক রিয়াদের। ‘শায়ান, কালকে কিন্তু দুপুরের শো তোমার। একটু আগেই চলে এসো।’ ‘তুমিও থাকবে ভাইয়া?’ ‘হ্যাঁ, বাকিরা তো ছুটিতে। আমি চলে আসব।’ ‘আচ্ছা, আল্লাহ হাফেজ।’ ‘শুভ রাত্রি!’

ঈদের আগের রাতে ঢাকার রাস্তায় যানজটের অন্ত নেই। বাসায় ফিরে দেওয়াল ঘড়িতে সময় দেখল রাত বারোটা। এত রাতে মাকে আর বিরক্ত করল না শায়ান। বড় বোন নিলাকে ফোন দিলো। নিলা তার দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে বাড়ি গেছে। নিলার স্বামী অফিসের কাজে গত সপ্তাহে সিঙ্গাপুর যাওয়ায় গতকালই ছেলেমেয়েদের নিয়ে গ্রামের বাড়ি চলে যায় সে। এত রাতে ভাইয়ের ফোন পেয়ে কিছুটা চমকে যায় নিলা। ‘কি রে শায়ান, এত রাতে?’ ‘হ্যাঁ আপু, মাত্র অফিস থেকে ফিরলাম। ভাবলাম আম্মু ঘুমিয়ে গেছে, তাই তোকেই জানাই।’ ‘ও আচ্ছা! এত দেরি হলো কেন?’ ‘রাস্তায় খুব জ্যাম ছিল।’ ‘আচ্ছা, ফ্রিজ থেকে কিছু বের করে খেয়ে নে।’ ‘খেয়ে নেবো, চিন্তা করিস না। তুই এত রাতে জেগে আছিস কেন?’ ‘জারিফ আর জোয়াকে মেহেদি পরিয়ে দিচ্ছি।’ ‘আচ্ছা, সকালে কথা হবে। রাখছি এখন।’

ফ্রেশ হয়ে রাতের খাবার খেয়ে বিছানায় গেল শায়ান। ঘুমানোর আগে একটু ফেসবুক নোটিফিকেশনগুলো দেখছিল। অসংখ্য শ্রোতা ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে বার্তা পাঠিয়েছে। সবাইকে আলাদা করে উত্তর দিতে গেলে অনেক সময় লাগবে। তাই শুধু বাড়িতে যাওয়া কয়েকজন সহকর্মীর সাথে কুশল বিনিময় করেই ঘুমিয়ে পড়ল।

দুই.মসজিদের মাইকে ফজরের আজান শুনে ঘুম ভাঙে তার। নামাজ পড়ে স্থানীয়দের সাথে একটা কবরস্থানে গিয়ে মোনাজাত করে আসে। বাড়িতে থাকলে ঠিকই স্বজনদের কবর জিয়ারত করা হতো। বাসায় ফেরার পর পাশের ফ্ল্যাটের এক আন্টি কিছু খাবার পাঠালেন। সেগুলো খেয়েই বের হয়ে যায় শায়ান। ঈদের নামাজ শেষে সোজাসুজি চলে যায় স্টেশনে।

অফিস ঈদের সাজে সেজেছে। লোকজন খুবই কম। অন-এয়ারে আছে আরজে তানিশা। প্রযোজক রিয়াদ তার ডেস্কে বসা। শায়ান সেখানেই গিয়ে বসল। আজ আর নিজের ডেস্কে বসতে ইচ্ছে করছে না। রিয়াদ নিজেই দুপুরের বিশেষ শোয়ের স্ক্রিপ্ট প্রস্তুত করে রেখেছে। প্রোগ্রাম রুমে ঢোকার আগে ভিডিও কলে পরিবারের সাথে কথা বলে নেয় শায়ান। রিয়াদও কুশল বিনিময় করে শায়ানের মায়ের সাথে।

চার ঘণ্টা চলবে শায়ানের শো। দেখতে দেখতে প্রথম ঘণ্টা কেটেই গেল। প্রথম ঘণ্টায় শায়ান খুব কম কথা বলল, মেসেজও পড়ল কম। শুধু অনুরোধের গানগুলো বাজিয়ে গেল। পরের ঘণ্টায় কথার ঝুড়ি নিয়ে বসতে হলো। ঈদের দিনের বিশেষ শো, বিশেষ অতিথি না থাকলে কি চলে! ঠিক তিনটায় বিশেষ অতিথি হিসেবে জনপ্রিয় গায়ক শাফায়েত অফিসে হাজির হলেন। তাকে অভ্যর্থনা জানানো হলো। সোয়া তিনটায় অতিথিকে নিয়ে অন-এয়ারে গেল শায়ান। গান আর আড্ডায় পার হলো আরও দুটি ঘণ্টা।

অতিথি বিদায় নেওয়ার পরও শায়ানের অফিস ছাড়ার সময় হয়নি। আরও এক ঘণ্টা শো টানতে হবে। বিকেল পাঁচটায় প্রোগ্রাম শেষ হলো। পরবর্তী শো করার জন্য আরজে রাফা প্রস্তুত। হট সিটে রাফাকে বসিয়ে স্টুডিও থেকে বেরিয়ে আসে শায়ান। অন্যদিন শো শেষে অফিসে কিছুক্ষণ আড্ডা দিলেও আজ আর থাকতে ইচ্ছে করছে না। ‘রিয়াদ ভাই, আমি গেলাম। তুমি বের হবেন কখন?’ ‘দেখি, আটটা বাজতে পারে।’ ‘আচ্ছা, সাবধানে ফিরবে।’

প্রিয় কর্মস্থল থেকে বের হয় শায়ান। গত রাতে যানজটের কারণে বাসায় ফিরতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল, কিন্তু আজ এই শহর সম্পূর্ণ ফাঁকা। মাঝে মাঝে দু-একটা মোটরসাইকেল সাই সাই করে ছুটে যাচ্ছে। কোনো রিকশা না পেয়ে হেঁটেই এগোতে থাকে শায়ান। বাতাসে চুলগুলো উড়ছে। মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে। জারিফ আর জোয়া কী করছে? মামাকে ছাড়া কি ওদের ঘোরাঘুরি জমছে? হাঁটতে হাঁটতেই এসব ভাবছিল সে। রাস্তা পার হতে হবে। ফুটওভার ব্রিজটা কিছুটা সামনে, কিন্তু জেব্রাক্রসিং দিয়ে পার হলেই শায়ানের বাসা কাছে হয়। চারপাশ ফাঁকা দেখে জেব্রাক্রসিং দিয়েই পা বাড়াল সে। হঠাৎ তীব্রগতির একটি আলো যেন ধেয়ে এলো। মুহূর্তেই সব এলোমেলো।

ফুটওভার ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে ক্যামেরা হাতে ছবি তুলছিল ফাহিম। লেন্স ঘোরাতে গিয়ে হঠাৎ চোখ আটকে গেল। জেব্রাক্রসিংয়ের সাদা দাগগুলো লাল হয়ে আছে। দ্রুত নিচে নেমে এলো সে। রাস্তায় ছিটকে পড়ে আছে একটি পরিচিত মুখ, রক্তে ভেসে যাচ্ছে পিচঢালা পথ। একটু দূরে দুমড়ে মুচড়ে পড়ে আছে একটি মোটরসাইকেল, কিন্তু চালকের দেখা নেই। ফাহিমের চিৎকারে দু-চারজন মানুষ জড়ো হয়ে গেল। ট্রিপল নাইনে ফোন দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স ডাকল। পরিচয় জানার জন্য পকেট হাতড়াতেই একটি আইডি কার্ড বেরিয়ে এলো।

ফাহিম স্তব্ধ। কিছুক্ষণ আগেও তো হেডফোনে এই মানুষটার কণ্ঠই শুনছিল সে। এ যে আরজে শায়ান! কাকে জানাবে বুঝতে না পেরে আইডি কার্ডে থাকা অফিসের নম্বরেই ফোন দিলো ফাহিম। ‘হ্যালো, রেডিও...’ ‘ভাই এসব রাখেন। শায়ান ভাই অ্যাক্সিডেন্ট করেছেন। তাড়াতাড়ি সিটি হাসপাতালে চলে আসুন।’ খবরটা শুনে রিয়াদ আর রাফা দুজনেই বাকরুদ্ধ। রিয়াদ তৎক্ষণাৎ বেরিয়ে পড়ল। হাসপাতালে পৌঁছে দেখে ফাহিম নামের ছেলেটা অঝোরে কাঁদছে। ডাক্তারের কাছে শায়ানের অবস্থা জানতে চাইলে তিনি কোনো কথা না বলে একটি কাগজ ধরিয়ে দিলেন। ডেথ সার্টিফিকেট! ফ্লোরে বসে পড়ল রিয়াদ।

অফিসের নিউজ টিমের তারেক খবর পেয়ে ছুটে এলো। রিয়াদ কিছুই ভাবতে পারছে না। এক পর্যায়ে শায়ানের বোন নিলাকে ফোন করে বিষয়টা জানাল সে। ওপাশ থেকে ডুকরে কেঁদে উঠেও নিজেকে সামলে নিলো নিলা, যেন মা কোনোভাবেই বুঝতে না পারে। ‘আম্মু, আজকে কোথাও যাবে না?’ জোয়া জিজ্ঞেস করে। ‘না রে মা, কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না।’ ‘চলো না একটু ঘুরে আসি।’ ‘তুমি জারিফের সাথে বাগানে গিয়ে খেলো।’ মেয়ের চোখে জল দেখে শায়ানের মা জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী রে নিলা, কী হয়েছে তোর?’‘কিছু না আম্মু। আমি ঠিক আছি।’ ‘শায়ানকে একটা ফোন দে না।’ ‘একটু পর দিচ্ছি...’ কথাটা শেষ করেই অন্য ঘরে ছুটে গেল নিলা।

তিন.একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে শায়ানের নিথর দেহ নিয়ে রিয়াদ, তারেক আর সুমি রওয়ানা হলো গ্রামের বাড়ির দিকে। উৎসবের আনন্দ তখন পরিণত হয়েছে বিষাদে। শায়ানের গ্রামে পৌঁছাতে ঘড়ির কাঁটায় তখন পৌনে আটটা। চায়ের দোকানগুলোতে বেশ ভিড়। সবাই আড্ডায় মগ্ন। হঠাৎ অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল পুরো এলাকা। শায়ানের বাবা নেই। বাড়িতে পুরুষ মানুষ বলতে কেউ নেই। কফিন দেখে নিলা জ্ঞান হারাল। আর শায়ানের মা যখন শুনলেন তার কলিজার টুকরো কফিনে মুড়ে ফিরেছে, তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। অসংলগ্ন প্রলাপ বকতে শুরু করলেন।

আবির আর আলো ছিল শায়ানের খেলার সাথী। ওরা ছোটবেলার বন্ধুর নিথর মুখটা দেখে কিছুই বুঝতে পারল না। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। প্রতিবেশীরা ছুটে এলেন। রাতেই পারিবারিক গোরস্থানে দাফনের ব্যবস্থা করা হলো। ছুটি কাটাতে যাওয়া শায়ানের অনেক সহকর্মীও খবর পেয়ে রাতেই ছুটে এলেন। মায়ের বুক খালি করে শায়ান শুয়ে রইল অন্ধকার কবরে। আর বেপরোয়া ড্রাইভিংয়ের জন্য যে দায়ী, সে হয়তো কোনো আইনি ফাঁকফোকর গলে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে মুক্ত বিহঙ্গের মতো।

অফিসের সামনে বড় ব্যানারে শায়ানের হাসিমুখের একটি ছবি টানানো হলো। প্রতিটি অনুষ্ঠানের শুরুতে তাকে স্মরণ করা হলো গভীর শ্রদ্ধায়। শুধু তার নিজের কর্মস্থলেই নয়, অন্যান্য রেডিও স্টেশনেও প্রিয় আরজে শায়ানের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করা হলো। যে ফেসবুক প্রোফাইলে প্রতিদিন শোয়ের ছবি পোস্ট করা হতো, সেখানে আজ লেখা—‘রিমেম্বারিং শায়ান হাসান’। শোনা গিয়েছিল, শায়ানকে ধাক্কা দেওয়া মোটরসাইকেলটি পুলিশ জব্দ করেছে। কিন্তু বৈধ কাগজপত্র না থাকায় আসল মালিকের সন্ধান আর মেলেনি।

শ্রোতাদের কথা ভেবে মায়ের কোলে ফেরা হয়নি শায়ানের। পরের মাসের ছুটিতে যাওয়ার কথা ছিল তার। কিন্তু সেই ছুটি যে চিরস্থায়ী হয়ে ধরা দেবে, তা কে জানত! ভাইয়ের প্রিয় খাবারগুলো রান্না করে কলিংবেল বাজার যে অপেক্ষা নিলার ছিল, তা কি আর কোনোদিন শেষ হবে?

এসইউ