নদীমাতৃক বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় ফেরি শুধু একটি পরিবহন মাধ্যম নয়; এটি প্রতিদিনের জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ। দেশের দক্ষিণ ও উপকূলীয় অঞ্চলের সঙ্গে সংযোগ রক্ষায় ফেরির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন শত শত বাস, ট্রাক, প্রাইভেটকার এবং হাজার হাজার যাত্রী এ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে চলাচল করে। কিন্তু এ ব্যবস্থার ভেতরে কিছু ঝুঁকিপূর্ণ চর্চা দীর্ঘদিন ধরে স্বাভাবিক নিয়ম হিসেবে চালু আছে, যা নতুন করে ভাবনার দাবি রাখে। এর মধ্যে অন্যতম হলো—ফেরিতে গাড়ি ওঠানোর সময় যাত্রীদের গাড়ির ভেতরে রেখেই লোডিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা।
বাস্তবতা হলো, ফেরিতে গাড়ি ওঠানো একটি সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রক্রিয়া। নদীর স্রোত, ফেরির অবস্থান, র্যাম্পের উচ্চতা ও ভারসাম্য—সবকিছু মিলিয়ে এটি একটি জটিল কাজ। চালকদের সামান্য অসতর্কতা, ব্রেকের ত্রুটি কিংবা র্যাম্পে চাকার স্লিপ—যে কোনো কারণেই মুহূর্তের মধ্যে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে গাড়ির ভেতরে যাত্রীরা অবস্থান করলে তাদের নিরাপত্তা পুরোপুরি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
প্রায়ই দেখা যায়, ফেরিতে ওঠার সময় যানবাহন দ্রুত তোলার জন্য চাপ থাকে। এই তাড়াহুড়োর মধ্যে সঠিক নির্দেশনা মানা হয় না, অনেক ক্ষেত্রে যানবাহনের মধ্যবর্তী দূরত্বও বজায় থাকে না। ফলে একটির সঙ্গে আরেকটির ধাক্কা লাগা বা ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এ অবস্থায় যদি যাত্রীরা গাড়ির ভেতরে বসে থাকেন, তাহলে একটি ছোট দুর্ঘটনাও বড় বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
আরও পড়ুনউপকূলের জন্য শুরু হলো ‘বিপদসংকুল সময়’অতীতে ফেরিঘাটে এবং ফেরিতে ওঠা-নামার সময় একাধিক দুর্ঘটনার নজির রয়েছে। কখনো যানবাহন নদীতে পড়ে গেছে, কখনো মানুষ আহত হয়েছেন। এসব ঘটনার পর সাময়িক আলোচনা হলেও দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর কোনো নিরাপত্তা সংস্কার খুব কমই বাস্তবায়িত হয়েছে। অথচ বাস্তবতা স্পষ্ট—লোডিং ও আনলোডিং সময়টাই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ধাপ।
এই প্রেক্ষাপটে একটি স্পষ্ট ও বাধ্যতামূলক নিয়ম চালু করা জরুরি—ফেরিতে গাড়ি ওঠানোর আগে সব যাত্রীকে নামিয়ে দেওয়া। যাত্রীরা নির্ধারিত নিরাপদ স্থানে অবস্থান করবেন এবং লোডিং সম্পন্ন হওয়ার পর পুনরায় নিজ নিজ যানবাহনে উঠবেন। এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
এ ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—যাত্রীদের জীবন সরাসরি ঝুঁকির বাইরে থাকবে। কোনো কারণে গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারালে বা দুর্ঘটনা ঘটলে যাত্রীরা তার ভেতরে আটকে পড়বেন না। দ্বিতীয়ত, চালকরাও তুলনামূলক স্বস্তিতে কাজ করতে পারবেন, কারণ তাদের ওপর যাত্রীদের তাৎক্ষণিক নিরাপত্তার চাপ থাকবে না। তৃতীয়ত, পুরো প্রক্রিয়ায় একটি শৃঙ্খলা তৈরি হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সহায়ক হবে।
অনেকে বলতে পারেন, এতে সময় বেশি লাগবে বা যাত্রীদের কিছুটা অসুবিধা হবে। কিন্তু সামান্য সময় সাশ্রয়ের জন্য জীবনের ঝুঁকি নেওয়া যুক্তিসঙ্গত নয়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে কিছু অতিরিক্ত নিয়ম মেনে চলতেই হয়। উন্নত পরিবহন ব্যবস্থায় এ ধরনের নিরাপত্তা প্রটোকল কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয় বলেই দুর্ঘটনার হার তুলনামূলক কম থাকে।
আরও পড়ুনহারিয়ে যেতে বসেছে মার্বেল খেলাএই নিয়ম কার্যকর করতে হলে শুধু নীতিগত ঘোষণা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কঠোর বাস্তবায়ন। ফেরিঘাটে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষকে স্পষ্ট নির্দেশনা দিতে হবে এবং তা নিশ্চিত করতে হবে। লোডিংয়ের আগে যাত্রী নামানো হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী নিয়োজিত থাকতে হবে। পাশাপাশি মাইকিং, সাইনবোর্ড ও সচেতনতামূলক প্রচারণার মাধ্যমে যাত্রীদের বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত করা জরুরি।
চালকদের মধ্যেও এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন। অনেক সময় তাড়াহুড়ো বা চাপের কারণে তারা নিয়ম মানতে অনীহা দেখান। এই প্রবণতা পরিবর্তন না হলে কোনো নিয়মই কার্যকর হবে না। তাই প্রশাসনিক তদারকির পাশাপাশি প্রয়োজনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।
নৌপরিবহন খাতের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে হলে এ ধরনের বাস্তবসম্মত পরিবর্তন জরুরি। বড় দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সব সময় বড় উদ্যোগ প্রয়োজন হয় না; অনেক সময় একটি সঠিক নিয়মই জীবন বাঁচাতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, ফেরিতে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মৌলিক দায়িত্ব। তাই গাড়ি ওঠানোর আগে যাত্রী নামানোর নিয়ম চালু করা এখন আর প্রস্তাব নয়, এটি প্রয়োজনীয় বাস্তবতা।
লেখক: কবি, সাংবাদিক ও গল্পকার।
এসইউ