ঈদের আনন্দ শেষে আবারও কর্মব্যস্ত জীবনে ফিরতে শুরু করেছেন রাজধানীমুখী মানুষ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ঢাকায় ফেরার এ যাত্রায় সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে রেলপথে। বিশেষ করে যশোর-বেনাপোল রুটের ট্রেনগুলোতে যাত্রীচাপ চরমে পৌঁছেছে। বেনাপোল এক্সপ্রেসে তিল ধারণের জায়গাও নেই—নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে যাত্রীরা গাদাগাদি করে ঢাকায় ফিরছেন।
বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) বিভিন্ন রেলস্টেশন দেখা যায়, ঢাকা অভিমুখী যাত্রীদের দীর্ঘলাইন। অনেকেই নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই এসে প্ল্যাটফর্মে অবস্থান নেন। ট্রেন আসার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় হুড়োহুড়ি। যাদের টিকিট রয়েছে, তারাও সিট নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছেন। আর টিকিটবিহীন যাত্রীরা সুযোগ পেলেই ট্রেনে উঠে পড়ছেন।
বেনাপোল এক্সপ্রেস ছাড়ার পর চিত্র আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। প্রতিটি বগিতে অতিরিক্ত যাত্রী, দরজায় ঝুলে থাকা মানুষ, করিডোরজুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রী, সব মিলিয়ে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বিরাজ করে।
ঢাকাগামী যাত্রী শরিফুল ইসলাম বলেন, টিকিট পাইনি। কিন্তু অফিস আছে, যেতেই হবে। বাধ্য হয়ে ট্রেনে উঠে পড়েছি। দাঁড়িয়ে গেলেও সমস্যা নেই, কোনোভাবে ঢাকায় পৌঁছাতে পারলেই হলো।
আরেক যাত্রী নাজমা খাতুন জানান, ঈদের সময় গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলাম। ফেরার সময় টিকিট পাওয়া যায়নি। অনেক চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে শেষে ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনে উঠেছি। বাচ্চা নিয়ে খুব কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু উপায় নেই।
বেনাপোল এক্সপ্রেসের এসি বগির চিত্রও ছিল উদ্বেগজনক। নিয়ম অনুযায়ী এসি বগিতে দাঁড়িয়ে যাত্রা করার অনুমতি নেই। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, সেখানে সিটধারী যাত্রীদের পাশেই গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে আছেন অসংখ্য মানুষ। এতে স্বাভাবিকভাবেই বিরক্তি প্রকাশ করেছেন সিটে বসে থাকা যাত্রীরা।এ বিষয়ে এসি বগির যাত্রী মাহমুদ হাসান বলেন, আমরা বেশি ভাড়া দিয়ে এসি টিকিট কেটেছি একটু স্বস্তিতে যাওয়ার জন্য। কিন্তু এখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের ভিড়ে কোনো পার্থক্যই নেই। এতে ভোগান্তি তো হচ্ছেই, পাশাপাশি নিরাপত্তার বিষয়টিও প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
তিনি আরও বলেন, দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীরা অনেক সময় সিটের পাশে ভিড় করে থাকেন, এতে চলাফেরা করাও কঠিন হয়ে যায়। বগির ভিতরে ভিড় এতটাই ওয়াসরুমে যাওয়ারও উপায় নেই। কর্তৃপক্ষের উচিত বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা।
ট্রেনের ভেতরে শুধু ভিড়ই নয়, শৃঙ্খলার অভাবও ছিল স্পষ্ট। অনেকেই করিডোরে বসে পড়েছেন, কেউ কেউ বাথরুমের সামনেও অবস্থান নিয়েছেন। ফলে যাত্রীদের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীরা পড়েছেন চরম দুর্ভোগে।
বেনাপোল এক্সপ্রেসে দায়িত্ব পালন করা এক কর্মকর্তা বলেন, ঈদ শেষে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষ ঢাকায় ফেরার কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। নির্ধারিত আসনের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি যাত্রী ট্রেনে উঠছেন। এতে করে নিয়ন্ত্রণ রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
তিনি বলেন, আমরা একবার এসি বগির ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি। এ সময় যাত্রীরা আমাদের উপর চড়াও হয়। অনেকেই বাগবিতণ্ডা করতে থাকেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাহিরে থাকায় আমরা সরে আসি।
তবে অনেক যাত্রী অভিযোগ করেছেন, পর্যাপ্ত তদারকি না থাকায় টিকিটবিহীন যাত্রীরা সহজেই ট্রেনে উঠে পড়ছেন। প্ল্যাটফর্মে এবং ট্রেনের ভেতরে নিরাপত্তা জোরদার করা গেলে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতো বলে মনে করেন তারা।
চুয়াডাঙ্গা থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেওয়া আবির হাসান নামের একজন বলেন, একটু আয়েশ করে যাবো এই আশায় বাড়তি টাকা দিয়ে এসি বগিতে সিট কেটেছিল। কিন্তু বগির ভিতরে এত ভিড় সিটের কাছেই যাওয়া কষ্টকর হয়ে গেছে। ট্রেনে উঠার প্রায় আধাঘণ্টা পর সিটি বসতে পেরেছি।
তিনি বলেন, ভিড় ঠেলে সিটের কাছে এসে দেখি আমার সিটে আর একজন বসে আছেন। এসি বগিতে তো দাঁড়িয়ে যাত্রী যাওয়া নিষেধ। তাহলে এই অবস্থা কেন? ট্রেনের কাউকে আসতেও দেখছি না। যে যেভাবে পারছে ঘাড়ের ওপর ঝুলছে। মাঝে মধ্যে ধাক্কাধাক্কিতে যাত্রীদের মধ্যে ঝগড়া বেঁধে যাচ্ছে। দুজনকে কিছুটা হাতাহাতি করতেও দেখেছি। কিন্তু ট্রেনের কাউকে দেখা যাচ্ছে না। কেউ টিকিটও চেক করছে না।
এদিকে, যাত্রীদের এমন ভোগান্তির মধ্যেও কেউ কেউ বিষয়টিকে বাস্তবতার অংশ হিসেবে মেনে নিচ্ছেন। তাদের মতে, ঈদ মৌসুমে এ ধরনের ভিড় নতুন কিছু নয়। প্রতি বছরই একই চিত্র দেখা যায়।
ঢাকায় ফেরা আরেক যাত্রী রাশেদুল করিম বলেন, কষ্ট হলেও এটা আমাদের মেনে নিতে হয়। সবাই একসঙ্গে ফিরতে চায়, তাই ভিড় হয়। তবে যদি ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো যেত, তাহলে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যেত।
সব মিলিয়ে ঈদ শেষে রাজধানীমুখী যাত্রীদের ঢল সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে রেলওয়ে। আর যাত্রীরা বাধ্য হয়ে ভোগান্তিকে সঙ্গী করেই ঢাকায় ফিরছেন, কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ গাদাগাদি করে, আবার কেউবা ঝুঁকি নিয়েই।
এমএএস/এমএএইচ/