একুশে বইমেলা

ছায়াবৃত্ত: মানুষের অবদমিত বাসনা

বইটি সম্পর্কে কিছু লেখার আগে বলে নিতে চাই যে, বিষয়টি আসলেই দারুণ কাকতালীয় ব্যাপার! শফিক রিয়ানের ‘ছায়াবৃত্ত’ উপন্যাসের একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে কুড়িগ্রাম। আর এই কুড়িগ্রাম হচ্ছে আমার গ্রামের বাড়ি। তাই বইটির পাতায় পাতায় ধরলা নদীর পাড় কিংবা কুড়িগ্রামের বিভিন্ন স্থানের বর্ণনাগুলো পড়ার সময় মনে হচ্ছিল আমি কেবল একটি গল্প পড়ছি না বরং নিজের চেনা আঙিনায় ঘুরে বেড়াচ্ছি।

বইটি শেষ করার পর অনেকক্ষণ জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকতে হয়েছিল। মনে হচ্ছিল, আমরা যারা যান্ত্রিক এই নগরে প্রতিদিন ফুটপাতে হাঁটি বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়িতে যাতায়াত করি, আমরা একেকটা চলন্ত ছায়ার আড়ালে নিজেদের আসল মানুষটাকে লুকিয়ে রাখি। ‘ছায়াবৃত্ত’ পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে, এটি কেবল একটি ক্রাইম থ্রিলার বা খুনের রহস্যভেদ নয় বরং এটি মানুষের অবদমিত বাসনা, দীর্ঘদিনের লালিত জেদ এবং শেকড়হীন মানুষের অস্তিত্ব সংকটের আখ্যান।

বইটি পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিলো লেখক বিষণ্ণতার সূর বুনেছেন। তাই পড়ার সময় বারবার বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠছিল। বিশেষ করে কুড়িগ্রামের সেই ‘ভিন্নফুল’ আশ্রমের দিনগুলোর স্মৃতিচারণ যখন রাশেদের বয়ানে আসছিল; তখন মনে হচ্ছিল সমাজ যাদের ‘অনাথ’ বলে দাগিয়ে দেয়, তাদের হৃদয়ে ভালোবাসার কাঙালপনা কতটা ভয়ংকর হতে পারে।

গল্পের শুরুটা হয় একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক আবরার হাসানের রহস্যময়ভাবে একটি গাড়িতে আটকা পড়া এবং এএসপি ইমতিয়াজের জেরার মুখে পড়ার মাধ্যমে। খুনের তদন্ত চলছে তিশা নামের এক তরুণীর নৃশংস হত্যাকাণ্ড নিয়ে। গল্পটি শুধু তিশাকে কে মারল, সেই ঘটনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি ডালপালা মেলেছে তিশা, রাশেদ এবং পলাশের শৈশব থেকে, যেখানে তারা একে অপরের ছায়া হয়ে বড় হয়েছে। লেখক এখানে সমাজ-মনস্তত্ত্বের গভীর ক্ষত উন্মোচন করেছেন। দেখিয়েছেন কীভাবে পনেরো বছরের ত্যাগ আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা এক নিমিষেই প্রতিহিংসার অনলে রূপ নিতে পারে।

আরও পড়ুনএখানে কয়েকটি জীবন: যে গল্প হৃদয়ে গাঁথা 

শফিক রিয়ানের গদ্য বেশ ঝরঝরে, তবে তাতে এক ধরনের দার্শনিক গাম্ভীর্য আছে। বিশেষ করে আবরার হাসানের চরিত্রটির মাধ্যমে তিনি যেভাবে হিসাববিজ্ঞানের তত্ত্বের সাথে জীবনের গরমিলগুলো মেলাতে চেয়েছেন, তা বেশ অভিনব। ‘ডেবিট-ক্রেডিট’ বা ‘ট্রায়াল ব্যালেন্স’ দিয়ে জীবনের পাপ-পুণ্যের হিসাব মেলানোর চেষ্টা পড়তে পড়তে মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল, আসলেই আমাদের জীবনটা একটা অমীমাংসিত খতিয়ান।

বইটির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো, এর কবিতা ও উদ্ধৃতির ব্যবহার। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জীবনানন্দ দাশ থেকে শুরু করে গালিবের শায়েরি সবই কাহিনির সাথে এমনভাবে মিশে গেছে যে, মনে হয় না এগুলো জোর করে ঢোকানো। রাশেদ তিশার জন্য দীর্ঘ কবিতা আবৃত্তি করে। যখন সে বলে, ‘পৃথিবীর যাবতীয় নিখুঁত জ্যামিতি আমাকে বড্ড পীড়া দেয়’; তখন তার ভেতরের ভাঙচুরটা পাঠকের চোখের সামনে মূর্ত হয়ে ওঠে।

গল্পের প্রতিটি চরিত্রই যেন রক্ত-মাংসের মানুষ। আবরার হাসান একজন শিক্ষক, যিনি হিসাব মেলানোর নেশায় খুনের রহস্যের গভীরে চলে যান। তিশা মায়াবী তরুণী, যার সৌন্দর্যই শেষ পর্যন্ত তার কাল হয়ে দাঁড়ায় এবং যে তার অন্ধকার অতীত মুছে নতুন জীবন চেয়েছিল। রাশেদ গল্পের সবচেয়ে ট্র্যাজিক এবং জটিল চরিত্র। যার পনেরো বছরের নীরব ত্যাগ শেষমেশ এক পাশবিক দানবে পরিণত হয়।

অপরদিকে পলাশ একটি নিঃশব্দ ছায়া, যে ঝড়ের ঝাপটায় খড়কুটোর মতো উড়ে যায়। যার কোনো স্বতন্ত্র পরিচয় সমাজ রাখেনি। আর আহনাফ ধনীর দুলাল, যে সরল ভালোবাসার অপরাধে এক নিষ্ঠুর প্রতিহিংসার শিকার হয়। এএসপি ইমতিয়াজ আইনের লোক, যিনি অপরাধ ধরেন কিন্তু মানুষের মনের জটিল সমীকরণগুলো সব সময় মেলাতে পারেন না।

আরও পড়ুনবড়বেলার স্কুলজীবন: সময়ের আনন্দ ও বিষাদ-গাথা 

পলাশের পরিণতির কথা পড়তে গিয়ে সত্যি বলতে আমার গলা আটকে এসেছিল। সমাজে এমন কত পলাশ আছে; যারা শুধু ‘উপজাত’ হিসেবে বেঁচে থাকে এবং নীরবে হারিয়ে যায়! লেখক দেখিয়েছেন, রাশেদ যখন আহনাফকে খুন করছে বা তিশার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে, সে তখন আসলে সমাজ আর তার নিজের দারিদ্র্যের ওপর প্রতিশোধ নিচ্ছিল। তার প্রশ্নগুলো ‘আমার অযোগ্যতা কী? আমার অপরাধ কি? একটাই যে আমি নিচু ঘরের সন্তান?’ পাঠককে দীর্ঘ অপরাধবোধে ফেলে দেয়।

তবে বইটির কিছু জায়গায় অপরাধের তদন্ত প্রক্রিয়া বা আবরার হাসানের তদন্তের সুযোগ পাওয়ার বিষয়টি কিছুটা নাটকীয় মনে হতে পারে। বাস্তব জীবনে একজন শিক্ষককে পুলিশ কতটা জায়গা দেয়, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। কিন্তু সাহিত্যের খাতিরে এটুকু ছাড় দেওয়া যায়। এ ছাড়া কিছু কিছু জায়গায় মনে হচ্ছিলো একটু ঝিমিয়ে যাচ্ছে গল্প। কিন্তু কিছু সময় পর আবার ঠিক ভাবে গল্প তার গতিতেই চলেছে।

‘ছায়াবৃত্ত’ কেবল একটি রহস্যগল্প নয়, এটি আমাদের চারপাশের পরিচিত জগতের ভেতরের এক অন্ধকার জ্যামিতি। যারা মানুষের মনের জটিলতা, সামাজিক বৈষম্য এবং ভালোবাসার ভয়ংকর রূপ দেখতে পছন্দ করেন। তাদের জন্য বইটি একটি অনবদ্য পাঠ হতে পারে। এ পৃথিবীর হিসাববিজ্ঞানে তিশা বা পলাশদের কোনো এন্ট্রি হয়তো থাকে না কিন্তু তারা আমাদের বুকের ভেতর এক অনন্ত বিষণ্ণতার ছায়া ফেলে রেখে যায়।

বইয়ের নাম: ছায়াবৃত্তলেখক: শফিক রিয়ানজনরা: থ্রিলারপ্রচ্ছদ: পরাগ ওয়াহিদপ্রকাশনী: নবকথন প্রকাশনীমূল্য: ২৮০ টাকা।

এসইউ