২০২৬ সালের আইপিএল শুরু হচ্ছে শনিবার থেকে, আর টুর্নামেন্টের ১৯তম আসরকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা গল্প, আবেগ, প্রত্যাশা আর জমজমাট প্রতিদ্বন্দ্বিতার উত্তাপ। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন রয়েল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু নতুন মৌসুম শুরু করছে ঘরের মাঠ এম চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে সানরাইজার্স হায়দরাবাদের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে।
তবে শিরোপাজয়ী দলের জন্য এবারের শুরুটা আনন্দের চেয়ে অনেক বেশি আবেগঘন। গত ৪ জুন শিরোপা উদযাপনের সময় স্টেডিয়ামের বাইরে পদদলিত হয়ে ১১ জন সমর্থকের মৃত্যুর ঘটনা এখনও ভারি করে রেখেছে পরিবেশ। এই ঘটনার স্মরণে কর্ণাটক স্টেট ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন স্টেডিয়ামে স্থায়ীভাবে ১১টি আসন ফাঁকা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং প্রথম ম্যাচের অনুশীলনে আরসিবি খেলোয়াড়রা ১১ নম্বর জার্সি পরবেন।
তবে মাঠের ক্রিকেটে আবেগের জায়গা থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন। আরসিবি এবারের আসরে বড় ধাক্কা খেয়েছে বোলিং বিভাগে। গত মৌসুমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা জশ হ্যাজলউড পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় থাকায় শুরুতে দলে থাকছেন না, আর যশ দয়াল ব্যক্তিগত অভিযোগের কারণে পুরো মৌসুমেই অনুপস্থিত। ফলে অভিজ্ঞ ভুবনেশ্বর কুমার, ক্রুনাল পান্ডিয়া, সুয়াশ শর্মা ও বাঁ-হাতি পেসার মঙ্গেশ যাদবদের ওপর নির্ভর করতে হবে দলটিকে।
অন্যদিকে সানরাইজার্স হায়দরাবাদও পিছিয়ে নেই সমস্যায়। নিয়মিত অধিনায়ক প্যাট কামিন্স শুরুর দিকে খেলতে পারবেন না, ফলে ইশান কিশান অন্তর্বর্তীকালীন অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। বোলিং বিভাগে ব্রাইডন কার্স, জয়দেব উনাদকাট, হার্শাল প্যাটেল ও হার্শ দুবের মতো বিকল্প থাকলেও সমতল উইকেটে তাদের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ফলে দুই দলই ব্যাটিং শক্তির ওপর ভরসা রাখছে। আরসিবির দলে রয়েছেন বিরাট কোহলি, টিম ডেভিড, ফিল সল্ট, জ্যাকব বেথেল, অধিনায়ক রজত পাতিদার ও রোমারিও শেফার্ড; আর হায়দরাবাদের হয়ে ট্রাভিস হেড, অভিষেক শর্মা, ইশান কিশান ও হেনরিখ ক্লাসেন বড় ভরসা।
আইপিএলের সবচেয়ে সফল তিন দল মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স, চেন্নাই সুপার কিংস এবং কলকাতা নাইট রাইডার্স- এই তিনটি দল মিলে জিতেছে মোট ১৩টি শিরোপা। তবে গত মৌসুম তাদের জন্য ছিল হতাশার। মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স চতুর্থ হয়ে প্লে-অফে উঠলেও শক্তির ঘাটতি স্পষ্ট ছিল, তাই এবার তারা পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নিজেদের মর্যাদা ফেরাতে চায়। কলকাতা নাইট রাইডার্স অষ্টম এবং চেন্নাই সুপার কিংস দশম হয়ে শেষ করেছিল গত আসর।
চেন্নাই এবার দল গুছিয়েছে নতুন করে। রাজস্থান রয়্যালস থেকে সাঞ্জু স্যামসনকে দলে নেওয়ার পাশাপাশি ম্যাট হেনরি ও নুর আহমদকে যুক্ত করেছে তারা। দলটি এখনও অপেক্ষা করছে ‘ওল্ড লায়ন’ মহেন্দ্র সিং ধোনির শেষ ঝলকের জন্য, যিনি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে রহস্য বজায় রেখেছেন।
কলকাতা দলে যুক্ত করেছে টিম সেইফার্ট, ফিন অ্যালেন, রাচিন রাবিন্দ্রা ও ক্যামেরন গ্রিনকে, যিনি আইপিএল ইতিহাসে বিদেশি খেলোয়াড় হিসেবে সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক নিয়ে এসেছেন। অধিনায়ক আজিঙ্কা রাহানে দলকে নেতৃত্ব দেবেন, আর সহ-অধিনায়ক রিঙ্কু সিংকে নিতে হবে ফিনিশারের ভূমিকা, যা এতদিন পালন করতেন আন্দ্রে রাসেল। বোলিংয়ে বরুণ চক্রবর্তি ও সুনিল নারিন থাকলেও পেস আক্রমণ কিছুটা দুর্বল।
রাজস্থান রয়্যালস ও গুজরাট টাইটান্স আরও একটি শিরোপা জয়ের লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামবে, আর দিল্লি ক্যাপিটালস, পাঞ্জাব কিংস ও লখনৌ সুপার জায়ান্টস নিজেদের প্রথম শিরোপার খোঁজে লড়বে।
এবারের আইপিএলে আরেকটি বড় আকর্ষণ দুই অভিজ্ঞ তারকা বিরাট কোহলি ও রোহিত শর্মা। কোহলি গত মৌসুমে আরসিবিকে প্রথম শিরোপা এনে নিজের অপূর্ণতা ঘোচালেও এবার তার সামনে চ্যালেঞ্জ নিজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। অন্যদিকে ৩৮ বছর বয়সী রোহিত শর্মা এখনও আইপিএলের কোনো মৌসুমে ৫৩৮ রানের বেশি করতে পারেননি।
এবার তিনি সেই সীমা ভাঙতে চান এবং মুম্বাইকে ষষ্ঠ শিরোপা এনে দিতে মরিয়া। সাম্প্রতিক সময়ে তার ফিটনেস উন্নতি নিয়েও আলোচনা হয়েছে, এমনকি ইংল্যান্ড কোচ ব্রেন্ডন ম্যাককালাম মজা করে তার ওজন কমানো নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন।
প্রতিবারের মতো এবারও কিছু নতুন ও আনক্যাপড ক্রিকেটার নজর কাড়ার অপেক্ষায়। দিল্লি ক্যাপিটালসের আউকিব নবী, রাজস্থান রয়্যালসের কার্তিক শর্মা ও চেন্নাইয়ের প্রশান্ত ভিরের মতো খেলোয়াড়রা নিজেদের প্রমাণের সুযোগ খুঁজছেন।
সব মিলিয়ে আগামী ৬৫ দিনে আইপিএল ২০২৬ দেবে শিরোপার লড়াই, অভিজ্ঞতার সঙ্গে তারুণ্যের সংঘর্ষ, হারানো গৌরব ফিরে পাওয়ার চেষ্টা এবং নতুন তারকাদের উত্থানের এক রোমাঞ্চকর মঞ্চ। এখন দেখার বিষয়, পরিচিত তারকারাই আবার দাপট দেখাবেন, নাকি নতুন মুখেরা বদলে দেবে ক্রিকেটের এই জনপ্রিয় মঞ্চের গল্প।
আইএইচএস/