বিসিবির নির্বাচনে স্বচ্ছতা ছিল না। অনিয়মে পরিপূর্ণ এবং সরকারি হস্তক্ষেপের এক নগ্ন দলিল ছিল গত বছরের অক্টোবরের বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচন।
ঢাকার ৫০ ক্লাব ও জেলা-বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থা এবং সার্ভিসেস, বিশ্ববিদ্যালয়, সাবেক ক্রিকেটারদের পক্ষ থেকেও ওই নির্বাচন পক্ষপাতদুষ্ট, অনিয়মে ভরা এবং সরকারি হস্তক্ষেপে অস্বচ্ছ নির্বাচন বলে দাবি করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ওই তিন ক্যাটাগরির আবেদনের প্রেক্ষিতে বিসিবি তথা ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোর অভিভাবক সংস্থা জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ পুরো ঘটনা খতিয়ে দেখতে এবং বিসিবি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আসলে কী ঘটেছিল, তাতে স্বচ্ছতার পরিমাণ ছিল কি না, থাকলে কতটা, নির্বাচনি প্রক্রিয়া কি বিসিবি ও জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের গঠনতন্ত্র, আইন ও নিয়ম মেনে হয়েছে, নাকি সরকারি কোনো হস্তক্ষেপ ছিল- তা জানতেই পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ।
সাবেক বিচারপতি একেএম আসাদুজ্জামানকে প্রধান করে গত ১১ মার্চ ওই তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা দেয় এনএসসি।
কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সেলিম ফকির, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম, সিনিয়র ও ক্রীড়া সাংবাদিক এটিএম সাইদুজ্জামান এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সালেহ আকরাম সম্রাট।
আগেই জানা গেছে, এনএসসি তদন্ত কমিটিকে ১৫ কর্মদিবস সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে এবং সেই সময়ের মধ্যে তাদের তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল ও সুপারিশমালা প্রদানের কথা জানানো হয়েছে।
১১ মার্চ তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। আজ ২৯ মার্চ। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে হিসেব করলে ১৮ দিন। ঘটনাবহুল ও প্রশ্নবিদ্ধ বিসিবি নির্বাচন নিয়ে তদন্ত কমিটির কাজের অগ্রগতি কতটা- এ প্রশ্ন অনেকের মনেই উঁকি দিতে শুরু করেছে।
অবশেষে সেই কৌতূহলী প্রশ্নের জবাবও মিলেছে। এই কমিটি গঠনের পরদিন, অর্থাৎ ১২ মার্চ থেকে আজ ২৯ মার্চ পর্যন্ত যে ১৮ দিন কাটলেও তার বড় অংশই ছিল সাপ্তাহিক ছুটি, শবে-কদর এবং ঈদ-উল ফিতরের লম্বা ছুটি।
কমিটি গঠনের পর প্রতি শুক্র ও শনিবার সরকারি ছুটি হিসেবে গণ্য হবে। পাশাপাশি ঈদুল ফিতরের আগে শবে কদরের ছুটি এবং ঈদের সপ্তাহব্যাপি ছুটিও যুক্ত হয়েছে। হিসাব করে দেখা যাচ্ছে, তদন্ত কমিটি এখন পর্যন্ত ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে মাত্র ৬টি কর্মদিবস পেয়েছে। অর্থাৎ আরও ৯টি কর্মদিবস বাকি আছে।
এখন সেই ৯ কর্মদিবস কবে শেষ হবে, সেটাও প্রশ্ন। এর উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, আগামীকাল সোমবার থেকে (মঙ্গলবার ও বুধবারসহ) বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৪ দিন, এরপর আবার শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি। তারপর রোববার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত আরও ৫ দিন। মোট ৯ কর্মদিবস। ক্যালেন্ডার অনুযায়ী এই ৯ কর্মদিবস শেষ হবে আগামী ৯ এপ্রিল।
এদিকে তদন্ত কমিটির পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে মিডিয়া কোনো বক্তব্য তুলে ধরা হয়নি। যে কারণে তাদের কাজের গতি, প্রকৃতি ও অগ্রগতি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের কিছুই জানা নেই। অবশ্য কোনো সরকারি তদন্ত কমিটি নীরবে ও সতর্কভাবেই কাজ সম্পন্ন করে। মিডিয়ায় খুব বেশি কথা বলা হয় না। এবারের তদন্ত কমিটিও বেশ সতর্ক।
তবে আজ ২৯ মার্চ সন্ধ্যার পর জানা গেছে, কমিটির অন্যতম সদস্য সিনিয়র সাংবাদিক এটিএম সাইদুজ্জামান এখন থেকে তদন্ত কমিটির কাজ নিয়ে মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলবেন। তবে তা নিয়মিত নয়, বরং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশ্নের উত্তর দেবেন।
তদন্ত কমিটির কাজের অগ্রগতি নিয়ে সন্তুষ্ট সাইদুজ্জামান আজ জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা আজ রোববার আমাদের ষষ্ঠ কর্মদিবস শেষ করেছি। আমাদের হাতে আরও ৯টি কর্মদিবস আছে। আমার মনে হয় আমরা সঠিক পথেই এগোচ্ছি। পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার খুঁটিনাটি বিষয় নিয়েই আমরা কাজ করছি। আমরা সঠিক পথে থেকেই সামনে এগোচ্ছি। আমাদের ধারণা, তদন্ত কাজ দ্রুত গতিতেই চলছে এবং যতটা সম্ভব সুষ্ঠুভাবেই হচ্ছে। যে সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে, আমরা সেই সময়ের মধ্যেই তদন্ত শেষ করতে পারব এবং যথাসময়ে প্রতিবেদন জমা দিতে পারব। পাশাপাশি সুপারিশমালাও নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রস্তুত করা সম্ভব হবে।’
তদন্ত কমিটি কাদের সঙ্গে কথা বলেছে এবং তাদের কাজের ধরন কী? এ প্রশ্নের জবাবে সাইদুজ্জামান বলেন, ‘জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ আমাদের তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছে। আমরা বিচারক নই, আমাদের কাজ বিচার করা নয়- শুধু তদন্ত করা। বিসিবির নির্বাচনী প্রক্রিয়া কেমন ছিল, স্বচ্ছ না অস্বচ্ছ, তা খতিয়ে দেখাই আমাদের দায়িত্ব। পুরো প্রক্রিয়া কি বিসিবি ও এনএসসির নিয়ম, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী হয়েছে, নাকি কোনো অনিয়ম বা অন্য কোনো হস্তক্ষেপ ছিল- সে সব বিষয় নিয়েই আমরা কাজ করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা অভিযোগের ভিত্তিতে প্রথমে অভিযোগকারী ও অভিযুক্তদের সঙ্গে কথা বলা শুরু করেছি এবং এখনো তা চলছে। বিসিবির তিনটি ক্যাটাগরির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গেও আলাদা করে কথা বলা হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে। এছাড়া যেহেতু আমাদের একটি পূর্ণাঙ্গ সুপারিশমালা তৈরি করতে হবে, তাই দেশের অভিজ্ঞ কয়েকজন ক্রিকেট সংগঠকের সঙ্গেও কথা বলেছি। নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু করতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, কোন বিষয়গুলো নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে—এসব বিষয় চিহ্নিত করতেই তাদের মতামত নেওয়া হয়েছে।’
এআরবি/আইএইচএস/