ব্রাজিল জাতীয় ফুটবল দল- আধুনিক ফুটবল ইতিহাসের দীর্ঘ সময়জুড়ে বিশ্বকাপের সেরা দল হিসেবে পরিচিত ছিল। বিশেষ করে ২০০০ সালের শুরুর দিকে তাদের দাপট ছিল চোখে পড়ার মতো। যদিও সর্বশেষ তারা বিশ্বকাপ জিতেছে ২০০২ সালে। এরপর থেকে ধীরে ধীরে সেই আধিপত্য ম্লান হয়ে গেছে এবং সাম্প্রতিক আসরগুলোতে ধারাবাহিক ব্যর্থতা প্রশ্ন তুলেছে তাদের বর্তমান সক্ষমতা নিয়ে।
সাম্প্রতিক বিশ্বকাপগুলোতে টানা দুইবার (২০১৮ ও ২০২২) কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নিয়েছে ব্রাজিল। একটি দলের জন্য, যারা সাফল্য মাপে শিরোপায়, শুধু গভীরে যাওয়া নয় বরং ট্রফি জেতাই যেখানে লক্ষ্য, সেখানে এই ফলাফল হতাশাজনক। প্রত্যাশা আর বাস্তবতার এই ব্যবধান এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বর্তমান দলেও বিশ্বমানের খেলোয়াড়ের অভাব নেই। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, এডার মিলিতাও এবং রাফিনহার মতো ফুটবলাররা গতি, সৃজনশীলতা এবং আক্রমণভাগে অনিশ্চয়তা তৈরির ক্ষমতা রাখেন। কাগজে-কলমে এই আক্রমণভাগ যে কোনো প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে পারে; কিন্তু বাস্তবে ব্যক্তিগত দক্ষতাকে একটি সমন্বিত আক্রমণাত্মক কাঠামোয় রূপ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
এ জায়গাতেই নতুন কোচ কার্লো আনচেলত্তির আগমন বড় প্রত্যাশা তৈরি করেছে। বিশ্বের সেরা কোচদের একজন হিসেবে পরিচিত আনচেলত্তি বিশেষ করে রিয়াল মাদ্রিদে তার সময়কালে তারকা খেলোয়াড়দের সঠিকভাবে ব্যবহার এবং ড্রেসিংরুম সামলানোর দক্ষতার জন্য বিখ্যাত। তার লক্ষ্য হবে আক্রমণের স্বাধীনতা বজায় রেখে একটি সংগঠিত দল গড়ে তোলা।
তবে সমস্যাটা শুধু আক্রমণভাগে সীমাবদ্ধ নয়। সাম্প্রতিক সময়ে ব্রাজিলের বড় দুর্বলতা ছিল রক্ষণ এবং মিডফিল্ডে ভারসাম্যের অভাব। যদিও দলে অ্যালিসন বেকারের মতো বিশ্বমানের গোলরক্ষক এবং গ্যাব্রিয়েল মাগালায়েস-এর মতো ডিফেন্ডার আছেন, তবুও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দল ভেঙে পড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বলিভিয়া ও জাপানের বিপক্ষে হার, বিশেষ করে জাপানের বিপক্ষে ২-০ এগিয়ে থেকেও হেরে যাওয়া, এই দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে দিয়েছে।
এই ম্যাচগুলোতে দেখা গেছে, ব্রাজিল কিছু সময় আধিপত্য বিস্তার করলেও পুরো ম্যাচে সেই নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারছে না। অল্প সময়ের মধ্যে একাধিক গোল হজম করা তাদের বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মিডফিল্ডে ক্যাসেমিরো এবং ব্রুনো গুইমারেসের মতো খেলোয়াড়দের ওপরই দায়িত্ব থাকবে আক্রমণ ও রক্ষণে ভারসাম্য আনা, খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং ডিফেন্সকে সুরক্ষা দেওয়া।
ইএসপিএন র্যাংকিং অনুযায়ী, ব্রাজিল এখনও বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এবং ফিফা বিশ্বকাপে তাদের শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেই ধরা হচ্ছে। তবে শুধু তারকা খেলোয়াড় থাকলেই বিশ্বকাপ জেতা যায় না- এর জন্য প্রয়োজন কৌশলগত শৃঙ্খলা, দলগত সমন্বয় এবং দৃঢ় রক্ষণ।
দুই হাজার সালের শুরুর ব্রাজিল দলগুলো যেমন সৌন্দর্য ও কার্যকারিতার নিখুঁত মিশ্রণ ছিল, বর্তমান দল সেই ভারসাম্য খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছে। এখন মূল প্রশ্ন হচ্ছে- ব্রাজিল কি আবার একটি পূর্ণাঙ্গ দল হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে পারবে?
কার্লো আনচেলত্তির নেতৃত্বে সেই সম্ভাবনা নতুন করে জেগে উঠেছে। যদি তিনি দলকে সঠিকভাবে সংগঠিত করতে পারেন এবং আক্রমণভাগের প্রতিভাকে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারেন, তাহলে ব্রাজিল আবারও বিশ্ব ফুটবলে তাদের হারানো আধিপত্য ফিরে পেতে পারে।
আইএইচএস/