দেশজুড়ে

হামে মারা গেলো পাঁচশিশু, উদ্বিগ্ন অভিভাবকেরা

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালের শিশু বিভাগে হঠাৎ বেড়েছে হাম আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। চলতি মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে অস্বাভাবিকভাবে রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্বিগ্ন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

গত ১২ দিনে হাসপাতালটিতে ১০৬ জন হাম আক্রান্ত শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় দুজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মোট পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা নির্দেশ করে। চিকিৎসক ধারণা, করোনা পরিস্থিতি ও ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের কারণে টিকাদান সঠিকভাবে না হওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

যে পাঁচ শিশু মারা গেছে, তাদের ময়মনসিংহ নগরী, সদর উপজেলা, গৌরীপুর উপজেলা ও নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলা থেকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছিল।

শনিবার (২৮ মার্চ) বিকেল ৫টার দিকে নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার আয়নাল হকের ছয় মাস বয়সি নুরুন্নবী নামের এক শিশুকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে এসে ভর্তি করা হয়। এদিন রাত ১১টার দিকে শিশুর মৃত্যু হয়।

আগের দিন শুক্রবার (২৭ মার্চ) দুপুরে ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চরগোবদিয়া গ্রামের আবদুর রহিমের সাত মাস বয়সি ছেলে লিয়নকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। পরদিন শনিবার (২৮ মার্চ) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে এ শিশুও মারা যায়।

গত ২৬ মার্চ ময়মনসিংহ নগরের নওমহল এলাকা থেকে হাসপাতালে নিয়ে আসা তনুসা নামের তিন বছর বয়সি এক শিশুর মৃত্যু হয়। একই দিন পুলিশ লাইনস এলাকা থেকে নিয়ে আসা সামিয়া নামের দুই বছর বয়সি আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়।

১৫ মার্চ জেলার গৌরীপুরের কলতাপাড়া এলাকা থেকে ভর্তি করা হয়েছিল ওয়াজকুরুনি নামের চার মাস বয়সি এক হাম আক্রান্ত শিশুকে। এ শিশুটিও ১৮ মার্চ চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।

বর্তমানে হাসপাতালে হাম আক্রান্ত শিশু রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে চিকিৎসক ও নার্সরা। গত দুই মাস ধরে মাঝে মধ্যে এক-দুজন হাম রোগী পাওয়া গেলেও চলতি মাসের মাঝামাঝিতে হঠাৎ এর সংখ্যা বেড়ে গেছে। নির্ধারিত শয্যার তুলনায় বেশি রোগী ভর্তি থাকায় অনেক ক্ষেত্রে এক বিছানায় দুই শিশুকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। কেউ কেউ মেঝেতেও চিকিৎসা নিচ্ছে। এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হাসপাতাল প্রশাসন ইতোমধ্যে হাম আক্রান্ত রোগীদের জন্য পৃথক ‘হাম কর্নার‘ চালু করেছে। তিনটি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে।

চিকিৎসকদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা হাঁচি-কাশি বা সংস্পর্শের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, চোখ ও মস্তিষ্কে প্রদাহসহ নানা জটিলতা দেখা দিচ্ছে, যা জীবনঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ছাড়াও জেলার উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেও হাম আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে এসে ভর্তি করা হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেও হাম রোগীদের জন্য আলাদা বেডের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হামে মারা যাওয়া লিয়ন নামের শিশুর বাবা আবদুর রহিম জানান, ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চরগোবদিয়া গ্রাম থেকে ঈদের আগে ছেলেকে নিউমোনিয়ার সমস্যা নিয়ে পাঁচদিন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। বাড়িতে ফিরিয়ে আনার পর হাম বের হলে আবার হাসপাতালে নিয়ে আসেন। পরে শনিবার (২৮ মার্চ) বিকেলে একমাত্র ছেলের মৃত্যু হয়েছে।

ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট থেকে হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছে ১৫ মাস বয়সি আলমাছ মিয়া ও নেত্রকোনা পুর্বধলা থেকে হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছে ১৩ মাস বয়সি সামিয়া আক্তার। এ শিশুদের পরিবার জানায়, হামে আক্রান্ত হয়ে কয়েকদিন ধরে শিশুরা হাসপাতালে ভর্তি আছে। কিন্তু সুস্থ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ফলে শিশুদের নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা।

হাসপাতালের হাম মেডিকেল দলের ফোকালপারসন সহযোগী অধ্যাপক মোহা. গোলাম মাওলা বলেন, চলতি মাসের মাঝামাঝি থেকে হাম আক্রান্ত শিশু রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। এখন পর্যন্ত ১০৬ জন হাম আক্রান্ত শিশু ভর্তি হয়েছে। এরমধ্যে পাঁচ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম আক্রান্ত তিন শিশু ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে ৬৬ জন হাম আক্রান্ত শিশু ভর্তি আছে। হামের টিকা নিয়েছে এবং নেয়নি, দুই ধরনের রোগী ভর্তি হচ্ছে। হাম আক্রান্ত শিশুরা হামের পাশাপাশি জ্বর ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ হওয়ায় রোগীর হাঁচি-কাশি, কথা বলা বা সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে এ ভাইরাস দ্রুত বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। হাম আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য ইতোমধ্যে তিনটি পৃথক মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে শিশু বিভাগের তিনটি কক্ষ নিয়ে করা হাম কর্নার সরিয়ে আলাদা আইসোলেশন ওয়ার্ড চালুর প্রস্তুতি চলছে।

এ বিষয়ে ময়মনসিংহের সিভিল সার্জন (ভারপ্রাপ্ত) ফয়সল আহমেদ বলেন, জেলার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ২২ জন সন্দেহজনক হাম আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। বর্তমানে ৬ জন ভর্তি আছে। হাম আক্রান্ত রোগী বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রত্যেক স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তিনটি করে আলাদা বেডের ব্যবস্থা করা হয়েছে। হাম আক্রান্ত শিশুর অভিভাবকদের সচেতন থাকতে হবে। শিশুদের নির্ধারিত সময় অনুযায়ী টিকা নিশ্চিত করতে হবে।

কামরুজ্জামান মিন্টু/আরএইচ/এমএস