যশোরেও হামের প্রাদুর্ভাবের শঙ্কায় সতর্কাবস্থায় রয়েছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। গত দুই মাসে যশোরের দুটি হাসপাতালে হামের লক্ষণ নিয়ে দুই শতাধিক শিশু চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে মার্চ মাসে দশ শিশুর হামে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। অনেক ক্ষেত্রে আক্রান্ত শিশুরা হামের টিকা নেয়নি বলেও প্রাথমিক তথ্যে উঠে এসেছে। এ কারণে হামের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতাল বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে যশোরের স্বাস্থ্য বিভাগ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গত দুই মাসে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল ও শিশু হাসপাতালে দুই শতাধিক শিশু হামের লক্ষণ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। রোববার যশোর শিশু হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, রোগীর চাপ বেড়েছে উল্লেখযোগ্যহারে। শিশুদের নিয়ে অভিভাবকদের দীর্ঘ সারি। কেউ এসেছেন হাম শনাক্ত করতে, কেউ আবার বসন্ত সন্দেহে পরীক্ষা করাতে।
শহরের ষষ্ঠীতলা এলাকার বাসিন্দা জুলিয়া খাতুন তার ১৫ মাস বয়সি মেয়েকে হাসপাতালে ভর্তি করেছেন। তিনি জানান, জ্বর ও শরীরে লাল র্যাশ নিয়ে তার মেয়েকে ভর্তি করা হয়। পরে চিকিৎসকেরা নিশ্চিত করেন, শিশুটি হামে আক্রান্ত। তিনি বলেন, ‘টিকার কার্ড হারিয়ে যাওয়ায় হাম-রুবেলার টিকা দেওয়া হয়নি।’
অন্যদিকে মণিরামপুর উপজেলার দুর্গাপুর গ্রামের উজ্জ্বল দাস জানান, তার আট মাস বয়সি মেয়ের জ্বর ও শরীরে র্যাশ দেখা দিলে প্রথমে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে নেওয়া হয়। সেখান থেকে হামের সন্দেহে শিশু হাসপাতালে পাঠানো হলে তিনি মেয়েকে ভর্তি করেন।
শিশু হাসপাতালের ওয়ার্ড ইনচার্জ সাইদা সুলতানা জানান, ফেব্রুয়ারি ও মার্চে হামের প্রকোপ দেখা দিয়েছে। হামের লক্ষণ নিয়ে প্রতিদিনই নতুন রোগী আসছে। দুই মাসে অন্তত ৯০ জন শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অনেক শিশুর হাম রুবেলা টিকা গ্রহণের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।
হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. সৈয়দ নূর-ই হামিম বলেন, হাসপাতালে টিকার কোনো সংকট নেই। তবে অভিভাবকদের অসচেতনতার কারণেই শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বাড়ছে। সচেতনতা বাড়ানো গেলে এ হার কমানো সম্ভব।
যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের রেজিস্ট্রার ডা. আফসার আলী জানান, গত তিন মাসে ৪৫ জন শিশু হামের লক্ষণ নিয়ে ভর্তি হয়েছিল ও তারা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। তিনি বলেন, ‘কিছু ক্ষেত্রে টিকা নেওয়ার পরও সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে বিশেষজ্ঞরা গবেষণা করছেন।’
যশোরের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. নাজমুস সাদিক রাসেল বলেন, যশোরেও হামের প্রাদুর্ভাবের শঙ্কা দেখা দেওয়ায় স্বাস্থ্যবিভাগ সতর্কাবস্থায় রয়েছে। ইতোমধ্যে জেলার সকল সরকারি হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ড প্রস্তুত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শিশুদের জ্বরসহ শরীরে র্যাশ বা ঘামাচির মতো দেখা গেলে শিশুদের স্কুলে পাঠানো থেকে বিরত থাকা এবং হাসপাতাল বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার জন্য অভিভাবকদের অনুরোধ করা হয়েছে।
ডা. নাজমুস সাদিক উল্লেখ করেন, শিশুদের হামের টিকা ১০ মাস ও ১৫ মাসে দেওয়া হয়। ফলে অনেক শিশু দশ মাস বয়সের আগে অর্থাৎ টিকা নেওয়ার বয়স হওয়ার আগেই আক্রান্ত হচ্ছে। হামের প্রধান লক্ষণ হলো উচ্চমাত্রার জ্বর (১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত), তীব্র কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া ও সারা শরীরে লালচে ফুসকুড়ি বা র্যাশ দেখা যাওয়া। এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার জন্য তিনি অভিভাবকদের আহ্বান জানান।
যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। চলতি মাসে (মার্চ) ল্যাব পরীক্ষায় দশটি শিশুর হামে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। এছাড়া অনেক শিশুই হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে আসছেন। যশোরে হামের টিকার কোনো ঘাটতি নেই উল্লেখ করে সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা অভিভাবকদের আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
মিলন রহমান/এমএন/এমএস