খুলনায় লবণাক্ততা ব্যবস্থাপনা ও গবেষণা কেন্দ্রের পাশে চলছে নদী থেকে বালু উত্তোলন। ফলে ক্ষতি হচ্ছে উর্বর কৃষিজমি। স্থানীয় কৃষকরাও পড়েছেন বিপাকে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বটিয়াঘাটা উপজেলার ৩ নম্বর গঙ্গারামপুর ইউনিয়নের গাগড়ামারি এলাকায় এটিএস কোম্পানির একটি প্রজেক্টে বালু ভরাটের কাজ চলছে। এ প্রজেক্টে সরাসরি নদী থেকে বালু উত্তোলন করে জমি ভরাটের কাজ চলছে। পাইপলাইন বসিয়ে নদী থেকে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলন করে জমিতে আনা হচ্ছে। যার কারণে লবণাক্ত পানিতে ক্ষতি হচ্ছে আশপাশের কৃষিজমি।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ফুট বালু প্রজেক্টে দেওয়া হয়েছে। নদী থেকে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করছেন ৩ নম্বর গঙ্গারামপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আসলাম হালদার। তিনি অনেক আগে থেকে এলাকায় বালু ও জমির ব্যবসা করছেন। ৫ আগস্টের পর কিছুদিন বালুর ব্যবসা বন্ধ ছিল। তবে পরে তিনি আবার জমি ভরাটের কাজ শুরু করেছেন। এছাড়াও গঙ্গারামপুর এলাকায় বিভিন্ন স্থানে বালু ফেলে জমি ভরাটের কাজ চলছে। যার কারণে অনেক কৃষিজমির ক্ষতি হচ্ছে। লবণাক্ত পানির কারণে সামনের দিনে ফসল উৎপাদন এক ধরনের অনিশ্চয়তায় রয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা।
বালু উত্তোলনের দায়িত্বে থাকা ইউপি চেয়ারম্যান আসলাম হালদারের ম্যানেজার সিদ্ধার্থ শংকর মল্লিক বলেন, আসলাম ভাই কোম্পানির কাছ থেকে কাজ নিয়ে বালু ভরাট করছেন। আমি শুধু দেখাশোনা করছি।
তবে মো. আসলাম হালদারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন আমি করছি না। খুলনার একজন ঠিকাদার এটিএস কোম্পানিতে বালু দিচ্ছেন। আমি আর কিছু জানি না।
এটিএস কোম্পানির পাশে অবস্থিত ‘লবণাক্ততা ব্যবস্থাপনা ও গবেষণা কেন্দ্র’-এর কর্মকর্তারা জানান, ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলন করে জমিতে ফেলায় লবণাক্ত পানি কৃষিজমিতে ঢুকে পড়ছে। এমনকি গবেষণাকেন্দ্রের ফসলের মাঠও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গবেষণা কেন্দ্রের মাঠেও উঠছে না ফসল। একটি প্রভাবশালী মহল প্রথমে গবেষণাকেন্দ্রের ভেতর থেকে ড্রেজারের পাইপলাইন বসিয়ে বালি নিতে চেয়েছিল। কিন্তু বাধার মুখে তারা আর তা করতে পারেনি। তারপর তারা রাস্তার ওপর থেকে পাইপলাইন নিয়েছে।
স্থানীয় কৃষক চৈতন্য দাস বলেন, জমি ভরাট করতে শুকনো বালু বা মাটি ব্যবহার করা যায়। কিন্তু লবণাক্ত পানির বালু সরাসরি নদী থেকে জমিতে দেওয়ায় আশপাশের কৃষিজমি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। লবণ পানি চুষে নিচ্ছে উর্বর মাটি। যার কারণে উর্বর মাটি অনুর্বর হয়ে পড়ছে। তার প্রমাণ গবেষণাকেন্দ্রের ফসলের মাঠ। লবণ পানির কারণে জমিতে ফসল উঠছে না। কৃষি ফসল উৎপাদন না হলে তো আমরাই ক্ষতিগ্রস্ত হব। এটা আসলে কেউ বুঝতে চাইছে না।
অন্য কৃষক জগলুল বলেন, লবণাক্ত পানি কৃষিজমির শত্রু। এমনিতে এ অঞ্চলের জমি লবণাক্ত। বৃষ্টির সময় মিষ্টি পানির কারণে লবণাক্ততা কিছুটা হ্রাস পায়, বিধায় এখন জমিতে ভালো ফসল হয়। তবে নদীর পানি এ মাটিতে ঢুকলে কৃষিজমির উর্বরতা হারাবে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিপ্রযুক্তি ডিসিপ্লিনের প্রফেসর ড. বিধান চন্দ্র সরকার বলেন, লবণ ফসলের জন্য ক্ষতিকর। লবণাক্ততার প্রভাবে ফসলের ফলন ভালো হয় না। লবণাক্ত পানি জমির উর্বরতা মারাত্মকভাবে কমিয়ে দেয়, মাটির গঠন নষ্ট করে এবং ফসলের উৎপাদনও কমিয়ে দেয়। এমনকি এটি মাটির পানি ধারণক্ষমতাও কমিয়ে দেয়।
তিনি আরও বলেন, গরমের সময় মাটির পানি বাষ্প হয়ে গেলেও লবণ থেকে যায় মাটিতে। অনেক সময় মাটির ওপর সাদা সাদা লবণও দেখা যায়। এজন্য কৃষি ফসলের জন্য লবণ মারাত্মক ক্ষতিকর।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কেন্দ্রীয় সদস্য ও খুলনার সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধে আইনের সঠিক বাস্তবায়ন প্রয়োজন। নদী থেকে যত্রতত্র বালু উত্তোলনের ফলে নদীর ক্ষতি হচ্ছে এবং পরিবেশের ক্ষতিও হচ্ছে। বালুমহাল ব্যতীত বালু উত্তোলনের ফলে পরিবেশের এবং কৃষিজমির ক্ষতি হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে, যেন অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ হয়। নইলে পরিবেশ হুমকির মুখে পড়বে এবং কৃষিজমির ক্ষতি হবে।
বটিয়াঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) থান্দার কামরুজ্জামান বলেন, নদী থেকে বালু উত্তোলন করা অবৈধ। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরিফুর রহমান/আরএইচ/এমএস