দেশের ক্রীড়াঙ্গনে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার অবসান ঘটিয়ে ক্রীড়াবিদদের জন্য আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চালু হলো ‘ক্রীড়া কার্ড’। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো নিয়মিত আর্থিক সুবিধার আওতায় আসছেন দেশের খেলোয়াড়রা, যা ক্রীড়ায় পেশাদারত্ব গড়ে তোলার পথে বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশে খেলাধুলা মানেই এতকাল বিনোদন, আর পাশাপাশি পেশা হিসেবে ধরা হতো। জাতীয় দলের ক্রীড়াবিদরা দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করে কখনো-সখনো থোক বরাদ্দ, প্রধানমন্ত্রীর অনুদান ছাড়া সেই অর্থে তেমন আর্থিক সুবিধা পাননি। সে কারণেই বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে ‘স্পোর্টস প্রফেশনালিজম’ গড়ে ওঠেনি। খেলাধুলা করেও আর্থিকভাবে স্বচ্ছল থাকা যায়—স্পোর্টস ডিসিপ্লিনকে পেশা হিসেবে নেওয়া সম্ভব—তা এতকাল ছিল ধারণার বাইরে।
ক্রিকেটার ও ফুটবলার ছাড়া সেই অর্থে কোনো ফেডারেশনের ক্রীড়াবিদরা মাসোহারা পান না। কোনো প্রতিযোগিতা সামনে রেখে প্রস্তুতির জন্য একটি থোক বরাদ্দ থাকত ক্রীড়া পরিষদ থেকে। কখনো-কখনো ফেডারেশনও ক্রীড়াবিদদের অনুশীলনের খরচ বহন করেছে। কিন্তু সরকারিভাবে ক্রীড়াবিদরা কখনোই বেতন-ভাতা ও আর্থিক সুবিধা পাননি। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর দেশের ক্রীড়াবিদরা সেই কাঙ্ক্ষিত আর্থিক সুযোগ-সুবিধা পেলেন।
সোমবার সকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই নতুন পদক্ষেপের ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্য অর্জনকারী ১২৯ জন ক্রীড়াবিদকে মোট ২ কোটি ৪৪ লাখ টাকার বিশেষ সম্মাননা ও অর্থ পুরস্কার প্রদান করা হয়। সেই অনুষ্ঠানে বসেছিল বিভিন্ন খেলার তারকাদের মেলা।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ— অঙ্গীকার নিয়ে আমরা ক্রীড়াঙ্গনকে আমূল বদলে দিতে চাই।’ তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী ক্রীড়া দর্শনের কথা স্মরণ করে বলেন, আধুনিক ক্রীড়া কাঠামোর ভিত্তি তিনিই স্থাপন করেছিলেন। বর্তমান সরকার সেই ধারাকে আরও আধুনিকায়ন করে দেশের প্রতিটি জেলায় আন্তর্জাতিক মানের ‘স্পোর্টস ভিলেজ’ এবং প্রতিটি ইউনিয়নে খেলার মাঠ তৈরির মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।
প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন, আগামী ৩০ এপ্রিল থেকে সারাদেশে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ কর্মসূচির মাধ্যমে তৃণমূলের প্রতিভা অন্বেষণ শুরু হবে। এছাড়া ২০২৭ সাল থেকে জাতীয় শিক্ষাক্রমে চতুর্থ শ্রেণি থেকেই খেলাধুলা বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নের অগ্রগতি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘ক্রীড়াবিদদের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই ‘ক্রীড়া কার্ড’ একটি শক্তিশালী ঢাল হিসেবে কাজ করবে। তৃণমূল পর্যায়ে ক্রীড়া শিক্ষা প্রসারে দেশের প্রতিটি উপজেলায় ক্রীড়া অফিসার ও শিক্ষক নিয়োগের জন্য পদ সৃজনের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। এছাড়া বিভাগীয় শহরগুলোর সাতটি বিকেএসপি শাখাকে পূর্ণাঙ্গ বিকেএসপিতে রূপান্তরের মাধ্যমে ঢাকার ওপর চাপ কমিয়ে আঞ্চলিক পর্যায়ে বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা হচ্ছে।’
এ আয়োজনকে ঘিরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হল পরিণত হয়েছিল ক্রীড়াবিদ, সংগঠক, পৃষ্ঠপোষক ও ক্রীড়াসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মিলনমেলায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক এবং যুব ও ক্রীড়া সচিব মাহবুব-উল-আলম মঞ্চে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন।
এছাড়া মন্ত্রিপরিষদের কয়েকজন সদস্য, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিভিন্ন কর্মকর্তারা এই আয়োজনের অংশ নেন। পুরো অনুষ্ঠানের আয়োজক ও ব্যবস্থাপক ছিল ক্রীড়া মন্ত্রণালয় ও জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ।
এ অনুষ্ঠানে আলো ছড়াতে উপস্থিত ছিলেন ক্রিকেট, ফুটবল, আর্চারি ও অন্যান্য ফেডারেশনের শীর্ষ কর্তারা। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলকে দেখা যায় সকাল ১০টায় অনুষ্ঠান শুরুর অল্প কিছুক্ষণ আগে শাপলা হলে। এসে করমর্দন করেন ফারুক আহমেদ ও তামিম ইকবালের সঙ্গে।
বিসিবি সভাপতি আসার আগেই উপস্থিত ছিলেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবাল। লন্ডন থেকে দুবাই হয়ে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ঢাকায় পৌঁছে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আসেন তিনি। তার আগে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছান জাতীয় দলের আরেক সাবেক অধিনায়ক মিনহাজুল আবেদীন নান্নু।
বিসিবির সহ-সভাপতি ফারুক আহমেদও ছিলেন আমন্ত্রিত অতিথিদের সারিতে। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি তাবিথ আউয়াল, বিসিবি সভাপতি বুলবুল ও তামিম ইকবাল বসেছিলেন একই সারিতে। এছাড়া ক্রীড়া সংগঠক মাহবুব আনাম, রফিকুল ইসলাম বাবু, রেদোয়ান বিন ফুয়াদ এবং ফাহিম সিনহাও উপস্থিত ছিলেন।
সাবেক তারকা ক্রিকেটারদের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন জাতীয় ফুটবল দলের দুই সাবেক অধিনায়ক আলফাজ আহমেদ ও মোহাম্মদ সুজন। এছাড়া ফুটবলার ডন এবং সাবেক তারকা ফুটবলার প্রয়াত মোনেম মুন্নার স্ত্রী সুরভি মুন্নাও ছিলেন আমন্ত্রিত অতিথিদের সারিতে।
দেশীয় টেবিল টেনিসের রানি, গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডধারী জোবেরা রহমান লিনুর উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
এআরবি/আইএন