ধুলাবালির ভেতর, ফ্লাইওভারের নিচে, এক মা তার শিশুকে বালতিতে বসিয়ে গোসল করাচ্ছেন—চারপাশে ছুটে চলা ব্যস্ত শহর যেন মুহূর্তের জন্য থেমে তাকিয়ে আছে।
সোমবার মধ্যদুপুর। রাজধানীর মগবাজার চৌরাস্তার মোড় পেরিয়ে হাতিরঝিলমুখী সড়কজুড়ে চিরচেনা ব্যস্ততা। গণপরিবহন, প্রাইভেটকার, অ্যাম্বুলেন্স, ট্রাক, পিকআপভ্যান, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত ও প্যাডেলচালিত রিকশা—সব মিলিয়ে এক অবিরাম গতির নগরজীবন।
এই কোলাহলের মাঝেই, ফ্লাইওভারের নিচে রাস্তার একপাশে বসে থাকা এক হতদরিদ্র মা যেন তৈরি করেছেন ভিন্ন এক জগৎ। একটি কালো বালতিতে বসানো তার দেড় থেকে দুই বছর বয়সী শিশুটি। গায়ে কোনো কাপড় নেই। মা ধীরে ধীরে সাবান মেখে ছোট্ট একটি মগে পানি তুলে শিশুটির শরীরে ঢালছেন—অপরিসীম যত্ন আর মমতায়।
মাত্র দুই-তিন হাত দূরে একটি ভাঙা আলমারির ওপর বসে আছে আরেকটি শিশু—সম্ভবত বড় ভাই বা বোন। গোসলরত শিশুটির দিকে তাকিয়ে সে হাততালি দিয়ে হাসছে। চারপাশের ধুলাবালি, যানবাহনের শব্দ আর তীব্র ব্যস্ততার মাঝেও সেই ছোট্ট পরিসরে যেন গড়ে উঠেছে এক নিঃশব্দ ভালোবাসার আশ্রয়।
রাস্তা দিয়ে যাওয়া অনেকেই ধীর হয়ে তাকিয়ে দেখছিলেন দৃশ্যটি। নগরের তাড়াহুড়োর ভেতরেও এমন মুহূর্ত মানুষকে থামিয়ে দেয়, ভাবতে বাধ্য করে।
মোটরসাইকেল চালক জয়নাল আবেদীন সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটি দেখছিলেন। তার ভাষায়, ‘সন্তানের প্রতি মায়ের মমতা ধনী-গরিব ভেদে বদলায় না। ওদের থাকার ঘর নেই, খাওয়ার নিশ্চয়তা নেই—ফ্লাইওভারের নিচে কষ্টে জীবন কাটায়। কিন্তু সন্তানের প্রতি ভালোবাসায় কোনো কমতি নেই।’
হাতিরঝিল এলাকায় দায়িত্ব পালনরত এক ট্রাফিক পুলিশ সদস্যও একই অনুভূতি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘সচ্ছল পরিবারের শিশুরা যাতে অসুখবিসুখে না পড়ে, সে জন্য কত যত্ন নেওয়া হয়। অথচ এই শিশুরা খোলা আকাশের নিচে, ধুলোবালির মধ্যে বড় হয়। তারপরও দরিদ্র মায়েরা সাধ্য মতো আদর-যত্ন দিয়ে সন্তানকে বড় করার চেষ্টা করেন।’
নগরের কংক্রিটের ভিড়ে, যান্ত্রিক জীবনের চাপে যখন মানবিক অনুভূতিগুলো অনেক সময়ই চাপা পড়ে যায়, তখন এমন একটি দৃশ্য মনে করিয়ে দেয়—ভালোবাসার কোনো আর্থিক মানদণ্ড নেই।
এই শহরে কারও মাথার ওপর ছাদ থাকে, কারও থাকে না। কিন্তু মায়ের ভালোবাসার ছায়া থাকে—ফ্লাইওভারের নিচেও, অমলিন।
এমইউ/বিএ