‘সোনা’ বাংলাদেশের মানুষের কাছে শুধু অলংকার নয়, নিরাপদ বিনিয়োগের প্রতীকও। বিয়ে, উৎসব কিংবা ভবিষ্যতের সঞ্চয় সব ক্ষেত্রেই সোনার গুরুত্ব অপরিসীম।
কিন্তু সম্প্রতি সোনার বাজারে এমন এক বাস্তবতা সামনে এসেছে, যা অনেক ক্রেতাকেই অবাক করছে। একই ওজনের একটি আংটি কিনতে গেলে এক দাম, আবার বিক্রি করতে গেলে একেবারেই অন্য দাম! কেন এমন হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই যাওয়া হয় সুফিয়া জুয়েলার্সে। সেখানের কর্ণধার সিদ্দিকুর রহমান জানান নানা তথ্য।
একই আংটি, কিন্তু দামে এত ফারাক কেন?ধরা যাক, আপনি ৪ আনা ওজনের একটি ২২ ক্যারেটের সোনার আংটি কিনতে গেলেন। বাজারদর অনুযায়ী শুধু সোনার দাম পড়ছে ৬০ হাজার ৩৬২ টাকা। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে কারিগরি খরচ, ফলে মোট দাম দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৬৩ হাজার ৬৮০ টাকা।
অন্যদিকে, একই ওজনের ২১ ক্যারেটের আংটির ক্ষেত্রে সোনার দাম ৫৭ হাজার ৬০০ টাকা, আর কারিগরি খরচসহ মোট মূল্য দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৬০ হাজার ৪৮০ টাকা। এ পর্যন্ত সবই স্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু আসল চমকটা আসে তখন, যখন আপনি সেই আংটিটি বিক্রি করতে যান।
একই ৪ আনা ওজনের ২২ ক্যারেট সোনা বিক্রি করতে গেলে দোকানদার আপনাকে দিচ্ছেন প্রায় ৪৮ হাজার ২০০ টাকা। আর ২১ ক্যারেট হলে সেই দাম আরও কমে দাঁড়ায় ৪৬ হাজার টাকা। অর্থাৎ, নতুন অবস্থায় ৬৩ হাজার টাকায় কেনা একটি আংটি বিক্রি করতে গিয়ে আপনি পাচ্ছেন প্রায় ১৫ হাজার টাকা কম! প্রশ্ন উঠতেই পারে, এই টাকাটা গেল কোথায়?
আরও পড়ুন: কেন কেনার দামে নয়, কম দামে বিক্রি হয় সোনা? সোনার দাম কেন মানুষকে এত টানে সোনা কেনার আগে যে প্রশ্নগুলোর জবাব খুঁজছে মানুষ রহস্যটা আসলে কোথায়?এই দামের পার্থক্যের পেছনে রয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। এ বিষয়ে সুফিয়া জুয়েলার্সের কর্ণধার সিদ্দিকুর রহমান বলেন, আপনি যখন একটি আংটি কিনছেন, তখন শুধু সোনার দামই দিচ্ছেন না, এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ডিজাইন, শ্রম, মজুরি সব মিলিয়ে কারিগরি খরচ। কিন্তু বিক্রির সময় দোকানদার শুধু সোনার ওজন ও বিশুদ্ধতার মূল্যই বিবেচনা করেন। ফলে কারিগরি খরচ পুরোপুরি হারিয়ে যায়। এছাড়া পুরোনো সোনা কিনে দোকানদারকে তা পুনরায় গলিয়ে নতুন অলংকার তৈরি করতে হয়। এতে খরচ, সময় ও ঝুঁকি জড়িত। তাই তারা একটি নির্দিষ্ট মার্জিন রেখে দাম নির্ধারণ করা হয়।
অন্যদিকে, ২২ ক্যারেট সোনা বেশি বিশুদ্ধ, তাই এর দামও বেশি। ২১ ক্যারেট তুলনামূলক কম বিশুদ্ধ হওয়ায় দাম কিছুটা কম। বিক্রির সময় এই বিশুদ্ধতার হিসাবেই মূল্য নির্ধারণ হয়। একই সঙ্গের বাংলাদেশে সোনার দাম নির্ধারণে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব থাকে। ফলে প্রতিদিনই দামে কিছুটা পরিবর্তন আসে। আপনি যে দামে কিনেছেন, বিক্রির সময় সেই দাম না ও থাকতে পারে।
ক্রেতাদের জন্য পরামর্শ সোনা কিনুন অলংকার হিসেবে, বিনিয়োগ ভাবলে হিসাব বুঝে নিন কারিগরি খরচ যত বেশি, ক্ষতির সম্ভাবনাও তত বেশি কম ডিজাইনের বা সিম্পল গহনা কিনলে বিক্রির সময় তুলনামূলক কম ক্ষতি হয় ২২ ক্যারেট সোনা তুলনামূলক বেশি মূল্য ধরে রাখে সোনা আবেগ না হিসাব?বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সোনা সবসময়ই আবেগের সঙ্গে জড়িত; বিয়ের গহনা, উত্তরাধিকার কিংবা সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবে। কিন্তু সময় বদলেছে, বাজারও বদলেছে। এখন সোনা কেনার আগে শুধু সৌন্দর্য নয়, অর্থনৈতিক দিকটিও বিবেচনা করা জরুরি।
‘একই আংটির দুই দাম’ এটা আসলে কোনো রহস্য নয়, বরং বাজারের স্বাভাবিক নিয়ম। তবে এই নিয়ম না জানলে, আপনার পকেট থেকেই উধাও হয়ে যেতে পারে হাজার হাজার টাকা। তাই পরেরবার সোনা কিনতে যাওয়ার আগে শুধু ডিজাইন নয়, দামের এই অদৃশ্য সমীকরণটাও মাথায় রাখুন।
প্রসঙ্গত, বাজুস নির্ধারণ করা দর অনুযায়ী বর্তমানে সবচেয়ে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনা বিক্রি হচ্ছে ২ লাখ ৪১ হাজার ৪৪৫ টাকা। ২১ ক্যারেটের এক ভরি সোনা বিক্রি হচ্ছে ২ লাখ ৩০ হাজার ৪২২ টাকা। এছাড়া ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনা বিক্রি হচ্ছে ১ লাখ ৯৭ হাজার ৫৩০ টাকায়। আর সনাতন পদ্ধতির এক ভরি সোনা বিক্রি হচ্ছে ১ লাখ ৬০ হাজার ৮৪৭ টাকা।
জেএস/