দেশজুড়ে

হামে আক্রান্ত হচ্ছেন বড়রাও, দুই শিশুর মৃত্যু

শরীয়তপুরের বিভিন্ন হাসপাতালে বাড়ছে হাম আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। গত ৪৮ ঘণ্টায় শুধু সদর হাসপাতালেই ভর্তি হয়েছেন তিন রোগী। যাদের মধ্যে একজন শিশু রয়েছে। এরই মধ্যে জেলা থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানোর পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

জেলার স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, শরীয়তপুরের বিভিন্ন উপজেলা ও জেলা হাসপাতালে গত দুই সপ্তাহ ধরে হামের লক্ষণ নিয়ে শিশুসহ তরুণরা ভর্তি হচ্ছেন। এদের মধ্য থেকে ২৫ ব্যক্তির নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। যার মধ্যে ১৫ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। পরে তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়। এদের মধ্যে জাজিরা উপজেলার বড় গোপালপুর এলাকার জাকির হোসেনের মেয়ে তাসিফা ও ভেদরগঞ্জ উপজেলার সখিপুর থানার বালারহাট এলাকার ইসহাক মিয়ার মেয়ে রুকাইয়া চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। বর্তমানে জেলা সদর হাসপাতালে হামে আক্রান্ত হয়ে শিশুসহ তিনজন চিকিৎসা নিচ্ছেন।

জাজিরার কাজীরহাট এলাকার দুই বছর বয়সী শিশু ওসমানকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় সদর হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন মা শিরিনা বেগম। প্রথম দিকে প্রচণ্ড জ্বর, কাশি আর পাতলা পায়খানা থাকলেও এখন শরীরজুড়ে দেখা মিলছে র‍্যাশ। চোখ মেলে তাকাতেও পারছে না। এমন অবস্থায় আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন শিশুটির মা।

তিনি বলেন, ‌‘হঠাৎ করেই বাবুর জ্বর আসে। সুস্থ না হওয়ায় হাসপাতালে নিয়ে আসি। ডাক্তার পরীক্ষা করে জানায়, হাম হয়েছে। ওর প্রচণ্ড কাশি হচ্ছে। কিছু খেতে পারে না।’

শুধু শিশু ওসমান নয়, হামে আক্রান্ত হচ্ছেন উঠতি বয়সের তরুণরাও। গত ২৪ ঘণ্টায় একই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে আরও দুই তরুণ। তারা হলেন শরীয়তপুর পৌরসভার বাঘিয়া এলাকার ইমন মুন্সি ও সদর উপজেলার দাদপুর এলাকার শাহীন কাজী। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তারা হামে আক্রান্ত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন চিকিৎসক। এরইমধ্যে প্রচণ্ড জ্বর, কাশি আর র‍্যাশের অসহনীয় চুলকানি নিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে।

শাহীন কাজী বলেন, ‘কয়েকদিন ধরে জ্বর ছিল। এতটাই খারাপ অবস্থা যে বিছানা থেকে উঠতে পারিনি। ভর্তি হওয়ার পর রক্ত পরীক্ষা করলাম। রাত থেকে জ্বর নেই কিন্তু শরীরে অনেক র‍্যাশ উঠেছে। যা এখন অনেক কষ্টদায়ক। গায়ে কাঁটার মতো বিঁধছে।’

হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ায় আতঙ্কিত শিশুদের মায়েরা। সংক্রমণ বাড়ায় ভয়ে বিদ্যালয়ে পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন তারা। আসমা খানম নামের এক নারী বলেন, ‘সারাদেশে হাম মারামারি আকার ধারণ করছে। আমরা আমাদের শিশুদের নিয়ে খুবই আতঙ্কে আছি। বাচ্চাদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে হামের টিকা নিশ্চিত করতে হবে। আমরা এখন ওদের স্কুলে পাঠানো নিয়ে শঙ্কায় আছি। আশা রাখি সরকার এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।’

চিকিৎসারা বলছেন, দ্রুত হারে বাড়ছে হাম। শিশুদের রোগ হলেও এখন এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন প্রাপ্ত বয়স্করা। তাই সবাইকে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি সুচিকিৎসা নেয়ার কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা।

সদর হাসপাতালের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ মিজানুর রহমান বলেন, ‘হামের কিছু উপসর্গ এই রোগকে বেশি জটিল করে ফেলে। আমরা পরামর্শ দেবো হামে আক্রান্ত রোগীকে শরীরের পানির ভারসাম্য ঠিক রাখতে হবে। বেশি বেশি তরল খাবার দিতে হবে। কেউ আক্রান্ত হলে আতঙ্কিত না হয়ে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। এতে করে সঠিক চিকিৎসায় রোগীরা দ্রুত সেরে উঠবেন।’

শরীয়তপুর সদর উপজেলার আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) মিতু আক্তার বলেন, ‘হামের প্রাদুর্ভাব সারাদেশেই ছড়িয়েছে। আমাদের এই হাসপাতালে এখন এক শিশু ও দুই তরুণসহ তিনজন ভর্তি আছেন। তাদের জন্য আলাদা আইসোলেশন ওয়ার্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমরা সেখানে তাদের চিকিৎসা দিচ্ছি।’

জেলা থেকে হামে আক্রান্ত হয়ে ঢাকায় উন্নত চিকিৎসা নেওয়ার পর মৃত্যু হয়েছে দুই শিশুর। তাই হামের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানান জেলার সিভিল সার্জন ডা. রেহান উদ্দিন।

তিনি বলেন, স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে কেউ হাম আক্রান্ত আছেন কি-না খোঁজখবর নিচ্ছেন। যারা হাসপাতালে আসছেন তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে প্রাথমিক চিকিৎসা, কাউকে ভর্তি ও কাউকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে। প্রত্যেক হাসপাতালে রোগীদের জন্য আইসোলেশন কক্ষ ও বেডের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

বিধান মজুমদার অনি/এসআর/এএসএম