মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উদ্দেশ্য করে ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহানাবাদী বলেছেন, তথাকথিত পরাশক্তি আমাদের ওপর হামলা শুরু করার এক মাসের মধ্যেই এই যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজতে শুরু করেছে।
বুধবার (১ এপ্রিল) মধ্যপাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে ঢাকায় ইরানের দূতাবাসে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তেহরানের রাষ্ট্রদূত।
ইরানের রাষ্ট্রদূত বলেন, আপনারা জানেন যে, আমেরিকার আগ্রাসনের পর আমরা এখন প্রায় এক মাসের বেশি সময় অতিক্রম করেছি। যখন এই যুদ্ধ শুরু হয়, তখন আমরা আমেরিকার সঙ্গে আলোচনা ও সংলাপে ছিলাম। ওমানের মধ্যস্থতায় এই আলোচনা চলছিল এবং তা খুবই ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছিল, একটি সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব ছিল।
তিনি বলেন, কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আলোচনার মাঝামাঝি সময়ে ইসরাইলের উসকানিতে আমেরিকা হঠাৎ আমাদের ওপর হামলা চালায়। একটি প্রবাদ আছে, কুকুর তার লেজ নাড়ায়; কিন্তু এখানে আমরা দেখছি উল্টোটা, লেজই কুকুরকে নাড়াচ্ছে। অর্থাৎ ইসরাইল আমেরিকা, উপসাগরীয় দেশগুলো এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে তার যুদ্ধবাজ নীতির জন্য ব্যবহার করছে।
জলিল রহিসি বলেন, আমেরিকার আগের প্রেসিডেন্ট তুলনামূলকভাবে বেশি বিচক্ষণ ছিলেন এবং ইসরাইলের প্ররোচনায় পড়েননি। কিন্তু ট্রাম্প সেই ভুলটি করেন। তিনি এই ফাঁদে পা দেন এবং এমন একটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন, যেখান থেকে এখন বের হওয়ার পথ খুঁজছেন।
রাষ্ট্রদূত বলেন, আমাদের ওপর আমেরিকা ও ইসরায়েলের হামলাকে শুধু একটি সামরিক অভিযান বলা সঠিক হবে না। এটি একটি বিস্তৃত সাংস্কৃতিক, মানবিক, নিরাপত্তা, পরিবেশগত এবং অর্থনৈতিক আগ্রাসন, পুরো সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে একটি আক্রমণ।
তিনি বলেন, তাদের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিবর্তন করা। এর পাশাপাশি তারা সামরিক স্থাপনা ছাড়াও সাংস্কৃতিক নিদর্শন, ঐতিহাসিক স্থাপনা, স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, ওষুধ উৎপাদন কেন্দ্র এবং খাদ্য উৎপাদন কেন্দ্রেও হামলা চালিয়েছে।
রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, বাস্তবে তারা বেসামরিক জনগণ, শিশু, নারী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোতেও নির্মমভাবে আঘাত করেছে। অথচ একটি যুদ্ধ যদি শুধুমাত্র সামরিক লক্ষ্য নিয়ে পরিচালিত হয়, তাহলে শিশু হত্যা, নারী নিধন, স্কুল-কলেজ বা ঐতিহাসিক স্থাপনায় হামলার কোনো যৌক্তিকতা থাকে না।
তিনি বলেন, যুদ্ধের একটি নীতি ও নৈতিকতা থাকে। যুদ্ধের নামে নিরীহ শিশু, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা সাংস্কৃতিক কেন্দ্রকে টার্গেট করা গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু তাদের কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে, তাদের উদ্দেশ্য কেবল সামরিক নয় এর পেছনে আরও গভীর উদ্দেশ্য রয়েছে।
রাষ্ট্রদূত আরও জানান, আমাদের কাছে বহু ছবি ও প্রমাণ রয়েছে। আমরা সেগুলো গণমাধ্যমের কাছে দিতে পারি, যাতে আপনারা দেখতে পারেন, কীভাবে তারা সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও সাধারণ জনগণের ওপর হামলা চালিয়েছে।
আমি প্রশ্ন করতে চাই, আমাদের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোতে কি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি হতো? আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কি ইউরেনিয়াম ছিল? নিষ্পাপ শিশুরা কি মধ্যপ্রাচ্যের জন্য কোনো হুমকি ছিল?
তিনি বলেন, এই যুদ্ধের অজুহাত হিসেবে তারা পারমাণবিক ইস্যু তুলে ধরছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি একটি ভিন্ন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আগ্রাসন। ইতিহাসে আমরা দেখেছি, যখন আমেরিকা আদিবাসীদের কাছ থেকে তাদের ভূমি দখল করছিল, তখন একটি প্রবাদ চালু ছিল, ‘ভালো আদিবাসী মানে মৃত আদিবাসী’। আজ একই মানসিকতা মুসলমানদের প্রতিও প্রয়োগ করা হচ্ছে।
তারা একদিকে ধর্মীয় অনুষ্ঠান করে, বাইবেল, তাওরাত ও অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ পাঠ করে; অন্যদিকে, মুসলিম বিশ্বের শক্তিকে ধ্বংস করার চেষ্টা চালায়।
রাষ্ট্রদূত বলেন, কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই তথাকথিত পরাশক্তি আমাদের ওপর হামলা শুরু করার এক মাসের মধ্যেই এই যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজতে শুরু করেছে। তারা আমাদের অনেক নেতা ও সামরিক কর্মকর্তাকে হত্যা করেছে, কিন্তু আমরা দ্রুত তাদের পরিবর্তে নতুন নেতৃত্ব স্থাপন করেছি। আমাদের সক্ষমতা অটুট রয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা এখনও প্রতিদিন ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করছি এবং আমাদের সামরিক শক্তি বহাল আছে। আমরা অন্তত ১৪টি মার্কিন ঘাঁটি ধ্বংস করেছি। যেখানে যেখানে তারা আমাদের বিরুদ্ধে বৈঠক বা ষড়যন্ত্র করছে, হোটেল, বিমানবন্দর বা অন্য কোথাও আমরা সেখানে প্রতিরোধ গড়ে তুলছি।
তিনি আরও বলেন, আমরা আমাদের প্রতিবেশী মুসলিম দেশগুলোকে আগে থেকেই সতর্ক করেছিলাম, তারা যেন এই আগ্রাসনের অংশীদার না হয়। কিন্তু যদি তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে আমাদের ওপর হামলা চালানো হয়, তাহলে আমরা নীরব থাকবো না। দুঃখজনকভাবে, আমরা দেখছি কিছু আরব দেশের ঘাঁটি থেকে বিমান উড্ডয়ন করছে, ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হচ্ছে, এবং সেই হামলায় আমাদের নারী ও শিশু নিহত হচ্ছে। আমরা এটি উপেক্ষা করতে পারি না।
রাষ্ট্রদূত জানান, এই যুদ্ধের প্রথম লক্ষ্য ছিল আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা ধ্বংস করা। তারা ব্যর্থ হয়েছে। আমাদের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও প্রযুক্তি ধ্বংস করাও তাদের উদ্দেশ্য ছিল সেখানেও তারা ব্যর্থ হয়েছে।
জলিম রহিমি বলেন, হরমুজ প্রণালী দিয়ে আগে প্রতিদিন প্রায় ১৩০টি জাহাজ চলাচল করতো; এখন তা কমে প্রায় ১২টিতে নেমে এসেছে। বহু তেলবাহী জাহাজ এখন আটকে আছে এবং অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছে। লাখ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে।
এই যুদ্ধে প্রকৃত বিজয়ী কে প্রশ্ন রেখে রাষ্ট্রদূত বলেন, তারা দাবি করছে যে তারা বিজয়ী হয়েছে এবং আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিবর্তন করেছে। কিন্তু বাস্তবে তারা কি কোনো পরিবর্তন আনতে পেরেছে? আমাদের জনগণ প্রতিদিন রাস্তায় নেমে এসেছে। সব মত, সব দল, সব ধর্মের মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। আমাদের কর্মকর্তারাও জনগণের মাঝে উপস্থিত থাকছেন-যোগ করেন রাষ্ট্রদূত।
তিনি বলেন, তারা আমাদের হুমকি দিচ্ছে, পারমাণবিক হামলা করবে, পানি সরবরাহ বন্ধ করবে, ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করবে। কিন্তু আমরা ভয় পাই না; আমরা আমাদের বিশ্বাসে অটল।
বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার বার্তা দেন রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ আমাদের বন্ধু ও ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ। আমরা চাই, আমাদের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হোক। ইরানে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা আমাদের কাছে নেই। তবে বাংলাদেশ দূতাবাস যদি কোনো তালিকা দেয়, আমরা তাদের নিরাপদে দেশে ফেরাতে সহযোগিতা করবো।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের ছয়টি জাহাজ হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল করছে। আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি এবং তাদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা হবে।
রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, আমরা লক্ষ্য করেছি, বাংলাদেশের কিছু বিবৃতিতে শুধু উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে; কিন্তু আগ্রাসনের স্পষ্ট নিন্দা করা হয়নি। আমরা আশা করি, বাংলাদেশ আরও স্পষ্ট ও দৃঢ় অবস্থান নেবে। অন্যান্য দেশ, যেমন পাকিস্তান, তুরস্ক এই হামলার নিন্দা করেছে এবং সংলাপ ও শান্তির আহ্বান জানিয়েছে। বাংলাদেশ আমাদের বন্ধু ও ভাই। কঠিন সময়ে ভাই ভাইয়ের পাশে দাঁড়াবে-এটাই স্বাভাবিক- বলেন রাষ্ট্রদূত।
জেপিআই/এসএনআর