মাঠে এক শতক জমিও নেই, কোনোদিন ব্যাংকের ধারে কাছেও যাননি। অথচ বাড়িতে এসেছে ঋণখেলাপির লাল নোটিশ। শুধু জীবিতরাই নন, ১৫-২০ বছর আগে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের নামেও তোলা হয়েছে কৃষিঋণ।
জয়পুরহাটের কালাইয়ে অগ্রণী ব্যাংকে এমন ভূতুড়ে ঋণ জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। কৃষকদের নাম-ঠিকানা ও জমির ভুয়া কাগজ বানিয়ে প্রায় কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে ব্যাংকটির কালাই শাখার তৎকালীন ব্যবস্থাপক নূরুল ইসলামের বিরুদ্ধে।
কালাই পৌরশহরের আঁওড়া মহল্লার নূর আলম মণ্ডল হতভম্ব হয়ে বলেন, ‘কোথায় ব্যাংক আছে তা-ও জানি না। নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে ভুয়া কাগজ বানিয়ে ৯-১০ বছর আগে আমার নামে ঋণ তোলা হয়েছে। এখন পরিশোধের জন্য ব্যাংক থেকে লাল নোটিশ পাঠিয়েছে। নোটিশ পেয়ে আমরা সবাই দিশাহারা।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৬-২০১৭ সালে এসব ভুয়া ঋণ অনুমোদন করা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের বেশিরভাগই কালাই পৌরসভার আঁওড়া মহল্লা এবং আহম্মেদাবাদ ইউনিয়নের হারুঞ্জা ও ঝামুটপুর গ্রামের বাসিন্দা।
ব্যাংকের খেলাপি ঋণের শিট অনুযায়ী, আঁওড়া মহল্লার ১৬ জন, ঝামুটপুর গ্রামের ৩৮ জন এবং হারুঞ্জা গ্রামের ৩৩ জনের নামে ঋণ দেখানো হয়েছে।
জালিয়াতির মাত্রা এতটাই ভয়াবহ যে, ১৫-২০ বছর আগে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের নামেও ঋণ তোলা হয়েছে। আঁওড়া মহল্লার আব্দুর রাজ্জাক মোল্লা মারা গেছেন ১৫ বছর আগে। অথচ ২০১৬ সালে তার নামে ৫০ হাজার টাকা ঋণ তোলা হয়েছে, যা সুদ-আসলে এখন ৯৯ হাজার ২০০ টাকা।
তার ছেলে সোহেল মোল্লা ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, ‘বাবা জীবিত অবস্থায় ঋণ নিয়ে পরিশোধ করেই মারা গেছেন। হঠাৎ দেখি ২০১৭ সালে নাকি বাবা আবারও ঋণ নিয়েছেন! বাবা কি কবর থেকে উঠে এসে ঋণ নিয়েছেন? দেশে লুটপাটের মহোৎসব চলছে।’
একইভাবে হারুঞ্জা গ্রামের খলিলুর রহমান ১৮ বছর আগে মারা গেলেও তার নামেও পঞ্চাশ হাজার টাকা ঋণ তোলা হয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী মাঠ কর্মকর্তার যাচাই-বাছাই করার কথা থাকলেও তৎকালীন ম্যানেজার নূরুল ইসলাম দালালদের মাধ্যমে গ্রামের সহজ-সরল মানুষের এনআইডি ও ছবি সংগ্রহ করেন।
আঁওড়া গ্রামের ভ্যানচালক পুতুল চন্দ্র জানান, ভ্যান কেনার টাকার জন্য স্থানীয় দালাল আব্দুস সামাদকে ২ হাজার টাকা ও ছবি-এনআইডি দিয়েছিলেন তিনি। ঋণ না পেলেও এখন তার নামে ৯৯ হাজার ২০০ টাকার নোটিশ এসেছে।
ঢাকায় বুয়ার কাজ করা জাহানারা বেগমের নামেও তোলা হয়েছে ৩৫ হাজার টাকা। তিনি ব্যাংকে গিয়ে দেখেছেন, ছবি ও এনআইডি তার হলেও ফাইলে থাকা স্বাক্ষর ভুয়া।
এ বিষয়ে দালাল আব্দুস সামাদ অকপটে বলেন, ‘এলাকার মানুষের আইডি কার্ড ও ছবি দিলে ম্যানেজার আমাকে দুই হাজার টাকা করে দিতেন। আমি ৬০-৭০ জনের কাগজ দিয়েছি। তিনি এসব দিয়ে ঋণ তুলবেন তা আমার জানা ছিল না।’
অন্যদিকে তৎকালীন ফিল্ড সুপারভাইজার আব্দুস ছালাম জানান, চাকরি খাওয়ার ভয় দেখিয়ে ম্যানেজার নূরুল ইসলাম জোরপূর্বক তাদের দিয়ে এসব ভুয়া ফাইলে স্বাক্ষর করিয়ে নিয়েছিলেন।
অগ্রণী ব্যাংক কালাই শাখার বর্তমান ব্যবস্থাপক সাব্বির আহমেদ জানান, জালিয়াতির বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তদন্ত করছে। এরই মধ্যে বেশ কিছু জালিয়াতি শনাক্ত হয়েছে এবং অভিযুক্ত সাবেক ম্যানেজারের অবসরকালীন সব সুযোগ-সুবিধা বন্ধ রাখা হয়েছে।
অগ্রণী ব্যাংকের জয়পুরহাট শাখার আঞ্চলিক মহাব্যবস্থাপক জুলফিকার আলী জানান, তদন্ত শেষে অভিযুক্তের পেনশনের অর্থ থেকে জালিয়াতির টাকা সমন্বয় করা হবে।
তবে অভিযুক্ত সাবেক ব্যবস্থাপক নূরুল ইসলামের কণ্ঠে কোনো অনুশোচনা নেই। মুঠোফোনে তিনি দম্ভভরে বলেন, ‘চাকরি থেকে অবসরে এসেছি, বয়স অনেক হয়েছে। এত আগের বিষয় কি আর মনে আছে! এসব কথা বাদ দেন, নিউজটি বন্ধ রাখতে কী করতে হবে তাই বলেন।’
মাহফুজ রহমান/এফএ/এএসএম