সামরিক জোট ন্যাটো থেকে বের হয়ে যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ন্যাটো যোগ না দেওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। বুধবার (১ মার্চ) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন ট্রাম্প।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ন্যাটোতে যুক্তরাষ্ট্রের থাকা-না থাকার ব্যাপারটি পুনর্বিবেচনা করবেন কি না- প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, অবশ্যই, আমি বলবো এটা পুনর্বিবেচনারও বাইরে চলে গেছে। আমি কখনোই ন্যাটোর ওপর খুব একটা আস্থাশীল ছিলাম না। সব সময়ই জানতাম তারা কাগুজে বাঘ। ওহ, পুতিনও এমনটাই ভাবেন।
ট্রাম্পের এই ঘোষণা এটি ইঙ্গিতই দেয় যে, হোয়াইট হাউজ এখন আর ইউরোপকে নির্ভরযোগ্য প্রতিরক্ষা অংশীদার হিসেবে দেখছে না। কারণ, মিত্রদের কাছে হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর যে দাবি ট্রাম্প করেছিলেন, তা তারা প্রত্যাখ্যান করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মিলিত হামলার পাল্টা জবাব হিসেবে ইরান যে শক্তিশালী ব্যবস্থা নিয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে প্রভাব ফেলা সিদ্ধান্ত হলো, কয়েক সপ্তাহ ধরে হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে তারা। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করে। সেটি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে তেল-গ্যাসের দাম বেড়ে গেছে ও বিশ্ব অর্থনীতি মন্দার ঝুঁকিতে পড়েছে। এ অবস্থায় ট্রাম্পের আহ্বান সত্ত্বেও ন্যাটো অংশীদাররা প্রণালি খুলতে এগিয়ে আসতে অনাগ্রহ দেখিয়েছে। তাদের যুক্তি, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের, তাদের নয়।
ট্রাম্প আরও বলেন, তারা আমাদের পাশে না থাকাটাই এখানে একমাত্র ব্যাপার নয়… এটা বিশ্বাস করাটাই কঠিন। আমি খুব বেশি চাপও দিইনি। শুধু বলেছিলাম, ‘শুনুন…’, খুব একটা জোর করিনি। কিন্তু আমি মনে করি, এটা (ইরান যুদ্ধে ন্যাটোর যোগ দেওয়া) আপনাআপনিই হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, আমরা সব সময়ই ওদের পাশে থেকেছি, ইউক্রেনের বেলায়ও। ইউক্রেন তো আমাদের সমস্যা ছিল না। এটা ছিল একটা পরীক্ষা। আমরা তাদের জন্য ছিলাম, ভবিষ্যতেও থাকতাম। কিন্তু তারা আমাদের জন্য ছিল না।
যুক্তরাজ্যের কথা আলাদা করে উল্লেখ করে ট্রাম্প দেশটির প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধে যুক্তরাজ্য অংশ নেয়নি। এমনকি ব্রিটিশ নৌবাহিনীর সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
ট্রাম্প বলেন, আপনাদের (যুক্তরাজ্য) তো একটা কার্যকর নৌবাহিনীই নেই। ওটা (ব্রিটিশ নেভি) অনেক পুরোনো হয়ে গেছে। তাছাড়া আপনাদের বিমানবাহী রণতরীগুলোও ঠিকঠাক কাজ করে না।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষায় ব্যয় আরও বাড়ানো উচিত বলে মনে করেন কি না- প্রশ্নে ট্রাম্প বলেন, তাকে কী করতে হবে, তা আমি আর বলবো না। তিনি যা খুশি করতে পারেন। এতে কিছু যায় আসে না। স্টারমার শুধু দামি উইন্ডমিল চায়, যেটা কিনা জ্বালানির দাম আসমানে তুলে দিচ্ছে।
ট্রাম্পের এসব মন্তব্যের পর কিয়ার স্টারমার ন্যাটোর প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি ন্যাটোকে ‘বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে কার্যকর সামরিক জোট’ বলে উল্লেখ করেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে তিনি ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার চেষ্টা করবেন। তিনি বলেন, যত কথাই হোক, আমরা যুক্তরাজ্যের স্বার্থেই কাজ করবো।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে আরেকবার নিজেদের মনোভাব পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, এটা আমাদের যুদ্ধ নয় ও আমরা এতে জড়াবো না।
মঙ্গলবার ব্রিটিশ নৌবাহিনীর প্রধান (ফার্স্ট সি লর্ড) স্বীকার করেন, রয়্যাল নেভি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত নয়। তিনিই প্রথম কোনো শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা, যিনি সশস্ত্র বাহিনীর দুর্বল অবস্থা নিয়ে প্রকাশ্যে সতর্ক করলেন।
ইরান সংঘাত শুরুর সময় যুক্তরাজ্যের ছয়টি ডেস্ট্রয়ারের মধ্যে চারটি মেরামতের কারণে অচল ছিল। ফলে উত্তর আটলান্টিকে ন্যাটোর দায়িত্ব পালনে যুক্তরাজ্যকে জার্মানির কাছ থেকে একটি যুদ্ধজাহাজ ধার নিতে হয়েছে।
এদিকে, ইরান যুদ্ধে মিত্রদের অবস্থান নিয়ে হোয়াইট হাউজ ক্রমেই হতাশ হয়ে পড়ছে। যুক্তরাজ্যের পাশাপাশি স্পেন ও ইতালিও তাদের ঘাঁটি কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানে হামলার অনুমতি দেয়নি। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) ফক্স নিউজে বলেন, ন্যাটো যেন একটা ‘একতরফা সম্পর্ক’ হয়ে গেছে।
তিনি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজনের সময় মিত্ররা তাদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিচ্ছে না। রুবিও বলেন, আমার মনে হয়, দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, এ নিয়ে কোনো সংশয়ই আর নেই। এই সংঘাত শেষ হলে আমাদের এই সম্পর্কের ব্যাপারে নতুন করে ভাবতে হবে।
তিনি বলেন, যদি ন্যাটো শুধু এই জন্য থাকে যে আমরা ইউরোপকে রক্ষা করব, কিন্তু তারা আমাদের প্রয়োজনের সময় ঘাঁটি ব্যবহার করতে না দেয়, তাহলে তো এটা কোনো কাজের সমঝোতা হলো না। এমন সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা কঠিন।
ট্রাম্প বলেন, রুবিওর এই মন্তব্যে তিনি ‘খুশি।’
জানা গেছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট স্থানীয় সময় বুধবার (১ এপ্রিল) রাত ৯টায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। সেখানে তিনি যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে আপডেট দেবেন।
মঙ্গলবার রাতে তিনি বলেন, এই যুদ্ধ দুই সপ্তাহ, হয়তো তিন সপ্তাহের মধ্যে শেষ হতে পারে ও এর একমাত্র লক্ষ্য ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে ঠেকানো।
গত সপ্তাহে দ্য টেলিগ্রাফ জানায়, ট্রাম্প ন্যাটোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার কথা ভাবছেন। যেসব সদস্য দেশ তার নির্ধারিত ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করবে না, তাদের শাস্তি দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
ব্রিটিশ সামরিক কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীকে প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির ৩ শতাংশে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন। তবে অর্থমন্ত্রী র্যাচেল রিভস এজন্য অতিরিক্ত ব্যয় করতে অনিচ্ছুক।
ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা ‘পে-টু-প্লে’ মডেল চালুর পক্ষে। এতে নির্ধারিত ব্যয় পূরণ না করলে কোনো দেশকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, এমনকি যুদ্ধের সিদ্ধান্ত থেকেও বাইরে রাখা হতে পারে।
প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে, ট্রাম্প জার্মানি থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের কথাও ভাবছেন। গত বছর ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই তিনি এই বিষয়টি বিবেচনা করছেন।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোর কাছে সহায়তা চাওয়ায় ন্যাটো জোটের ‘আর্টিকেল ফাইভ’ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এই ধারা অনুযায়ী, কোনো সদস্যের ওপর হামলা মানে সবার ওপর হামলা। ইতিহাসে মাত্র একবার এই ধারা প্রয়োগ করা হয়েছিল- ৯/১১ হামলার পর। আফগানিস্তানে পরবর্তী যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া অন্য দেশের এক হাজারের বেশি সেনা নিহত হন, যার মধ্যে ৪৫৭ জন ছিলেন ব্রিটিশ।
এই ধারা কেবল তখনই প্রযোজ্য, যখন কোনো ন্যাটো সদস্য আক্রান্ত হয়। তাই ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য নয়, কারণ যুদ্ধ শুরু হয়েছে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলার মাধ্যমে। যুক্তরাষ্ট্র এখানে আক্রমণকারী, আক্রান্ত নয়।
অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটো থেকে বের হতে চাইলে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন। ২০২৩ সালে একটি আইন পাস হয়, যাতে বলা হয়, সিনেটের সম্মতি বা কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া প্রেসিডেন্ট ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করতে পারবেন না।
তখন মার্কিন সিনেটর থাকা অবস্থায় মার্কো রুবিও এই আইনের সহ-উদ্যোক্তা ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ন্যাটো ছাড়ার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত কংগ্রেসে বিস্তারিত আলোচনা ও জনগণের মতামতের ভিত্তিতে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
এসএএইচ