বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত নিয়ে জনমনে আস্থা তৈরি করা যেমন কঠিন, তেমনি সেই আস্থাকে মুহূর্তে ভেঙে দেওয়াও খুব সহজ। বিশেষ করে যখন দায়িত্বশীল অবস্থানে থাকা কেউ তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণের বদলে আবেগনির্ভর, জনতুষ্টিমূলক কিংবা রাজনৈতিক বক্তব্য দেন। সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুলের কয়েকটি বক্তব্য সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। তিনি একদিকে বলেছেন, গত আট বছর দেশে হামের টিকা দেওয়া হয়নি; অন্যদিকে একজন মেডিক্যাল পরিচালকের জন্য ‘ফাঁসির’ মতো চরম শাস্তির কথা উচ্চারণ করেছেন। এই দুই বক্তব্য শুধু তথ্যগত বিভ্রান্তিই সৃষ্টি করেনি, বরং একটি গভীরতর সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করেছে—নীতিনির্ধারণে অজ্ঞতা, দায় এড়ানোর প্রবণতা এবং জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির বিপজ্জনক ব্যবহার।
প্রথম বক্তব্যটি, অর্থাৎ গত আট বছর হামের টিকা দেওয়া হয়নি—এটি সরাসরি তথ্যভিত্তিক বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে হামের টিকা কভারেজ প্রায় ৯৭ শতাংশ ছিল। অর্থাৎ, টিকাদান কর্মসূচি মোটেও বন্ধ ছিল না; বরং তা ছিল তুলনামূলকভাবে সফল একটি জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ। ফলে মন্ত্রীর বক্তব্য শুধু ভুল নয়, এটি একটি সুপরিকল্পিত দায় এড়ানোর কৌশল বলেই প্রতীয়মান হয়। একটি চলমান সমস্যার দায় অতীত সরকারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া—এটি নতুন কিছু নয়; তবে যখন তা জনস্বাস্থ্যের মতো সংবেদনশীল খাতে করা হয়, তখন তা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
কারণ, এই ধরনের বক্তব্য জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করে। মানুষ যখন শুনছে, এতদিন টিকা দেওয়া হয়নি, তখন তাদের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে—তাহলে এতদিন যা করা হয়েছে, তা কি ভুয়া ছিল? তারা কি ভুল তথ্যের ওপর নির্ভর করছিল? এই সন্দেহের বীজ বপন করা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। টিকাদান কর্মসূচির মূল ভিত্তিই হলো মানুষের আস্থা। সেই আস্থাকে যদি রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে দুর্বল করা হয়, তাহলে তার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ হতে পারে।
দ্বিতীয় বক্তব্যটি আরও উদ্বেগজনক। একজন মেডিক্যাল পরিচালকের বিরুদ্ধে ‘ফাঁসির’ মতো শাস্তির কথা বলা নিছক রাগের বহিঃপ্রকাশ নয়; এটি একটি মববাদী মানসিকতার প্রতিফলন। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইন আছে, বিচারব্যবস্থা আছে, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া আছে। সেখানে কোনো ব্যক্তির অপরাধ প্রমাণিত হলে তাকে আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেওয়া হবে—এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু একজন মন্ত্রীর মুখ থেকে যখন ‘ঝুলিয়ে দেওয়ার’ মতো কথা বের হয়, তখন তা শুধু একটি ব্যক্তির প্রতি অন্যায় নয়; বরং পুরো ব্যবস্থার প্রতি অবিশ্বাস প্রকাশ করে।
এই ধরনের বক্তব্য প্রশাসনের ভেতরে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করে। কর্মকর্তারা তখন আর দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নিতে সাহস পান না; বরং তারা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েই বেশি চিন্তিত থাকেন। এর ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে, কাজের গতি কমে যায়, এবং শেষ পর্যন্ত জনগণই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাষ্ট্র পরিচালনা কোনো ছেলেখেলা নয়, যেখানে আবেগের বশে কঠোর শাস্তির হুমকি দিয়ে সমস্যার সমাধান করা যায়।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের মধ্যে এক অদ্ভুত স্ববিরোধিতা পরিলক্ষিত হয়। একদিকে তিনি বলছেন, স্বাস্থ্য খাতের তহবিল শূন্য—এমনকি প্রাথমিক চিকিৎসাসামগ্রী কেনার সামর্থ্যও মন্ত্রণালয়ের নেই। পরক্ষণেই তিনি দাবি করছেন যে, হামের টিকা কেনার জন্য বর্তমান সরকার ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এই তথ্যগত গরমিল এবং স্ববিরোধী অবস্থান প্রমাণ করে যে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। অথচ প্রকৃত বাস্তবতা হলো, দেশে প্রায় দুই কোটি টিকার ডোজ মজুত রয়েছে। সংকট টিকার অভাব নয়; বরং সংকট হলো জনবল ও লজিস্টিক ব্যবস্থাপনার। গত নয় মাস ধরে নিয়মিত এমআর (হাম ও রুবেলা) টিকাদান কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক শিশু তাদের নির্ধারিত দুই ডোজ টিকা সম্পন্ন করতে পারেনি। যখন মাঠপর্যায়ে টিকাদান কর্মসূচি স্থবির হয়ে আছে, তখন সেই ব্যর্থতা ঢাকার জন্য বিগত আট বছরের দোহাই দেওয়া কেবল হাস্যকরই নয়, বরং চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। এই নয় মাসের স্থবিরতার দায় বর্তমান প্রশাসন এড়াতে পারে না। লজিস্টিক সংকটের কারণে যদি জীবনরক্ষাকারী টিকা শিশুর শরীরে না পৌঁছায়, তবে সেই প্রশাসনিক অযোগ্যতার বিচার আগে হওয়া উচিত।
এখন সময় এসেছে বাস্তবতাকে স্বীকার করার, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার। দায় এড়ানোর রাজনীতি কিংবা মববাদী বক্তব্য দিয়ে সাময়িকভাবে জনমত প্রভাবিত করা যেতে পারে, কিন্তু তা দিয়ে কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। বরং এতে করে সমস্যার গভীরতা আরও বাড়ে এবং জনগণের আস্থা আরও ক্ষয়ে যায়। একজন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত সত্য বলা, সমস্যাকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা এবং তা সমাধানের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। অন্যথায়, এই ধরনের ভুল বক্তব্য এবং সিদ্ধান্তই একসময় একটি বড় সংকটের জন্ম দিতে পারে, যার খেসারত দিতে হবে পুরো জাতিকে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ধর্মান্ধ ও উগ্রবাদী গোষ্ঠীর ভূমিকা। বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে এখনও এমন অনেক গোষ্ঠী রয়েছে, যারা টিকাদান কর্মসূচির বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালায়। তারা মানুষকে বোঝায়, রোগ আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে, তাই টিকা নেওয়া অপ্রয়োজনীয় বা ভুল। কেউ কেউ এটিকে হারাম বলেও প্রচার করে। এই ধরনের অপপ্রচার সরাসরি জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। কারণ, এর ফলে মানুষ টিকা নিতে অনীহা প্রকাশ করে, যা সংক্রামক রোগের বিস্তার বাড়িয়ে দেয়।
হামের কারণে যে শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে, তার জন্য কি এই অপপ্রচারকারীরা দায়ী নয়? কেন তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না? এদের মগজধোলাইয়ের যে প্রক্রিয়া চলছে, তা বন্ধ না করলে কোনো টিকা কভারেজই সফল হবে না। মন্ত্রীর উচিত ছিল এই ধর্মান্ধদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়া, অথচ তিনি ব্যস্ত আছেন হাসপাতালের পরিচালককে ফাঁসিতে ঝোলানোর সস্তা হুমকি দিতে।
আমাদের দেশে সংস্কারাচ্ছন্ন, মতলববাজ এই গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ খুব একটা দেখা যায় না। বরং অনেক সময় রাজনৈতিক কারণে তাদের সঙ্গে আপস করা হয়, তাদের তুষ্ট রাখার চেষ্টা করা হয়। এটি একটি বিপজ্জনক প্রবণতা। কারণ, জনস্বাস্থ্য নিয়ে কোনো ধরনের আপস করা যায় না। এখানে বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্তই একমাত্র পথ হওয়া উচিত।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর উচিত ছিল এই গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া, সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং মানুষকে বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে টিকা গ্রহণে উৎসাহিত করা। কিন্তু তার পরিবর্তে তিনি এমন বক্তব্য দিয়েছেন, যা সমস্যার মূল কারণ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে দেয়। এটি শুধু দায়িত্বহীনতা নয়; এটি একটি নীতিগত ব্যর্থতা।
একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা শুধু হাসপাতাল, ডাক্তার বা ওষুধের ওপর নির্ভর করে না; এটি নির্ভর করে নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিভঙ্গি, সততা এবং দায়িত্ববোধের ওপর। যখন সেই জায়গাতেই ঘাটতি দেখা যায়, তখন পুরো ব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়ে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলো সেই ঘাটতিরই প্রতিফলন।
আসলে পুরো স্বাস্থ্যখাত আজ এক গভীর মানসিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে মন্ত্রীর অপেশাদার ও উগ্র মন্তব্য, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে অব্যবস্থাপনা এবং উগ্রবাদী গোষ্ঠীর অপপ্রচার—সব মিলিয়ে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলের প্রথম কাজ হওয়া উচিত ছিল দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রকৃত চিত্র অনুধাবন করা। মিথ্যা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে রাজনীতি করা আর রাষ্ট্র পরিচালনা করা এক কথা নয়। হামের প্রাদুর্ভাব কেন বাড়ছে, কেন টিকা মজুত থাকা সত্ত্বেও শিশুদের দেওয়া যাচ্ছে না, কেন লজিস্টিক চেইন ভেঙে পড়েছে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা এবং সমাধান করাই ছিল তার মূল দায়িত্ব। কিন্তু তিনি বেছে নিয়েছেন দোষারোপের সহজ পথ। অথচ এই দোষারোপের খেলায় শেষ পর্যন্ত জয়ী হয় মৃত্যু আর পরাজিত হয় সাধারণ মানুষ।
এখন সময় এসেছে বাস্তবতাকে স্বীকার করার, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার। দায় এড়ানোর রাজনীতি কিংবা মববাদী বক্তব্য দিয়ে সাময়িকভাবে জনমত প্রভাবিত করা যেতে পারে, কিন্তু তা দিয়ে কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। বরং এতে করে সমস্যার গভীরতা আরও বাড়ে এবং জনগণের আস্থা আরও ক্ষয়ে যায়। একজন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত সত্য বলা, সমস্যাকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা এবং তা সমাধানের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। অন্যথায়, এই ধরনের ভুল বক্তব্য এবং সিদ্ধান্তই একসময় একটি বড় সংকটের জন্ম দিতে পারে, যার খেসারত দিতে হবে পুরো জাতিকে।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট।
এইচআর/জেআইএম