প্রবাস

ভয়কে জয় করে এআই বিলিয়নিয়ার

জোয়েল হেলারমার্ক ছোটবেলা থেকেই জীবনকে সীমিত ভাবেননি। মৃত্যুর ভয় তাকে তাড়িত করেছে, কিন্তু সেই চাপই তাকে এআই-এর জগতে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। ২৯ বছর বয়সের মধ্যেই তিনি নিজের স্টার্টআপ সানা বিক্রি করে বিলিয়নিয়ার হয়েছেন।

২৯ বছর বয়সী জোয়েল হেলারমার্ক এআই বিপ্লবের প্রথম প্রজন্মের সফল উদ্যোক্তাদের একজন। গত বছর তিনি তার প্রতিষ্ঠানকে একটি আমেরিকান সফটওয়্যার কোম্পানির কাছে বিক্রি করে বিলিয়নিয়ার হন।

গত গ্রীষ্মে এক পারিবারিক ডিনারের সময় তিনি হঠাৎ ভিডিওকলে যোগ দিতে অতিথি কক্ষে চলে যান। পশ্চিম উপকূলে বাবা-মায়ের গ্রামীণ বাড়িতে মেঝেতে বসে ল্যাপটপ খুলে কল শুরু করেন। ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক Workday-এর সিইও Carl Eschenbach ছিলেন কলের অন্য প্রান্তে।

জোয়েল ভেবেছিলেন, এটি হয়তো বিনিয়োগ সংক্রান্ত আলোচনা। কিন্তু তার বদলে আসে পুরো কোম্পানি কিনে নেওয়ার প্রস্তাব।

‘একটি বড় সফটওয়্যার কোম্পানির সিইও আমাকে মেঝেতে বসে থাকা অবস্থায় কিনতে প্রস্তাব দিচ্ছেন, এটি সত্যিই এক চমকপ্রদ মুহূর্ত ছিল,’ বলেন তিনি।

প্রায় আধা ঘণ্টা পর তিনি ঘরে ফিরে এসে পরিবারের সঙ্গে বিষয়টি শেয়ার করেন। তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, যদিও প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে অন্যান্য শেয়ারহোল্ডার ও কর্মীদের সঙ্গে আরও কাজ বাকি ছিল।

‘পরিবারের জন্য এটি ছিল এক বড় বিস্ময়, তবে আমাদের জন্য এটি একটি পূর্ণতার মুহূর্ত,’ বলেন জোয়েল।

তার সঙ্গে ছিলেন বাবা অ্যান্ডার্স, মা সেসিলিয়া, বান্ধবী আনা, বড় ভাই হ্যাম্পাস এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্য। শ্যাম্পেন খুলে তারা সাফল্য উদযাপন করেন।

শৈশব ও গড়ে ওঠা

জোয়েল জন্মগ্রহণ করেন মালয়েশিয়ায় এবং শৈশব কাটে টোকিওতে। তার বাবা ছিলেন কনসাল্টিং প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার এবং মা IBM-এ অতিথি গবেষক হিসেবে কাজ করতেন।

‘আমার বাবা-মা অত্যন্ত কৌতূহলী ছিলেন এবং কখনো আমাকে সীমাবদ্ধ করেননি। ঘরে শেখার আগ্রহকে সবকিছুর ওপরে গুরুত্ব দেওয়া হতো,’ তিনি বলেন।

সাত বছর বয়সে পরিবার স্টকহোমে চলে আসে। লিডিঙ্গোতে নিজের ঘরে বসেই তিনি প্রোগ্রামিং শেখা শুরু করেন এবং Stanford University-এর মেশিন লার্নিং কোর্স অনুসরণ করতেন।

‘কখনো নিউরোসায়েন্স, কখনো দর্শন, আবার কখনো প্রোগ্রামিং—এআই এই সবকিছুর সংমিশ্রণ,’ বলেন তিনি।

তিনি Leonardo da Vinci, Richard Hamming এবং Buckminster Fuller-এর জীবনী পড়তেন, যা তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

‘আমি পড়েছিলাম, Albert Einstein এবং Isaac Newton তাদের গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন তরুণ বয়সে। তখন থেকেই মনে হতো, সময়মতো কিছু অর্থবহ করতে না পারলে পিছিয়ে পড়ব,’ বলেন জোয়েল।

তিনি ছোটবেলা থেকেই জীবনের অস্থায়িত্ব উপলব্ধি করেছিলেন।

‘আমি ভয় পাই এমন কিছু না করে মারা যাওয়ার। তাই সময়কে অর্থবহ কাজে ব্যবহার করতে চাই।’

সানা এবং এআই যাত্রা

২০১৬ সালে জোয়েল ও আনা মিলে সানা প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথমে এটি ছিল একটি এআই-চালিত শিক্ষণ প্ল্যাটফর্ম, পরে এটি কর্পোরেট প্রশিক্ষণ ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির একটি শক্তিশালী টুলে পরিণত হয়।

বর্তমানে সানার কর্মীসংখ্যা প্রায় ৩০০, যার অর্ধেক স্টকহোমে। লন্ডন ও নিউ ইয়র্কেও তাদের কার্যক্রম রয়েছে। ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানের আয় ছিল ৯৬ মিলিয়ন ক্রোন, তবে ক্ষতি ছিল ১৬১ মিলিয়ন।

জোয়েল মনে করেন, আগামী দুই বছর এআই খাতে নেতৃত্ব নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

‘আমরা যদি আমাদের শক্তিতে মনোনিবেশ করি এবং অংশীদাররা সঠিকভাবে বিতরণে কাজ করে, তাহলে আমাদের জয়ের সম্ভাবনা বাড়বে,’ বলেন তিনি।

কর্মসংস্কৃতি ও দৃষ্টিভঙ্গি

জোয়েল প্রচলিত ৯টা-৫টা কর্মসংস্কৃতিতে বিশ্বাসী নন। তার মতে, সেরা টিমগুলো ছোট, নিবেদিত এবং গভীর মনোযোগী।

‘যদি আপনি আপনার কাজকে গুরুত্বপূর্ণ মনে না করেন, তাহলে এটি আপনার জন্য নয়। আমরা এমন মানুষ চাই, যাদের মধ্যে আগুন আছে,’ বলেন তিনি।

সানা বিক্রির পরও তিনি সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং আগের চেয়েও বেশি মনোযোগী।

‘আমি এখন আরও বেশি ভাবি, কীভাবে নিজেকে উন্নত করা যায় এবং আরও কার্যকর হওয়া যায়।’

১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ সালে সানা বিক্রি হয় Workday-এর কাছে প্রায় ১০ বিলিয়ন ক্রোনে। তার ব্যক্তিগত আয় দাঁড়ায় দুই বিলিয়ন ক্রোনেরও বেশি।

নতুন প্রজন্মের জন্য শিক্ষা

সুইডেনে এমন ঘটনা অস্বাভাবিক নয়, তবে প্রতিটি গল্পই নতুন অনুপ্রেরণা তৈরি করে। প্রযুক্তির এই সময়ে এআই শুধু একটি ধারণা নয়, এটি ভবিষ্যৎ গঠনের হাতিয়ার।

জোয়েলের গল্প আমাদের কয়েকটি বিষয় স্পষ্টভাবে শেখায়,

১. ছোটবেলা থেকেই কৌতূহল লালন করা জরুরি২. অর্থবহ কাজে সময় বিনিয়োগ করা উচিত৩. ধৈর্য ও অধ্যবসায় সাফল্যের মূল চাবিকাঠি৪. ভয়কে এড়িয়ে নয়, তাকে সঙ্গে নিয়েই এগোতে হয়

বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে বিশ্বে নিজের অবস্থান তৈরি করা সম্ভব।

রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, প্রাক্তন পরিচালক, ফাইজার, সুইডেনrahman.mridha@gmail.com

এমআরএম/জেআইএম