টানা তৃতীয়বারের মতো ইতালি জাতীয় ফুটবল দল বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নিতে ব্যর্থ হয়েছে- এমন বাস্তবতা এখন আর কেবল হতাশার নয়, বরং গভীর আত্মসমালোচনা এবং কেন এমন পরিস্থিতির শিকার হচ্ছে তারা- তার বিশ্লেষণরও দাবি রাখে।
চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন একটি দল, যে দল একসময় বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হতো, তারা এখন টানা তিনটি ফিফা বিশ্বকাপ-এ অংশ নিতে পারছে না- এ দৃশ্য নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর এবং বেদনাদায়ক। আরও অবাক করার বিষয় হলো, এবারের বিশ্বকাপে দলসংখ্যা ৩২ থেকে বাড়িয়ে ৪৮ করা হলো। অথচ, ৪৮ দলের বিশ্বকাপেও জায়গা নিশ্চিত করতে পারেনি ইতালি।
সবশেষ ব্যর্থতার গল্পটি আরও নাটকীয়। প্লে-অফে বসনিয়া এবয় হার্জেগোভিনার বিপক্ষে টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নিল ইতালি। ম্যাচের পুরো সময়জুড়ে লড়াই, সুযোগ-অপচয়, নাটকীয় মুহূর্ত- সবই ছিল; কিন্তু শেষ পর্যন্ত জয় পেলো বসনিয়া। ম্যাচের একপর্যায়ে এগিয়েও ছিল ইতালি; কিন্তু ৪১ মিনিটে আলেসান্দ্রো বাস্তোনির লাল কার্ড যেন পুরো ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। একজন কম নিয়ে খেলতে বাধ্য হওয়া ইতালি ধীরে ধীরে রক্ষণাত্মক হয়ে পড়ে, আর সেই সুযোগে বসনিয়া একের পর এক আক্রমণ চালিয়ে যায়।
এই ম্যাচে ইতালির গোলরক্ষক জিয়ানলুইজি দোনারুম্মা ছিলেন প্রায় একক নায়ক। তিনি একাই ১০টি সেভ করেন, যার মধ্যে বেশ কয়েকটি ছিল দুর্দান্ত; কিন্তু তবুও দলকে রক্ষা করতে পারেননি। বসনিয়া পুরো ম্যাচে প্রায় ৩০টি শট নেয়, যা ইতালির ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করে। অন্যদিকে ইতালির আক্রমণভাগে সুযোগ এলেও তা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হন মোইসে কিন, ফেডেরিকো ডিমার্কো কিংবা ফ্রানসেস্কো পিও এসপোজিতোরা। ফলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে হাতছাড়া হয়ে যায়।
ম্যাচ শেষে ইতালির কোচ জেনারো গাত্তুসো দলের মনোবল ও চেষ্টার প্রশংসা করলেও বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। বসনিয়াও সমান তালে লড়েছে, বরং অনেক ক্ষেত্রে এগিয়েই ছিল। বিশেষ করে ৪০ বছর বয়সী এডিন জেকোর নেতৃত্বে দলটি অসাধারণ দৃঢ়তা দেখায়। তাদের লড়াই, আগ্রাসন ও পরিকল্পিত আক্রমণই শেষ পর্যন্ত পার্থক্য গড়ে দেয়।
পরিসংখ্যানও ইতালির ব্যর্থতার গভীরতা বোঝায়। ফিফা র্যাংকিংয়ে ১৩তম স্থানে থাকা একটি দল, যার স্কোয়াডে বয়সজনিত বড় কোনো সমস্যা নেই- শুধু মাত্তেও পলিতানো ছাড়া কেউ ৩০-এর ওপরে নয়। অথচ তারা কেন এমন ব্যর্থতায় ডুবে গেল, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। ম্যাচের প্রথমার্ধে ইতালির প্রত্যাশার গোল ছিল মাত্র ০.১৫, যা আক্রমণভাগের দুর্বলতারই প্রমাণ।
তবে এই ব্যর্থতার বীজ বোনা হয়েছিল আরও আগেই। বাছাইপর্বের শুরুতেই নরওয়ে জাতীয় ফুটবল দলের কাছে হেরে ইতালি নিজেদের পথ কঠিন করে তোলে। সেই হারের কারণে সরাসরি কোয়ালিফাই করার সুযোগ অনেকটাই হাতছাড়া হয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত প্লে-অফের ওপর নির্ভর করতে হয়। আর প্লে-অফের মতো এক ম্যাচের লড়াইয়ে ভাগ্য, চাপ ও ছোট ছোট ভুলই বড় হয়ে ওঠে- যেমনটি হয়েছে এবারও।
ক্রমাগত এমন ব্যর্থতার জন্য ইতালিয়ানরা হতবাক হয়ে গেছে। তারা কাকে দোষ দেবে? খুঁজেই পাচ্ছে না যেন। দোষ না ঢেকে তারা নিজেদেরকেই দাঁড় করাচ্ছে কাঠগড়ায়। অনেকেই ইতালির এই পতনের জন্য তাদের ঘেরোয়া লিগ ‘সিরি আ’র মান কমে যাওয়া বা যুব উন্নয়নের সমস্যাকে দায়ী করছেন। বাস্তবে কিছু কাঠামোগত সমস্যা থাকলেও এই নির্দিষ্ট ব্যর্থতার মূল কারণ সেগুলো নয় বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বরং ম্যাচে ভুল সিদ্ধান্ত, সুযোগ নষ্ট, এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ব্যর্থ পারফরম্যান্সই ইতালিকে এই অবস্থায় নিয়ে এসেছে।
অনেকেই কোচ জেনারো গাত্তুসোর কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কোচের কৌশল ছিল সহজ-রক্ষণ, সময় নষ্ট, কাউন্টার; কিন্তু এক খেলোয়াড় কমে গেলে সেই পরিকল্পনা ভেঙে পড়ে। মাঠের বাইরে উৎসাহ দেওয়ার বাইরে তিনি তেমন কার্যকর কোনো পরিবর্তন আনতে পারেননি।
চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের জন্য এই ব্যর্থতা নিঃসন্দেহে গর্বে বড় আঘাত। ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সাফল্যের ভার নিয়ে মাঠে নামা ইতালির জন্য বিশ্বকাপের বাইরে থাকা মানে শুধু একটি টুর্নামেন্ট মিস করা নয়- এটি একটি যুগের পতনের ইঙ্গিতও হতে পারে। যারা দীর্ঘদিন ধরে ইতালিকে বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষে দেখেছেন, তাদের কাছে এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া কঠিন। এখন একটাই প্রশ্ন- এই অন্ধকার কাটিয়ে আবার কবে আলোয় ফিরবে আজ্জুরিরা?
আইএইচএস/