প্রতিটি ফুটবল ভক্তই নিজের দেশকে বিশ্বকাপে দেখার স্বপ্ন দেখে; কিন্তু ফিফার ২১১টি সদস্য দেশের অনেকের কাছেই সেই আকাঙ্ক্ষা কেবলই একটি স্বপ্ন হয়েই থেকে যায়।
তবে, কানাডা, মেক্সিকো এবং যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ আয়োজনে ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য ফুটবলের এ মহোৎসবটি এখন ৪৮টি দলে সম্প্রসারিত। যার ফলে এক সময় যারা বাদ পড়ে যেত, সেই দেশগুলোর জন্য এবার বিশ্বকাপে খেলার সুযোগের দরজা খুলে যায়। শুধু তাই নয়, নতুন নতুন দেশগুলোর জন্যও সঠিক সময়ে নিজেদের সেরা ছন্দে ফিরে আসা এবং তাদের সোনালী প্রজন্মকে প্রথমবারের মতো ফাইনালে খেলার যোগ্যতা অর্জনে এই সুযোগকে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজে লাগিয়েছে।
বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো অংশগ্রহণকারী দলের রেকর্ডটি হলো ছয় (১৯৩০ সালের প্রথম টুর্নামেন্ট বাদে)। অ্যাঙ্গোলা, আইভরি কোস্ট, ঘানা, টোগো, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো এবং ইউক্রেন- এ ৬টি দল ২০০৬ বিশ্বকাপে প্রথমবার অংশগ্রহণ করে।
২০২৬ বিশ্বকাপ বাছাইয়ে সর্বশেষ মার্চ মাসের প্লে-অফের আগে সম্ভাব্য নবাগত হিসেবে নয়টি দলের নাম থাকলেও, ১১ই জুন প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার সময় তাদের মধ্যে মাত্র চারটি দল মাঠে নামবে।
কেপ ভার্দে, কুরাসাও, জর্ডান এবং উজবেকিস্তান- এই চারটি নতুন দল বিশ্বকাপে তাদের টিকিট নিশ্চিত করেছে, কিন্তু মাঠের ভেতরে ও বাইরে এই দেশগুলো সম্পর্কে আমরা কী জানি? এই গ্রীষ্মে খেলা দেখতে আসা বিশ্বের বেশিরভাগ ভক্তদের জন্য, তাদের ব্যাপারে জানা তথ্যগুলো খুব বেশি কিছু নয়।
২০২৬ বিশ্বকাপের এই আন্ডারডগদের সাথে আরও ভালোভাবে পরিচিত হতে ইএসপিএন সকারনেট পাঠকদের সামনে তুলে ধরেছে তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত...।
কেপ ভার্দে: ছোট দেশ, বড় স্বপ্নআফ্রিকার পশ্চিম উপকূলের কাছে অবস্থিত ১০টি দ্বীপের একটি আগ্নেয় দ্বীপপুঞ্জ, কেপ ভার্দে। আফ্রিকাযন বাছাই পর্বে গ্রুপ ডি’তে শীর্ষস্থান অর্জন করে বিশ্বকাপে তাদের স্থান প্রথমবারেরমত নিশ্চিত করেছে, যেখানে তারা ক্যামেরুনের মত দলকেও পেছনে ফেলেছে।
মাত্র ৫ লাখ ২৫ হাজার জনসংখ্যা নিয়ে, কেপ ভার্দে ২০১৮ সালের আইসল্যান্ড এবং ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে নবাগত কুরাসাও-এর পর জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জনকারী তৃতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ। ১৩ই অক্টোবর নিজেদের মাটিতে এসওয়াতিনিকে ৩-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপে ওঠার চূড়ান্ত জয়টি আসে, যা কেপ ভার্দের রাজধানী প্রাইয়াতে ব্যাপক উদযাপনের উপলক্ষ সৃষ্টি করে।
কেপ ভার্দের ডিফেন্ডার রবার্তো ‘পিকো’ লোপেস ইএসপিএন-কে বলেন, ‘এসওয়াতিনি ম্যাচের দিন আমি শক্তি সঞ্চয় করার চেষ্টা করছিলাম; কিন্তু উত্তেজনায় আমার পেট মোচড় দিচ্ছিল।’
‘আমার খেলার আগে একটু ঘুমিয়ে নেওয়ার কথা ছিল; কিন্তু তারপর অন্য একজন খেলোয়াড় স্পিকার বের করে গান বাজাতে শুরু করল। আমরা সবাই নাচতে শুরু করলাম। আর তখনই আমরা যেন বুঝে গেলাম যে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে, দিনটা আমাদেরই হতে হবে।’
আন্তর্জাতিক ম্যাচগুলোর জন্য সারা বিশ্ব থেকে একত্রিত হওয়া কেপ ভার্দে দলের সদস্যদের মধ্যে বন্ধন দৃঢ় করার ক্ষেত্রে সঙ্গীত এবং ঐতিহ্যবাহী খাবার একটি বড় ভূমিকা পালন করে।
লোপেস বলেন, ‘ড্রেসিং-রুমের পরিবেশে সঙ্গীত একটি বিশাল অংশ। আমরা ঐতিহ্যবাহী গান, ফুনানা সঙ্গীত বাজাই, যা পুরনো এবং আধুনিক গানের একটি মিশ্রণ। আমরা সন্ধ্যায় এবং সকালের নাস্তায় কাচুপা (শিম ও ভুট্টার স্টু) খাই। এটি আমাদের জাতীয় খাবার এবং আমরা সবাই একসাথে এটি খাই।’
ব্লু শার্কসরা ২০১৩ এবং ২০২৩ সালের আফ্রিকা কাপ অফ নেশন্সের কোয়ার্টার ফাইনালিস্ট ছিল, তাই বড় প্রতিযোগিতা তাদের কাছে নতুন কিছু নয়; কিন্তু বিশ্বকাপের জন্য যোগ্যতা অর্জনের বিশালতা ছিল সুস্পষ্ট।
‘আমরা বছরের পর বছর ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম এবং (বাছাই পর্বের) ড্র হওয়ার পর আমাদের মধ্যে একটা দৃঢ় সংকল্প তৈরি হয়েছিল। আমরা ভেবেছিলাম, 'এখন না হলে আর কখন?’- লোপেস বলেন।
‘এসওয়াতিনির খেলা দেখার জন্য সরকার সবাইকে ছুটি দিয়েছিল এবং বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জন করাটা আমাদের কাছে সবকিছু। আমরা একটি অত্যন্ত গর্বিত ফুটবল জাতি, কিন্তু আফ্রিকার উপকূলের এই ১০টি ছোট্ট দ্বীপ যখন বড় বড় নামগুলোর সাথে সেখানে আছে, তখন গর্ববোধ না করে কি থাকা যায়?’
কেপ ভার্দেকে গ্রুপ ‘এইচ’-এ রাখা হয়েছে, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ হবে স্পেন, উরুগুয়ে এবং সৌদি আরব। ‘আমার ভেতরের ছেলেটা ব্রাজিলের সাথে খেলতে চায়’- লোপেস বলেন। ‘ওরা বিশ্বকাপের প্রতীক; কিন্তু ওদের সাথে খেলার সুযোগ পেতে হলে আমাদের বেশ কিছু কাজ করতে হবে! আমরা যে গ্রুপটি পেয়েছি তাতে আমরা খুশি।’
জর্ডান: স্বপ্ন থেকে বাস্তবতায়জর্ডান হলো ‘জর্ডান নদী’র পূর্ব তীরে অবস্থিত একটি আরব রাষ্ট্র, যার সীমান্তে পাঁচটি দেশ রয়েছে- সিরিয়া, ইরাক, সৌদি আরব, ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর। এটি একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র হয়ে উঠেছে, যেখানে দর্শনার্থীরা এ দেশটির ইউনেস্কো ঘোষিত ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলো দেখতে এবং পৃথিবীর সর্বনিম্ন স্থান মৃত সাগরে সাঁতার কাটতে ভিড় করে।
‘সবচেয়ে বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র হলো প্রাচীন শহর ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান পেত্রা,’- জর্ডানের ভক্ত জাইদ আল আতিয়াত ইএসপিএন-কে বলেন। এর গোলাপি বেলেপাথরের কারণে এর ডাকনাম ‘গোলাপী শহর’ এবং এটি বিশ্বের নতুন ৭টি আশ্চর্যের মধ্যে একটি (২০০০ সালে বিদ্যমান ২০০টি স্মৃতিস্তম্ভ থেকে বিশ্বের আশ্চর্য বেছে নেওয়ার একটি প্রচারণার পর)।
‘অথবা, আপনি যদি মঙ্গল গ্রহে যেতে চান কিন্তু অতটা দূরে ভ্রমণ করতে না চান, তাহলে ওয়াদি রাম একটি ভালো দ্বিতীয় বিকল্প হতে পারে।’ ডুন, স্টার ওয়ার্স, দ্য মার্শিয়ান এবং লরেন্স অফ অ্যারাবিয়ার মতো হলিউড চলচ্চিত্রগুলোর পটভূমি সেখানেই নির্মিত হয়েছিল।
জর্ডানের জাতীয় খাবার মানসাফ, যা গাঁজানো শুকনো দইয়ের সসে রান্না করা ভেড়ার মাংস দিয়ে তৈরি এবং ভাত বা বুলগুরের সাথে পরিবেশন করা হয়, তা দেশটির ১ কোটি ১৫ লক্ষ বাসিন্দার জন্য অত্যন্ত গর্বের উৎস। তবে এটি মাঠের ভেতরের একটি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতেও ছিল।
আল আতিয়াত জানায়, ‘জর্ডান এবং ইরাকের মধ্যে ২০২৩ এএফসি এশিয়ান কাপের রাউন্ড অব সিক্সটিন খেলায়, জর্ডানের ফরোয়ার্ড ইয়াজান আল-নাইমাত তার সতীর্থদের বেদুইনদের মতো করে বৃত্তাকারে জড়ো করে গোল উদযাপন করেন এবং সবাই এমনভাবে হাত নাড়েন যেন তারা মানসাফ খাচ্ছেনভ’
‘দ্বিতীয়ার্ধে ইরাক এগিয়ে যাওয়ার পর, গোলদাতা আয়মেন হুসেন নিজের মতো করে মানসাফের ভঙ্গিতে পা ভাঁজ করে বসে উদযাপন করেন, এরপর বিতর্কিতভাবে (রেফারি) আলিরেজা ফাঘানির কাছ থেকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড পান।’
ইরাকের বিপক্ষে শেষ হাসি হেসেছে জর্ডান, জয়লাভ করে। ৩-২ গোলে জিতে তারা ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছেছিল, যেখানে তারা স্বাগতিক কাতারের কাছে হেরে যায়।
‘দ্য শিভ্যালরাস ওয়ানস’- ওমানের বিপক্ষে তাদের মাঠে ৩-০ গোলের জয়ের মাধ্যমে ২০২৫ সালের জুনে বিশ্বকাপের জন্য যোগ্যতা অর্জন করে, যা নিশ্চিত করে যে তারা এশিয়ার গ্রুপ ‘বি’-তে দক্ষিণ কোরিয়ার পিছনে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করবে।
আল আতিয়াত বলেন, ‘ছোটবেলায় আমি কখনো কল্পনাও করিনি যে জর্ডানকে বিশ্বমঞ্চে দেখব; কিন্তু ২০২৩ সালের এশিয়ান কাপ সত্যিই আমাদের এমনভাবে বড় স্বপ্ন দেখার সুযোগ করে দিয়েছে, যা আমরা আগে কখনো ভাবিনি।’
বিশ্বকাপে জর্ডানকে গ্রুপ ‘জে’-তে রাখা হয়েছে এবং তারা অস্ট্রিয়া, আলজেরিয়া ও আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হবে। যদিও নবাগতদের জন্য এটি একটি কঠিন পরীক্ষা বলে মনে হচ্ছে, তাদের দলে কিছু প্রতিভাবান খেলোয়াড় রয়েছে যারা নিজেদের মেলে ধরতে প্রস্তুত।
আল আতিয়াত বলেন, ‘জর্ডানের কথা ভাবলেই মুসা আল-তামারি এবং তার বিদ্যুতের মতো গতি ও ড্রিবলিংয়ের নাম সবার মাথায় থাকা উচিত। তিনি প্রথম জর্ডানীয় যিনি শীর্ষ পাঁচ লিগে (ইউরোপে) খেলেছেন ও গোল করেছেন, এবং তিনি স্টাড রেনেসের একজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।’
‘ইয়াজান আল-আরব আমাদের সেন্ট্রাল ডিফেন্সের স্তম্ভ, তিনিই প্রথম জর্ডানীয় যিনি কে লিগ-ওয়ান (বা এফসি সিউলে) খেলেছেন এবং তিনি কে লিগের ২০২৫ সালের বর্ষসেরা দলে ছিলেন।’
বিশ্বকাপে জর্ডানের গ্রুপে রয়েছে অস্ট্রিয়া, আলজেরিয়া ও আর্জেন্টিনা- যা নিঃসন্দেহে কঠিন পরীক্ষা।
কুরাসাও: ক্ষুদ্র দ্বীপের বিশাল অর্জননেদারল্যান্ডসের অধীনস্থ একটি স্বায়ত্তশাসিত ক্যারিবিয়ান দ্বীপ কুরাসাও। যা তার মনোরম সৈকত এবং ডাইভিংয়ের জন্য বিখ্যাত। কুরাসাও এখন ফুটবলের ইতিহাসেও একটি নতুন অধ্যায়ের দাবিদার হতে পারে। মাত্র ১ লাখ ৫৬ হাজার জনসংখ্যার দেশ কুরাসাও বিশ্বকাপের জন্য যোগ্যতা অর্জনকারী সর্বকনিষ্ঠ দেশ হিসেবে এরই মধ্যে রেকর্ড সৃষ্টি করেছে।
বাছাই পর্বে কনকাকাফের তিনটি ঐতিহ্যবাহী পরাশক্তির অনুপস্থিতির (স্বাগতিক হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা এমনিতেই বিশ্বকাপে সুযোগ পেয়েছে) সুযোগ নিয়ে তারা এই সাফল্য অর্জন করে।
কুরাসাওয়ের দুটি প্রধান খেলা হলো বেসবল এবং ফুটবল। মেজর লিগ বেসবল হল অফ ফেমার অ্যান্ড্রু জোন্স কুরাসাওয়ের অধিবাসী; কিন্তু ফুটবলের মাঠে এখন পর্যন্ত সাফল্য অর্জন করা বেশ কঠিন ছিল তাদের জন্য।
কুরাসাওয়ের সাবেক যুব আন্তর্জাতিক খেলোয়াড় এবং দেশটির সমর্থক গোষ্ঠীর প্রধান ব্রেন্টন ব্যালেনটিন, যিনি ‘ক্যাপ্টেন ব্লু ফেস’ নামেও পরিচিত, ইএসপিএনকে বলেন, ‘টুর্নামেন্টটি যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডায় অনুষ্ঠিত হবে জানার সাথে সাথেই আমরা বুঝে গিয়েছিলাম যে আমরা সুযোগ পাব।’
কিন্তু যোগ্যতা অর্জনের এই প্রক্রিয়াটি চাপমুক্ত ছিল না। কুরাসাওকে তাদের স্থান নিশ্চিত করতে শেষদিনে জ্যামাইকা সফরে যেতে হয়েছিল এবং একটি ড্র-এর প্রয়োজন ছিল।
‘যখন আমরা ঘরের মাঠে জ্যামাইকাকে হারালাম, জানতাম এই বছরটা আমাদেরই; কিন্তু তারপর অ্যাওয়ে ম্যাচের সময় আমার মনে হচ্ছিল মরেই যাব’- ব্যালেনটিন বলেন। ‘শেষ মুহূর্তে যখন তাদের একটি পেনাল্টি দেওয়া হলো; কিন্তু ভিএআর সেটি বাতিল করে দেয়, তখন কয়েক সেকেন্ডের জন্য আমার হৃৎস্পন্দন থেমে গিয়েছিল। তবে সেই অনুভূতিটা থেকে যায়!’
কুরাসাও-এর বেশিরভাগ খেলোয়াড় নেদারল্যান্ডসে জন্মগ্রহণ করেন এবং বাছাইপর্বে তাদের নেতৃত্ব দেন কিংবদন্তি ডাচ কোচ ডিক অ্যাডভোকেট। ৭৮ বছর বয়সী অ্যাডভোকেট বিশ্বকাপে কোচিং করানো সবচেয়ে বয়স্ক কোচ হতে পারতেন; কিন্তু পারিবারিক কারণে গত মাসে তাকে এই পদ থেকে সরে দাঁড়াতে হয়। তবে, নেদারল্যান্ডসের সাথে দৃঢ় সম্পর্কের পাশাপাশি কুরাসাও-এর সংস্কৃতির উপর আরও অনেক প্রভাব রয়েছে।
‘কুরাসাও একটি অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় দ্বীপ, যেখানে বিভিন্ন সংস্কৃতি এক হয়ে গেছে,’ ব্যালেনটিন বলেন। আমরা পাঁচ-ছয়টি ভাষায় কথা বলি: ডাচ, ইংরেজি, স্প্যানিশ, পাপিয়ামেন্তো, পর্তুগিজ, ফরাসি।
‘সাধারণত বিশ্বকাপের সময় অনেকেই নেদারল্যান্ডসকে সমর্থন করে; কিন্তু যারা এই দ্বীপে জন্মেছে এবং বড় হয়েছে, তাদের জন্য ব্রাজিলকে সমর্থন করাটা বাধ্যতামূলক। পেলের সময় থেকে তারাই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি সমর্থিত দল।’
গ্রুপ ‘ই’-তে জার্মানি, ইকুয়েডর এবং আইভরি কোস্টের মুখোমুখি হওয়ায় কুরাসাওকে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হবে; কিন্তু যা-ই ঘটুক না কেন, এই দ্বীপে থাকার জন্য এটি একটি বিশেষ সময় হবে।
‘এখানে সবসময়ই একটা প্রাণচাঞ্চল্য থাকে, সবসময়ই একটা উৎসবের আমেজ থাকে, বিশেষ করে খেলাধুলার ক্ষেত্রে এই প্রাণচাঞ্চল্য উপচে পড়ে’- বালেন্তিন বলেন। ‘আমরা জানি কিভাবে ভালো খেতে ও পান করতে হয়।’
‘আমাদের বিশেষত্ব হলো কুমিন্দা দি তেরা, অর্থাৎ মাটির খাবার। আমরা খাসির মাংস ও ইগুয়ানা খাই, ঢেঁড়সের স্যুপ খাই, এগুলো খুবই পছন্দের। পানীয় হিসেবে আমাদের আছে ব্লু কুরাসাও (একটি উজ্জ্বল কমলালেবুর স্বাদের মদ)- যা বিশ্বের আসল ও সেরা এবং এটি স্থানীয় ডিস্টিলারি ল্যান্ডহুইস চোবোলোবোতে তৈরি হয়।’
‘আমরা জিতি, হারি বা ড্র করি, যা-ই করি না কেন, উৎসব হবেই। আমরা শুধু এই বিষয়টাই উদযাপন করব যে, আমরা এত বড় একটা মঞ্চে খেলতে পারছি।’
উজবেকিস্তান: অপেক্ষার অবসানবিশ্বকাপের জন্য যোগ্যতা অর্জনকারী প্রথম মধ্য এশীয় দেশ হিসেবে উজবেকিস্তান অবশেষে অতীতের ব্যর্থতার ভূত কাটিয়ে ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরে জায়গা করে নিয়েছে।
ভৌগোলিকভাবে, প্রায় ৩৮ মিলিয়ন অধিবাসীর এই সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রটির একটি অদ্ভুত খ্যাতি রয়েছে, যা এটি ক্ষুদ্র ইউরোপীয় রাজত্ব লিচেনস্টেইনের সাথে ভাগ করে নেয়। উজবেকিস্তানের সমর্থক জালালুদ্দিন মাখমুদভ ইএসপিএনকে বলেন, ‘উজবেকিস্তান বিশ্বের দুটি দ্বৈতভাবে স্থলবেষ্টিত দেশের মধ্যে একটি (অর্থাৎ এর এবং যেকোনো দিকে একটি উপকূলরেখার মধ্যে অন্য দুটি দেশ রয়েছে)।’
‘আমাদের দেশ একসময় গ্রেট সিল্ক রোডের কেন্দ্র ছিল (চীনকে রোমান সাম্রাজ্য, ভারত এবং আফ্রিকার সাথে সংযোগকারী সমুদ্র ও স্থল বাণিজ্য পথের একটি বিশাল নেটওয়ার্ক)।’
খাবারের ক্ষেত্রেও উজবেকিস্তানের গর্ব করার মতো কিছু চিত্তাকর্ষক কৃতিত্ব রয়েছে। ‘আমাদের ঐতিহ্যবাহী খাবার পোলাও নামে পরিচিত এবং এটি সব অনুষ্ঠানেই পরিবেশন করা হয়, তা সে বিয়ের অনুষ্ঠান হোক বা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া,’ মাখমুদভ বলেন। ‘এমনকি আমরা একটি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডও গড়েছি, যখন রাজধানী তাশখন্দে ৭,৩৬০ কেজি (১৬,২২৬ পাউন্ড) পোলাও তৈরি করা হয়েছিল।’
উজবেকিস্তান দ্বিতীয় বাছাইপর্ব জুড়ে অপরাজিত ছিল এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে গোলশূন্য ড্র করার পর এক ম্যাচ বাকি থাকতেই বিশ্বকাপে খেলা নিশ্চিত করে। উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি, উজবেকিস্তানের বীরত্বপূর্ণ ব্যর্থতার ইতিহাসের পর এক ধরনের স্বস্তির অনুভূতিও ছিল দেশটির ফুটবল সমর্থকদের মধ্যে।
২০১৪ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের প্লে-অফে ‘হোয়াইট উলভস’ জর্ডানের কাছে পেনাল্টিতে ৯-৮ গোলে হেরেছিল এবং ২০০৬ সালের বিশ্বকাপ আসর থেকে বিতর্কিতভাবে অ্যাওয়ে গোলের ভিত্তিতে বাহরাইনের কাছে বাদ পড়ে, যখন রেফারির ভুলের কারণে প্রথম লেগের খেলাটি পুনরায় খেলা হয়েছিল।
‘পুরো উজবেকিস্তান ৩৪ বছর ধরে বিশ্বকাপের জন্য অপেক্ষা করে আসছে,’ মাখমুদভ বলেন। ‘আমরা সবসময় শেষ রাউন্ডে ব্যর্থ হতাম এবং তা পুরো জাতিকে সত্যিই কষ্ট দিত।’
‘যদিও আমরা বক্সিংয়ে অন্যতম সেরা, তবুও ফুটবল নিঃসন্দেহে উজবেকিস্তানের সবচেয়ে প্রিয় খেলা। তাই, বিশ্বকাপ একটি অত্যন্ত বড় উপলক্ষ। আমরা সবসময়ই সেখানে পৌঁছানোর সামর্থ্য রাখি বলে মনে করতাম এবং আমাদের খেলোয়াড়রা শীর্ষ পাঁচটি লিগে নিজেদের মেলে ধরতে শুরু করেছে, পাশাপাশি আমাদের জাতীয় লিগও দারুণ উন্নতি করেছে।’
উজবেকিস্তানের কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন ইতালির বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক এবং ২০০৬ সালের ব্যালন ডি’অর বিজয়ী ফ্যাবিও ক্যানাভারো। মাঠে তাদের সবচেয়ে পরিচিত মুখ হবেন ম্যানচেস্টার সিটির আবদুকোদির খুসানভ, তবে আরও অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড় আছেন যারা নিজেদের মেলে ধরতে প্রস্তুত।
মাখমুদভ বলেন, ‘ওস্টন উরুনভ তার অসাধারণ ড্রিবলিং এবং শুটিং দক্ষতা দিয়ে শিরোনামে চলে আসতে পারেন। আর আব্বোস ফায়জুল্লায়েভ হলেন আরেকজন উদীয়মান তারকা, যাকে ২০২৪ সালের এএফসি বার্ষিক পুরস্কার অনুষ্ঠানে ২০২৩ সালের এএফসি বর্ষসেরা যুব খেলোয়াড় হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সুতরাং অবাক হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকুন!’
আইএইচএস/