বিনোদন

‘কেজিএফ’ রোগের উপসর্গ, কখনো ‘তুফান’, কখনো দেখা দেয় ‘প্রিন্স’ নামে

রায়হান রাফীর ‘তুফান’ দেখা ছিল। দেখা হলো আবু হায়াত মাহমুদের ‘তুফান’! যদিও ছবির নাম ‘প্রিন্স’, তবু বলতেই হচ্ছে, এটি ‘তুফান’-এর পুনর্নির্মাণ। ‘প্রিন্স’ আবু হায়াত মাহমুদের ইচ্ছেপূরণের গল্প। তার সাধ হয়েছিল, ‘তুফান’-এর বিষয়বস্তু ও নামচরিত্রকে অনুসরণ করে হাঁটবেন, পা গলাবেন রায়হান রাফীর ফেলে আসা জুতায়। তার সে আশা পূরণ হয়েছে।

প্রেক্ষাপটজনিত যে অসঙ্গতি ‘তুফান’-এ ছিল, সেই একই অসঙ্গতি আছে ‘প্রিন্স’-এও। ছবির ট্যাগলাইন ‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন ঢাকা’। কিন্তু গল্পে যেন দেখা গেল কলকাতা। ডাবিং বদলে দিলে ঢাকা আর কলকাতার মধ্যে কোনো ফারাক থাকবে না। এ ছবি যতটা না ঢাকার গল্প নিয়ে, ততটাই কলকাতার গল্প নিয়ে। আসলে এই গল্প না ঢাকার, না কলকাতার, মূলত দক্ষিণ ভারতের। ‘কেজিএফ’ রোগের উপসর্গ, কখনো ‘তুফান’ নামে, কখনো দেখা দেয় ‘প্রিন্স’ নামে।

‘তুফান’ দেখলাম, এ কথা কেন লিখেছি? শাকিব খান একই চরিত্রে দুবার অভিনয় করেছেন। একবার ‘তুফান’ সিনেমায়, আরেকবার ‘প্রিন্স’-এ। দুটোই গ্যাংস্টারের গল্প। ক্ষমতা দখলের গল্প। কিং মেকারের গল্প। তবে ‘তুফান’-এ তিনি চরিত্র হয়ে ওঠার চেষ্টা করেছিলেন। ‘প্রিন্স’-এ উল্টো। ওই চরিত্রটিই বরং শাকিব খান হয়ে ওঠার চেষ্টা করেছে। অর্থাৎ শাকিবের ‘তুফান’-এর চরিত্র ভেবেই ‘প্রিন্স’-এর চরিত্র লেখা। ‘প্রিন্স’ হয়ে ওঠার জন্য নায়ককে তেমন কসরৎ করতে হয়নি। আগের চরিত্রের চলন-বলন অবিকৃত রাখাই ছিল শাকিবের কাছে চরিত্রধারণ!

গল্পে পরিস্থিতির কারণে এক যুবককে জেলে যেতে হয়। সেখানে তার পরিচয় হয় এক সন্ত্রাসীর সঙ্গে। সে-ই তাকে জেল থেকে বের করে আনে, নিজের গ্যাংয়ে জায়গা দেয়। তারপর তাকে তুলে দেওয়া হয় আরেক মাফিয়ার হাতে। এলাকার দখল নিয়ে দ্বন্দ্ব দুই মনিবের। একে অন্যকে হত্যা করা। গোলামের কাজ প্রভু হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া। এই ডামাডোলে তার জীবনে আসে প্রেম, তখনই ফিরে আসে পুরাতন প্রেমিকা ...

মূলত গ্যাংস্টারদের খুনোখুনি, অন্তকোন্দল আর রাজনীতি এই ছবির উপাাদান। গল্পের পটভূমি নব্বই দশকের ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড। কিন্তু এই ছবি না ঘরকা, না ঘাটকা। না কলকাতার আন্ডারওয়ার্ল্ড, না এটা ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের। নির্মাতার কল্পিত দুনিয়ার চিত্রায়ন এটি, বাস্তবের সঙ্গে যার কোনো সম্পর্ক নেই। না-ই থাকতে পারে। তবে ছবির নামে ঢাকা থাকলেও পর্দায় ঢাকা ছিল না। ঢাকাকে এই ছবির একটি চরিত্র হয়ে উঠতে হতো। বিশ্বের অনেক গ্যাংস্টার সিনেমায় দেখা গেছে, মাফিয়াদের জীবনের সঙ্গে তাদের শহরের সম্পর্ক আত্মার সঙ্গে শরীরের সম্পর্কের মতো নিবিড়। ‘প্রিন্স’ ছবিতে ঢাকাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এই ছবির শহর দুনিয়ার যেকোনো শহর হতে পারে। কেবল ছবির চরিত্রগুলো বাংলায় কথা বলে, এই যা!

‘প্রিন্স’ ছবির গল্প আমরা আগেও দেখেছি পর্দায়। এবার দেখার বিষয় ছিল— এই ছবির চিত্রনাট্য গল্পটাকে দর্শকদের সামনে নতুন করে পেশ করতে পারছে কি না। মেজবাহ উদ্দিন সুমনের গল্পে কোনো নতুনত্ব নেই, অভিনবত্ব নেই। এই গল্পকে পর্দা-উপযোগী করার জন্য ৬-৭ জন চিত্রনাট্যকার শ্রম দিয়েছেন। টাইটেল কার্ড থেকে মেজবাহ উদ্দিন সুমন, মোহাম্মদ নাজিমউদ্দিন আর অনম বিশ্বাসের নাম মনে করতে পারছি এই মূহূর্তে। এতগুলো নাম স্রেফ ভারে কেটেছেন। তাদের লেখায় কোনো ধার ছিল না। তাদের সংলাপে ছিল না কোনো তেজ।

চিত্রনাট্য একঘেয়ে। সেখানে এমন কোনো বাঁক ছিল না, যা দর্শককে চমকে দিতে পেরেছে। এমন কোনো দৃশ্য নেই, যা সিনেমা হল থেকে বেরুলেও দর্শকের মগজে রয়ে যায়। ছবিতে দৌড়াদৌড়ি আছে, গোলাগুলি আছে, হাতাহাতি আছে। পুলিশ-সন্ত্রাসীর ধাওয়া, পাল্টা ধাওয়া আছে। যা নেই, তা হচ্ছে গতি। অ্যাকশন, কোরিওগ্রাফি অলস অজগরের মতো, দর্শকের শরীরে কোনো শিহরণ জাগে না। ছবির চরিত্রগুলো কাঁদলেও দর্শকের কান্না পায় না, হাসলেও দর্শকের ভেতর স্ফূর্তি আসে না।

ছবির চরিত্রগুলোর মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। প্রিন্সের পুরনো প্রেমিকা ফিরে আসে। এদিকে সে বিয়ে করে বসে আছে সোনিয়াকে। চিত্রনাট্যে টানটান একটা রোমান্টিক কোণের সৃষ্টি হলো। কিন্তু চিত্রনাট্যকারমণ্ডলী মুখ ঘুরিয়ে বসে রইলেন মাফিয়া-সংঘর্ষের দিকে। সেক্ষেত্রে গ্যাং সদস্যদের পারষ্পরিক বোঝপড়া কিংবা বিরোধিতা চিত্রনাট্যে জায়গা পেতে পারত, গল্পকে দ্বন্দ্বমুখর করে তুলত পারত। চিত্রনাট্যকারগণ সেদিকেও ছিলেন বেখবর, বেখেয়ালী।

গ্যাং সদ্যদের মধ্যে একমাত্র গোপাল কর চরিত্রটি পরিপূর্ণতার কাছাকাছি গেছে, যদিও তাকে আরো যত্নে লেখা যেত। ভুট্টো চরিত্রটিকে আরো সুযোগ দেয়া যেত, যেহেতু সে গল্পের একটা মোচড়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। সবচেয়ে অবহেলার শিকার দিলরুবা। প্রিন্সের একজন প্রেমিকা হওয়ার পরও, তাকে যথাযথভাবে লেখা হয়নি। অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নারী চরিত্রের প্রতি এই অনাদর চিত্রনাট্যের অঙ্গহানি করেছে। একইভাবে মা, ভাইয়ের সঙ্গে প্রিন্সের সম্পর্কও অপরিণত রয়ে গেছে।

ছবির চরিত্রগুলোকে ডুবিয়েছে তাদের সংলাপ। পাঠান চরিত্রটি একজন অবাঙালির চরিত্র। সে হিন্দি ভাষায় কথা বলে। যদিও পর্দায় তাকে পুরান ঢাকার বাসিন্দা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ছবি দেখে মনে হয়েছে, কলকাতার দর্শকদের জন্য এই চরিত্রটির সৃষ্টি। অবাঙালি মুসলিম সন্ত্রাসী হচ্ছে পাঠান। তার বিপরীত চরিত্র গোপাল। তাকেও বলা হয়েছে পুরান ঢাকার সন্ত্রাসী। তাকে দেখে মনে হয়েছে, কলকাতার বাঙালি হিন্দু। এরা সবাই কলকাতার উচ্চারণে পূর্ববঙ্গের বাংলা বলেছে।

ছবিতে পাঠান চরিত্রের অভিনেতা বলিউডে ত্রাস-সৃষ্টিকারী অভিনেতা দিব্যেন্দু ভট্টাচার্য। তিনি কখনো হিন্দি বলছেন, কখনো বাংলা বলছেন, সেই বাংলায় কলকাতার টান লুকানোর প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন। তার অভিনয় ছিল ঠিকঠাক, কিন্তু চরিত্রের কোনো পরিণতি ছিল না। গোপাল কর চরিত্রের অভিনেতাও কলকাতার। তার অভিনয়ও মন্দ নয়, চরিত্রও যথাযথ পরিণতি পেয়েছে। কিন্তু তিনি টেনে টেনে বাংলা বলেছেন। সবচেয়ে গড়বড় করেছেন সোনিয়া চরিত্রের অভিনেত্রী জ্যোতির্ময়ী কুণ্ডু। পুরান ঢাকার তরুণীর ঠোঁটে কলকাতার স্বরে ‘আইতাছি’, ‘যাইতাছি’ কতক্ষণ সহ্য করা যায়? নির্মাতা এই অভিনয়শিল্পীদের মাধ্যমে দর্শকের ধৈর্য্যের পরীক্ষা নিয়েছেন।

প্রিন্স চরিত্রে এসব ঝামেলা ছিল না। শাকিব খান দিব্যি কৃত্রিম আঞ্চলিক বাংলায় সংলাপ বলে গেছেন। তার অভিনয় নিয়ে তালিরও কিছু নেই, গালিরও কিছু নেই। তাকে পর্দায় দেখতে ভালো লেগেছে, বেশ ভালো লেগেছে। তার পাশে বেমানান লেগেছে জ্যোতির্ময়ীকে। ছবিতে শাকিবের শরীর বেশ ভারী। বিপরীতে জ্যেতির্ময়ী হালকা, ছিপছিপে। আর ফারিণের সঙ্গে তো শাকিবের যোজন-যোজন দূরত্ব। দিলরুবা চরিত্রে এই অভিনেত্রীকে আইটেম গার্লের চেয়ে সামান্য বেশি মর্যাদা দিয়েছে ‘প্রিন্স’-এর চিত্রনাট্য। ঢাকার ছবিতে ঢাকার নায়িকার এই অবমূল্যায়ন দর্শককে পীড়া দিয়েছে।

বাকি অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে বলতে গেলে কলকাতার কয়েকটি মুখ, তাদের চরিত্রগুলো সুগঠিত নয়। দেশি অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে ইন্তেখাব দিনার, রাশেদ মামুন অপু, শরিফ সিরাজ, এজাজুল ইসলাম, মাহমুদুল ইসলাম মিঠুরা আরো গুরুত্ব পেতে পারতেন। ‘প্রিন্স’কে ঘিরে তারা আবর্তিত হয়েছেন মাত্র।

‘প্রিন্স’-এর টেকনিকাল দিক নিয়ে বলার আসলে বেশি কিছু নেই। বলিউডের একঝাঁক সিনেমাটোগ্রাফারের নাম দেখলাম টাইটেল কার্ডে। কে কতক্ষণ ক্যামেরা চালিয়েছেন, জানি না। কোনো অভূতপূর্ব অনুভূতি তো দর্শক হিসেবে হলো না। সম্পাদকও সম্ভবত ওপারের। ঢাকার সম্পাদকেরা কাঁচি এরচেয়ে খারাপ চালান না। কালার নিয়ে কোনো নিরীক্ষা চোখে পড়ল না। ভিএফএক্স পুরো ছবিতে যেমন-তেমন, টাইটেল গানে যাচ্ছেতাই অবস্থা। আবহসংগীত বেশ চড়া। এককথায় বলব, টেকনিক্যাল টিম দর্শকের চোখের সামনে নব্বই দশকের ঢাকাকে জীবন্ত করে তুলতে পারেনি। স্পষ্টতই বোঝা গেছে, এই ছবির পটভূমি কলকাতা! ঢাকার গল্পে তৈরি ছবির পর্দায় ঢাকার আইকনিক কোনো স্থাপনা নেই, এটা কীভাবে মানা যায়?

ছবির গানগুলো গতানুগতিক। শুনতে ভাল, দেখতে ভাল। সিনেমা হল থেকে বেরিয়ে মনে থাকে না। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, গানগুলো গল্পকে কতটা গতি দিল? সেখানে যথেষ্ট মার্কস দেওয়া গেল না। ছবির একটি গানের লোকেশন ভারত, সেখানে কোনো রাখ-ঢাক ছিল না।

পরিচালক আবু হায়াত মাহমুদ সামর্থ্যের চেয়ে বাড়তি বোঝা কাঁধে নিয়েছেন। প্রথম ছবি হিসেবে তার ক্যানভাস বেশ বড়। তিনি অবাধে সুতো ছেড়েছেন, কিন্তু গুটিয়ে আনার সময় ঘুড়িকে গোত্তা খাইয়েছেন। ‘প্রিন্স’ ছবিতে তার নিজস্বতা প্রশ্নবিদ্ধ, বক্তব্য অপরিষ্কার, ভিশন ছায়াচ্ছন্ন। আগামী ছবিতে স্বতন্ত্র ও স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে তিনি উজ্জ্বল হয়ে উঠবেন, আশা করছি।আরএমডি