দেশের পণ্য রপ্তানি টানা অষ্টম মাসের মতো নিম্নমুখী ধারায় রয়েছে। মার্চে রপ্তানি আয় ১৮ দশমিক ০৭ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের একই মাসে ছিল ৪ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে, চলতি অর্থবছর ২০২৫-২৬ এর জুলাই থেকে মার্চ সময়ে মোট রপ্তানি আয় ৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ কমে ৩৫ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যেখানে গত অর্থবছরের একই সময়ে এই আয় ছিল ৩৭ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার। এ নিয়ে টানা আট মাস রপ্তানি আয় নিম্নমুখী।
এদিকে দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্পেও নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এই খাতে রপ্তানি আয় ৫ দশমিক ৫১ শতাংশ কমে ২৮ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা গত বছর একই সময়ে ছিল ৩০ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার।
প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক, যা জাতীয় রপ্তানি আয়ে ৮৪ শতাংশ অবদান রাখে, এর শিপমেন্ট কমে যাওয়াই এই পতনের মূল কারণ বলে মন্তব্য করেছেন রপ্তানিকারক ও বিশেষজ্ঞরা।
বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) প্রকাশিত রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যে দেখা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে মোট রপ্তানি আয় ৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৩৫ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৩৭ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার।
কেন এ ধারাবাহিক পতন?রপ্তানিকারকেরা জানান, দুর্বল বৈশ্বিক চাহিদা, ক্রেতাদের কম অর্ডার, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বিশেষ করে ইউরোপীয় বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে কয়েক মাস ধরেই রপ্তানি কমছে। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তারা বলেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক অর্থনীতি আবারও নেতিবাচক চাপে পড়তে পারে।
শুধু মার্চ মাসেই দেশের সর্বোচ্চ রপ্তানি আয়কারী খাত তৈরি পোশাক থেকে আয় হয়েছে ২ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই মাসের ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ১৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ কম। আরএমজি খাতের দুই উপখাত ওভেন ও নিটওয়্যার—উভয় ক্ষেত্রেই এ সময়ে রপ্তানি কমেছে।
আরও পড়ুনমার্চ মাসেও অব্যাহত রপ্তানি আয়ে পতন, কমেছে ১৮ শতাংশযে সব কারণে রপ্তানি আয়ে ধারাবাহিক পতনরপ্তানি আয়ের ক্রমাগত পতন থামছে না কেন?
বিকেএমইএ’র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জাগো নিউজকে বলেন, গত কয়েক মাস ধরেই আমাদের রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক ধারা চলছে। অতীতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়নি। এই নেতিবাচক পরিস্থিতির শুরু হয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসনের পাল্টা শুল্ক আরোপের ধাক্কায়। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ক্রেতাদের আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তারা ক্রয়াদেশ কমিয়ে দিয়েছিল।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে এবং সরবরাহসংকট তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে বাংলাদেশেও ডিজেলের সংকট দেখা দিয়েছে, ফলে কারখানায় উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এটিও আমাদের রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।- মোহাম্মদ হাতেম, বিকেএমইএ সভাপতি
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যস্ফীতি কমার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। কিন্তু এর মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে। সব মিলিয়ে আমাদের ক্রয়াদেশ পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না।
‘পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে এবং সরবরাহসংকট তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে বাংলাদেশেও ডিজেলের সংকট দেখা দিয়েছে, ফলে কারখানায় উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এটিও আমাদের রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।’
মোহাম্মদ হাতেম আরও বলেন, সরকারের প্রতি আমাদের অনুরোধ, শিল্পে জ্বালানি তেল সরবরাহে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি ব্যবসার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে খুব দ্রুত নীতিগত সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা করা দরকার।
টানা রপ্তানি আয়ের নেতিবাচক প্রবণতা বৈশ্বিক ও দেশীয় রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির সম্মিলিত ‘ডমিনো ইফেক্ট’-এর ফল—এমন মন্তব্য করেছেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন।
তিনি বলেন, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির কারণে রপ্তানি গন্তব্য দেশগুলোতে ভোক্তা চাহিদা কমে যাওয়ায় পোশাক পণ্যের ক্রেতারা অর্ডার কমিয়ে দিচ্ছেন, যা সরাসরি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
যা বলছে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোরপ্তানির সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে ইপিবি জানায়, চলতি অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় দেশের অধিকাংশ প্রধান রপ্তানি খাতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। তবে হিমায়িত ও জীবিত মাছ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য এবং প্রকৌশল পণ্য খাত ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, যা সামগ্রিক রপ্তানি খাতে কিছুটা ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করেছে।
তিনি বলেন, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির কারণে রপ্তানি গন্তব্য দেশগুলোতে ভোক্তা চাহিদা কমে যাওয়ায় পোশাক পণ্যের ক্রেতারা অর্ডার কমিয়ে দিচ্ছেন, যা সরাসরি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।- ড. জাহিদ হোসেন, বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ
ইপিবি আরও উল্লেখ করেছে, সামগ্রিক রপ্তানি পরিস্থিতি বিভিন্ন বৈশ্বিক বাহ্যিক প্রভাবের কারণে চাপে রয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংশ্লিষ্ট ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি বাড়িয়ে দিয়েছে, যার ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মতো প্রধান রপ্তানি গন্তব্যগুলোতে ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে।
এই পরিস্থিতির ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে রপ্তানি আদেশ স্থগিত বা বাতিল করা হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে জানায় সংস্থাটি।
রপ্তানি আয়ের চিত্রচলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে আরএমজি খাতের রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ২৮ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের ৩০ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ৫ দশমিক ৫১ শতাংশ কম। এ সময়ে নিটওয়্যার রপ্তানি ৬ দশমিক ৪২ শতাংশ কমে ১৫ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলারে এবং ওভেন পোশাক রপ্তানি ৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ কমে ১৩ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে।
অন্যান্য খাতের মধ্যে কৃষিপণ্য রপ্তানি ৯ দশমিক ২১ শতাংশ কমে ৭৩৩ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছর একই সময়ে ছিল ৮০৭ মিলিয়ন ডলার। তবে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য খাতে ৩ দশমিক ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে; এ খাতের রপ্তানি বেড়ে ৮৭৯ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগে ছিল ৮৫২ মিলিয়ন ডলার।
কয়েক মাস ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার পর হোম টেক্সটাইল খাতেও সামান্য পতন হয়েছে; এ খাতের রপ্তানি ০ দশমিক ৭৩ শতাংশ কমে ৬৭৩ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে। পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানিও ১ দশমিক ৩০ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৬১৮ মিলিয়ন ডলারে।
অন্যদিকে প্রকৌশল পণ্য খাতে ১৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে; এ খাতের রপ্তানি বেড়ে ৪৭২ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪০২ মিলিয়ন ডলার।
ইএ