স্বাস্থ্য

হামে আক্রান্ত-মৃত্যুতে বড় ফারাক, আতঙ্কে অভিভাবক

অতিমাত্রায় সংক্রামক রোগ মিজেলস (হাম) নিয়ে দেশে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। আক্রান্ত ও মৃত্যুর আশঙ্কায় শিশুদের অভিভাবকদের মধ্যে অজানা আতঙ্ক বিরাজ করছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে শিশু রোগী ও তাদের অভিভাবকদের ভিড় বাড়ছে।

জ্বর, ঠান্ডা, কাশি, ডায়রিয়া ও শরীরে র‌্যাশসহ বিভিন্ন উপসর্গ নিয়ে শিশুরা হাসপাতালে আসছে। তবে এসব উপসর্গ সবসময় হাম নির্দেশ করে না—এমনটাই বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ৩ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে প্রায় ৬ হাজার শিশুকে সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত হিসেবে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদের মধ্যে ৯৪ জনের মৃত্যুর তথ্যও রয়েছে।

তবে একই সময়ে মোট ৫ হাজার ৭৯২ জন সন্দেহভাজন রোগীর মধ্যে মাত্র ৭৭১ জনের ক্ষেত্রে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় হাম নিশ্চিত হয়েছে। অর্থাৎ, প্রকৃত আক্রান্তের তুলনায় সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে সাত গুণ বেশি।

মৃত্যুর ক্ষেত্রেও একই চিত্র। সন্দেহজনকভাবে ৯৪ জনের মৃত্যুর তথ্য থাকলেও, নিশ্চিতভাবে হামে মৃত্যু হয়েছে মাত্র ৯ জনের—যা প্রায় ১০ গুণ কম।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দেশের অধিকাংশ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে হাম শনাক্তের জন্য প্রয়োজনীয় ল্যাবরেটরি সুবিধা নেই।

হাম নিশ্চিত করতে সাধারণত—রক্তের নমুনায় আইজিএম (IgM) অ্যান্টিবডি পরীক্ষা, আরটি-পিসিআর (RT-PCR), গলা ও নাকের সোয়াব কিম্বামূত্র বা ওরাল ফ্লুইড (লালা) পরীক্ষা করা হয়।রোগ শুরুর ৩ থেকে ৫ দিন পর আইজিএম পজিটিভ হলে হাম নিশ্চিত ধরা হয়।

কিন্তু এসব সুবিধার অভাবে চিকিৎসকরা উপসর্গের ভিত্তিতে রোগীকে ‘সন্দেহজনক হাম’ হিসেবে ভর্তি ও নিবন্ধন করছেন। ফলে মৃত্যুর ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রেও ল্যাব নিশ্চিততা ছাড়াই ‘হামে মৃত্যু’ হিসেবে রেকর্ড করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ‌‘উপসর্গ থাকলেই হাম হয়েছে তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।’

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগে আক্রান্ত ও হাসপাতালে ভর্তির হার সবচেয়ে বেশি। মোট সন্দেহভাজন শনাক্ত: ২ হাজার ৩৯৪ জন। হাসপাতালে ভর্তি: ১ হাজার ৬৭৬ জন (প্রায় ৭০ শতাংশ)। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন: ১ হাজার ১৯২ জন।সারা দেশের মোট ৩ হাজার ৭৭৬ জন ভর্তি রোগীর মধ্যে প্রায় ৪৪ শতাংশই ঢাকা বিভাগের।

১৫ মার্চ থেকে ৩ এপ্রিল পর্যন্ত সন্দেহভাজন রোগী: ঢাকা বিভাগে ২ হাজার ৩৯৪, রাজশাহীতে ১ হাজার ২৪৩, চট্টগ্রামে ৭১৭, খুলনায় ৫৮২, বরিশালে ৩৫৯, সিলেটে ২৫৬, ময়মনসিংহে ১২২ এবং রংপুরে ১১৯ জন। অন্যদিকে নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আক্রান্ত বেশি না হলেও চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এলাকায় মৃত্যুহার তুলনামূলক বেশি। এর সম্ভাব্য কারণগুলো হলো—দুর্গম এলাকায় টিকাদান কার্যক্রমের সীমাবদ্ধতা, শরণার্থী ক্যাম্পে ঘনবসতি, চিকিৎসা নিতে বিলম্ব, অপুষ্টি ও দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এবং সচেতনতার অভাব।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় আগামীকাল রোববার থেকে দেশব্যাপী হাম প্রতিরোধে টিকাদান কর্মসূচি শুরু করছে। শনিবার (৪ এপ্রিল) আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী কর্মসূচির বিস্তারিত তুলে ধরেন।

সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত আক্রান্তের মধ্যে বড় ধরনের ফারাক জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাযথ ল্যাব সুবিধা নিশ্চিত করা না গেলে এই ধরনের আতঙ্ক আরও বাড়তে পারে।

একই সঙ্গে তারা জোর দিচ্ছেন—সঠিক তথ্য প্রচার, দ্রুত পরীক্ষা ও টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করার ওপর।

এমআরএম/এএসএম