বিশ্বকাপের ইতিহাসে অনেক স্মরণীয় গোল রয়েছে। তবে ১৯৮৬ মেক্সিকো বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ডিফেন্ডার জোসিমারের সেই বিস্ময়কর গোলটি আজও ফুটবল ভক্তদের চোখে ভাসে। এখনও পুরনো দিনের ফুটবল ভক্তরা আলোচনার টেবিলে বসলে জোসিমারের সেই চোখ ধাঁধানো গোলটির কথা বিশেষভাবে আলোচনায় উঠে আসে। উত্তর আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে তার দূরপাল্লার সেই শট যেন মুহূর্তেই তাকে অজানা এক খেলোয়াড় থেকে বিশ্বমঞ্চের নায়ক বানিয়ে দিয়েছিল।
ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল মেক্সিকোর গুয়াদালাহারার এস্তাদিও হালিস্কো স্টেডিয়ামে। গ্রুপ ‘ডি’র এ লড়াইয়ে ব্রাজিলের শক্তিশালী দল মাঠে নামলেও জোসিমারের শুরুতে দলে থাকার কথাই ছিল না।
মূলত রাইট-ব্যাক পজিশনে প্রথম পছন্দ ছিলেন লিয়ান্দ্রো, আর তার বিকল্প হিসেবে ছিলেন এডসন। জোসিমার তখন দলে ডাকই পাননি, এমনকি টুর্নামেন্টের আগে কয়েক মাস তিনি নিজের ক্লাব বোটাফোগোর হয়েও নিয়মিত খেলছিলেন না।
কিন্তু বিশ্বকাপের আগে ব্রাজিল শিবিরে ঘটে অপ্রত্যাশিত ঘটনা। কোচ তেলে সান্তানার কঠোর নিয়ম ভেঙে লিয়ান্দ্রো ও রেনাতো গাউচো এক রাতে ক্লাব ছেড়ে বাইরে গিয়ে পার্টি করেন। এর জেরে রেনাতো গাউচো দল থেকে বাদ পড়েন। যদিও লিয়ান্দ্রো দলে ছিলেন; কিন্তু বন্ধুর প্রতি সমর্থন জানিয়ে তিনিও বিশ্বকাপে যেতে অস্বীকৃতি জানান। এতে রাইট-ব্যাক পজিশনে হঠাৎ শূন্যতা তৈরি হয়।
প্রথমদিকে পাওলো রবার্তোকে সেই জায়গায় নেওয়ার সম্ভাবনা ছিল, বিকল্প হিসেবে লুইজ কার্লোস উইঙ্ক ও জে তেওদোরোর নামও আলোচনায় আসে; কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে কোচ তেলে সান্তানা শেষ পর্যন্ত জোসিমারকে দলে ডাকেন। এতটাই অপ্রত্যাশিত ছিল এই সিদ্ধান্ত যে, ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশনের (সিবিএফ) এক কর্মকর্তা প্রথমে ভুল করে অন্য একজনের নাম ঘোষণা করে বসেন।
বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে দ্বিতীয় ম্যাচে আলজেরিয়ার বিপক্ষে এডসন চোট পেলে জোসিমারের সামনে একাদশে থাকার সুযোগ তৈরি হয়। তৃতীয় ম্যাচে উত্তর আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে তাকে প্রথম একাদশে রাখা হয়। আর সেই সুযোগটাকেই তিনি অবিশ্বাস্যভাবে কাজে লাগান। যেটা তাকে স্মরণী-বরণীয় ফুটবলারে পরিণত করেছে।
ম্যাচের ৪২তম মিনিটে, যখন মাঠে তার সঙ্গে খেলছিলেন জুনিয়র, সক্রেটিস ও কারেকার মতো তারকা ফুটবলাররা, তখন হঠাৎই দূরপাল্লা থেকে শট নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন জোসিমার। কোনো দ্বিধা ছাড়াই নেওয়া সেই শক্তিশালী শট সোজা গিয়ে জালের উপর কোণে ঢুকে পড়ে। গোলরক্ষক প্যাট জেনিংসের কিছুই করার ছিল না। দর্শকরা মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায়, তারপরই শুরু হয় উচ্ছ্বাস।
এই গোলটি শুধু ম্যাচের মোড়ই ঘুরিয়ে দেয়নি, বরং জোসিমারকে বিশ্বমঞ্চে নতুন পরিচিতি এনে দেয়। এক সময় যিনি দলে থাকারই কথা ছিল না, তিনিই হয়ে ওঠেন দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। ১৯৮৬ সালের সেই বিশ্বকাপে ব্রাজিলের ১৩ নম্বর জার্সিধারী এই ডিফেন্ডারের গল্প ফুটবলের সৌন্দর্যেরই প্রতীক- যেখানে এক সুযোগই বদলে দিতে পারে পুরো জীবন।
জোসিমারের সেই গোল আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা দূরপাল্লার গোল হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি শুধু একটি গোল নয়, বরং এক অপ্রত্যাশিত নায়কের জন্মের গল্প, যা ফুটবলপ্রেমীদের মনে চিরকাল বেঁচে থাকবে।
ব্রাজিল সেবার কোয়ার্টার ফাইনালে ১-১ গোলে ড্র থাকার পর টাইব্রেকারে ফ্রান্সের কাছে ৩-৪ ব্যবধানে হেরে বিদায় নেয়। আর শেষ পর্যন্ত পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে বিশ্বকাপ জয় করে দিয়েগো ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা।
গোলটির ভিডিও দেখুন এই লিংকে...।
আইএইচএস/