কমিটির অন্যতম সদস্য এটিএম সাইদউজ্জামান সপ্তাহ দুয়েক আগেই জানিয়েছিলেন, ‘আমরা (তদন্ত কমিটি) নির্ধারিত সময়ের (১৫ কর্মদিবসের) আগেই তদন্ত প্রতিবেদন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে জমা দেব।’ তিনি আরও জানিয়েছিলেন, আগামী ৯ এপ্রিল শেষ হবে ১৫ কর্মদিবস।
শেষ পর্যন্ত তদন্ত কমিটি তাদের কথা রেখেছে। গতকাল ৪ এপ্রিল রাতেই শোনা যায় যে, ৫ এপ্রিল সকালেই জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে তদন্ত রিপোর্ট জমা দেবে বিসিবি নির্বাচনে অনিয়ম খতিয়ে দেখতে গঠিত তদন্ত কমিটি।
জাগো নিউজের পাঠকরা আজ সকালেই জেনেছিলেন এ খবর এবং যথারীতি তদন্ত কমিটি আজ রোববার সকাল গড়িয়ে দুপুর নামার আগেই তাদের রিপোর্ট জমা দিয়েছে। পাশাপাশি তাদের সুপারিশমালাও প্রদান করেছে।
বেলা ১২টার নাগাদ সাবেক বিচারপতি একে এম আসাদুজ্জামানের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি স্বশরীরে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ভবনে এসে নিজেদের তদন্ত প্রতিবেদন ও সুপারিশমালা প্রদান করেছে।
প্রসঙ্গতঃ গত বছর (২০২৫) অক্টোবরে হওয়া বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক পর্ষদ নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে বারবার অভিযোগ উঠেছে। ঢাকার ৫০টি ক্লাব ও জেলা-বিভাগের কাউন্সিলরশিপ মনোনয়নে বৈষম্যের শিকার হওয়ার পাশাপাশি মনোনয়নবঞ্চিতরা আলাদাভাবে তিন ক্যাটাগরি থেকেই নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ, অনিয়মে ভরা এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টার তথা সরকারের অবৈধ হস্তক্ষেপে ভরা নির্বাচন বলে দাবি করে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া ও কার্যক্রম নিয়ে একটি সুষ্ঠু তদন্তের আবেদন করেছিল।
তারই প্রেক্ষিতে নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়েছিল কি না, তা যাচাই এবং অনিয়মের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করতেই ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোর অভিভাবক সংগঠন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ।
কমিটির প্রধান সাবেক বিচারপতি একেএম আসাদুজ্জামান তদন্ত প্রতিবেদন ও সুপারিশমালা প্রদান করে উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে জানান, তদন্ত কমিটি কোনো ব্যক্তিকে ব্যক্তিগতভাবে অভিযুক্ত করতে এই তদন্ত করেনি। তিনি যোগ করেন, ‘আমরা নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন সংক্রান্ত যা পেয়েছি, সে সম্বন্ধে রিপোর্ট দিয়ে গেছি। সংক্ষিপ্তভাবে কাউকে অভিযুক্ত না করে নিরপেক্ষভাবে নির্বাচনের সময় যা পেয়েছি, সে সম্বন্ধে প্রতিবেদন দিয়েছি।’
বিচারপতি আসাদুজ্জামান আরও পরিষ্কার করেন যে, এটি কোনো ‘জুডিশিয়াল ইনকোয়ারি বা ফৌজদারি বিচার’ ছিল না। তাদের কাজ ছিল নির্বাচনী প্রক্রিয়া বা সিস্টেমটা আইন অনুযায়ী হয়েছে কি না- তারা (তদন্ত কমিটি) সেটুকুই দেখার চেষ্টা করেছেন।
পাশাপাশি তদন্তে বিসিবির ভবিষ্যৎ নির্বাচনগুলো সবরকম প্রভাবমুক্ত ও সুন্দর করার জন্য বেশ কিছু গাইডলাইন বা পরামর্শ সুপারিশ আকারে দিয়েছে কমিটি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সুপারিশের মধ্যে বিসিবির বর্তমান গঠণতন্ত্র পরিবর্তনের বিষয়টিও রয়েছে বলে তদন্ত কমিটি প্রধান উল্লেখ করেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সাবেক বিচারপতি আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আমরা সুপারিশ করেছি। এই সুপারিশের মধ্যে গঠণতন্ত্র সংশোধনের বিষয়টি আছে।’
এদিকে তদন্ত কমিটি প্রধান তদন্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা দিলেও সাধারণ ক্রিকেট অনুরাগীদের মনে নানা প্রশ্ন, রাজ্যের কৌতূহল।
অনেকেরই কৌতূহলী জিজ্ঞাসা- আসলে কী আছে এই তদন্ত রিপোর্টে? কমিটি কি সত্যিই কাউকে অভিযুক্ত করেনি? কারো বিপক্ষে সরাসরি অভিযোগ আনেনি? নাকি নিছক ভদ্রতার খাতিরে ও সৌজন্যের কারণে তা প্রকাশ করা হয়নি?
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ আহমেদ সজীব ভূঁইয়া যে তদন্ত কমিটির মুখোমুখি হননি, তা নিয়ে কমিটি কি ক্ষুব্ধ? তাদের রিপোর্টে কি সে বিষয়টি আলাদাভাবে উল্লেখ আছে?
একইভাবে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলও যে সরাসরি উপস্থিত না হয়ে লিখিত জবাব দিয়েছেন, সেটি নিয়েও তদন্ত কমিটির প্রতিক্রিয়া কী- তা জানতেও কৌতূহলের শেষ নেই ক্রিকেট অনুরাগীদের।
এসব নিয়ে তদন্ত কমিটি সরাসরি কোনো মন্তব্য না করলেও জানা গেছে, অন্তর্বর্তীকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার তদন্ত কাজে অংশ না নেওয়াকে মোটেই ভালোভাবে নেয়নি কমিটি।
কমিটির অনুভব, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া তদন্ত কমিটির সামনে এলে অনেক বিষয় পরিষ্কার হতো। পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে যে অভিযোগগুলো উঠেছে, তারও প্রকৃত জবাব মিলত।
সবাই এরই মধ্যে জেনে গেছেন, বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলও সরাসরি উপস্থিত না থেকে লিখিত জবাব দিয়েছেন। সেটা কিভাবে? খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আমিনুল ইসলাম বুলবুলকে মোবাইল ও হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তিনি লিখিতভাবে জবাব দিয়েছেন।
এর বাইরে বিসিবি নির্বাচনে যে তিনটি ক্যাটাগরি আছে, তার প্রতিটি ক্যাটাগরির লোকজনের সঙ্গেই কথা বলেছে তদন্ত কমিটি। তাদের আনা অভিযোগগুলো খুঁটিয়ে দেখা হয়েছে। ওই তিন ক্যাটাগরির কাউন্সিলরদের মধ্যে যারা আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করেছেন, তাদের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, তামিম ইকবালের সঙ্গে কথা বলেনি তদন্ত কমিটি। এমনকি তার কাছে কিছু জানতেও চাওয়া হয়নি। তবে বিসিবির সিনিয়র সহসভাপতি ফারুক আহমেদের সঙ্গে ঠিকই কথা বলেছে। ফারুক একা নন, বর্তমান বোর্ডে থাকা আরও কয়েকজনের সঙ্গেও কথা বলেছে তদন্ত কমিটি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে একটি বিষয় নিশ্চিত হওয়া গেছে, যে যে বিষয়ে অভিযোগ ছিল, তার সবগুলোই খণ্ডন করা হয়েছে এবং সম্ভাব্য সবার মতামতই নেওয়া হয়েছে।
তবে কারো ব্যাপারেই সরাসরি কোনো অভিযোগ আনা হয়নি। যাদের বিপক্ষে অভিযোগ করা হয়েছে, তাদের সঙ্গে কথা বলে সেই অভিযোগের সত্য-মিথ্যা যাচাই করা হয়েছে শুধু। আর সেটাই তদন্ত রিপোর্টে উঠে এসেছে।
মোটকথা, কারো বিপক্ষেই প্রতিবেদনে কোনো অভিযোগ পেশ করা হয়নি। এমন কথা বলা হয়নি যে, ‘অমুক দোষী’, কিংবা ‘অমুকের জন্যই ক্যাটাগরি ১, ২ বা ৩-এ নির্বাচনে অনিয়ম হয়েছে’- এমন কিছু নেই প্রতিবেদনে।
শুধু যাদের বিপক্ষে অভিযোগ আনা হয়েছে, সেই অভিযোগের প্রেক্ষিতে সত্য-মিথ্যা যাচাই করতেই নানা প্রশ্ন করা হয়েছে। আর ওই সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের ভেতরেই লুকিয়ে আছে অনেক বড় সত্য।
সেটাই জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ বের করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
এআরবি/আইএইচএস