নামেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিন্তু চালচলনে এটি যেন পুরোদস্তুর একটি বাণিজ্যিক কোচিং সেন্টার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে শ্রেণি কার্যক্রমের সময় শ্রেণিকক্ষেই টাকার বিনিময়ে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগতভাবে (প্রাইভেট) পড়ান আটজন শিক্ষকের মধ্যে ছয়জনই। এমনকি মধ্যাহ্ন বিরতি ও ক্লাসের ফাঁকেও চলে এই বাণিজ্যিক পাঠদান। শুধু তাই নয়, এই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নিয়মিত আদায় করা মাসিক বেতন। সেই টাকা ভাগাভাগি করে নেন প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকরা।
এমনই অভিযোগ উঠেছে ফরিদপুরের সালথা উপজেলার ১২ নং সিংহপ্রতাপ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ৬০০ শিক্ষার্থীর এই বিদ্যালয়ে শিশু শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী, প্রাথমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ অবৈতনিক হলেও এখানে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মাসিক বেতন নেওয়া হয়। এই টাকা প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকরা মিলে খরচ করেন এবং সামান্য কিছু টাকা দিয়ে দুজন ‘প্যারা শিক্ষক’ রাখা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, দুই শিক্ষক দম্পতি সাহেবুল ইসলাম-তাইফুন্নাহার এবং কাজী খালিদ হোসেন-গুলশানারা আক্তার প্রতিদিন সকালে ও ক্লাসের ফাঁকে শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়তে বাধ্য করেন। পরীক্ষায় ফেল করানো বা ক্লাস থেকে বের করে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রতি মাসে ২০০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। সিনিয়রদের দেখে অন্য শিক্ষকরাও এখন প্রাইভেট বাণিজ্যে ঝুঁকছেন।
শিক্ষার্থীদের অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা বলেন, পরীক্ষায় ফেল করানো ও ক্লাস থেকে বের করাসহ নানা হুমকি দিয়ে শিক্ষার্থীদের অনেকটা জোর করে প্রাইভেট পড়তে বাধ্য করা হয়। আটজন শিক্ষকের মধ্যে দুজন রয়েছে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির নেতা। তারা অনেক সময় প্রাইভেট শেষ করে হাজিরা দিয়ে চলে আসেন উপজেলা সদরে, সেখানে চলে নানা খোশ গল্প। শিক্ষক নেতা হওয়ার কারণে তাদের দুজনের ক্লাস নেন দুজন প্যারা শিক্ষক আর তাদের হয়ে প্রাইভেট পড়ান তাদের স্ত্রীরা। বিদ্যালয়ে প্রাইভেট পড়ানোর কারণে প্রতি মাসেই অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল গুনতে হচ্ছে সরকারকে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়টি দ্বিতীয় শ্রেণির কয়েকজন শিক্ষার্থী জানায়, আমাদের কাছ থেকে প্রতি মাসে প্রাইভেট বাবদ ২০০ টাকা করে নেওয়া হয়। আর বেতনের জন্য সামান্য কিছু টাকা নেওয়া হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অভিভাবক জানান, দেশে এমন প্রাথমিক বিদ্যালয় নাই যেখানে মাসিক বেতন দিয়ে বাচ্চাদের পড়তে হয়। কিন্তু পরিমাণে সামান্য হলেও বেতন নেওয়া হয়। আবার জোর করে বাচ্চাদের প্রাইভেট পড়নো হয়। দুই শিক্ষক দম্পতি ও তাদের বাচ্চারা মিলে একদম যাচ্ছেতাই অবস্থা। প্রধান শিক্ষক অনেক কিছু দেখেও দেখেন না। আমরাও কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পাই না, কারণ খালিদ স্যার স্থানীয় এবং সাহেবুল স্যার রাজনৈতিক প্রভাব খাটান। চিন্তা করছি বাচ্চাদের অন্য স্কুলে পড়াবো।
এ বিষয়ে সিংহপ্রতাপ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কাজী খালিদ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, সকল অভিযোগ সঠিক নয়। প্রায় সব শিক্ষকই প্রাইভেট পড়ায়, তবে কেউ স্কুলে চলাকালীন সময়ে পড়ান না। আর আমাদের স্কুলে একজন অতিরিক্ত শিক্ষক আছে, কমিটির মাধ্যমে বাচ্চাদের কাছ থেকে সামান্য কিছু টাকা নিয়ে তাকে বেতন দেওয়া হয়। আরেকজন আছেন, তাকে কোনো বেতন দেওয়া হয় না। প্রাইভেট পড়ানোর সময় তাকে বলা হলে আজকের মতো পড়াচ্ছেন বলে তিনি জানান।
তবে অভিযোগগুলো মিথ্যা ও ভিত্তিহীন দাবি করে বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক নাজমা আক্তার জাগো নিউজকে বলেন, শিক্ষক সংকটের কারণে অতিরিক্ত শিক্ষকের বেতনের জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তাদের ইচ্ছে অনুযায়ী সামান্য কিছু টাকা নেওয়া হয়। কাউকে জোর করা হয় না।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মাসিক বেতন নেওয়া, স্কুল চলাকালীন সময়ে প্রাইভেট পড়ানোর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি ব্যাস্ততা দেখিয়ে মোবাইলের সংযোগ কেটে দেন এবং পরবর্তীতে তিনি আর মোবাইল রিসিভ করেননি।
বিষয়টি নিয়ে সালথা উপজেলা শিক্ষা অফিসার মো. তাশেম উদ্দিন জানান, শ্রেণিকক্ষে প্রাইভেট পড়ানোর কোনো নিয়ম নাই এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাসিক বেতন নেওয়ার কোনো বৈধতা নাই। বিষয়টি তদন্ত করে সত্যতা পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. মহিউদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, শ্রেণিকক্ষে প্রাইভেট পড়ানোর নিয়ম নেই, আবার শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ারও কোনো নিয়ম নেই। বিষয়টি জানতে পেরে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে তদন্ত করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সত্যতা মিললে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা(ইউএনও) দবির উদ্দিন জানান, এই বিষয়ে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়েছে। ঘটনার সত্যতা পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এন কে বি নয়ন/কেএইচকে/এমএস