ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যাংকিং কাঠামোর আওতায় আনার প্রস্তাবিত ‘ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক অধ্যাদেশ-২০২৫’ অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানিয়েছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তাদের মতে, ব্যাংকিং ব্যবস্থার আড়ালে ক্ষুদ্রঋণ খাতকে ধ্বংস করার সুস্পষ্ট নীলনকশা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে ‘ক্ষুদ্রঋণকে ব্যাংকিং কাঠামোয় রূপান্তরের ঝুঁকি’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তারা। সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে কোস্ট ফাউন্ডেশন, ইক্যুইটিবিডি এবং বিডিসিএসও-প্রসেস।
বক্তারা বলেন, দেশে বিদ্যমান ৬৭টি ব্যাংক পরিচালনায় যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকই নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে, সেখানে শত শত এনজিও ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানকে ব্যাংকিং কাঠামোর আওতায় আনলে তা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
তারা বলেন, ঝুঁকি তৈরি না করে বরং সঞ্চয়ের সুযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও আর্থিকভাবে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে অর্থ আত্মসাৎ প্রতিরোধে পাবলিক ডিমান্ড রিকভারি অ্যাক্টের আওতায় সার্টিফিকেট মামলা দায়েরের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানান তারা।
সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন কোস্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ও ইক্যুইটিবিডির প্রধান সমন্বয়ক রেজাউল করিম চৌধুরী। বক্তব্য দেন কোস্ট ফাউন্ডেশনের ক্ষুদ্রঋণ পরিচালক সৈয়দ আমিনুল হক, ইক্যুইটিবিডির সমন্বয়ক ওমর ফারুক ভূঁইয়া, বিডিসিএসও-প্রসেসের এম এ হাসানসহ অন্যরা। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিডিসিএসও-প্রসেসের মোস্তফা কামাল আকন্দ।
রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো বা ব্যাংকের ব্যালেন্স বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; প্রকৃত উন্নয়ন হলো মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠা।
তিনি বলেন, দেশে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩৫ শতাংশ হলেও ক্ষুদ্রঋণ খাতে তা অনেক কম। ক্ষুদ্রঋণ খাত লাখো মানুষের আত্মনির্ভরতা ও নারীর ক্ষমতায়ন জোরদার করেছে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করেছে।
সৈয়দ আমিনুল হক বলেন, দেশে এরই মধ্যে ৬৭টি ব্যাংক রয়েছে। সে ক্ষেত্রে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যাংকিং কাঠামোর আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে। ব্যাংকগুলো মূলত মুনাফা লক্ষ্য করে পরিচালিত হয় এবং অনেক সময় পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিক প্রভাব থাকে, যা ভবিষ্যতে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তিনি অভিযোগ করেন, দেশে প্রায় ৭০০ এনজিও কাজ করলেও তাদের সঙ্গে আলোচনা বা মতামত না নিয়েই কয়েকটি বড় এনজিও ও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের পরামর্শে এই অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়েছে।
মোস্তফা কামাল আকন্দ বলেন, ক্ষুদ্রঋণের মূল লক্ষ্য দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক উন্নয়ন। কিন্তু ব্যাংকিং কাঠামোয় গেলে এটি মুনাফা-নির্ভর হয়ে প্রান্তিক মানুষের সেবাকে সীমিত করে দিতে পারে।
ওমর ফারুক ভূঁইয়া বলেন, তিন দশক ধরে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত বৈদেশিক তহবিল ছাড়াই স্বনির্ভরভাবে পরিচালিত হচ্ছে। দেশের মোট জিডিপিতে এই খাতের অবদান প্রায় ১৭ শতাংশ এবং প্রতিদিন প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। এ খাতে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ কর্মরত রয়েছে।
বক্তারা সতর্ক করে বলেন, এত বড় একটি খাতকে গুটি কয়েক বড় এনজিও বা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া যাবে না। সংবাদ সম্মেলনে ক্ষুদ্রঋণ খাতের তদারকি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে না দিয়ে বরং মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ), পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) এবং এনজিও ব্যুরোর মতো বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানানো হয়।
ইএআর/এমএমএআর