অর্থনীতি

বাজারে সয়াবিন তেল উধাও, দাম বাড়াতে চাপ কোম্পানিগুলোর

দাম নিয়ে বৈঠক রোববার দাম বাড়বে না বলছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়

বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেল সরবরাহ একেবারেই বন্ধ করে দিয়েছে দেশের ভোজ্যতেল সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো। এর মধ্যে তারা সরকারের কাছে প্রতি লিটার তেলের দাম ১২ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে রেখেছে। এ দফায় দাম না বাড়ালে সরবরাহ আর স্বাভাবিক করা হবে না—খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতাদের এমন কথাও বলেছে ওইসব সরবরাহকারী কোম্পানির প্রতিনিধিরা।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জনগণকে জিম্মি করে তেলের দাম বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে কোম্পানিগুলো। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্র জাগো নিউজকে জানিয়েছে, রোববার এ নিয়ে মন্ত্রণালয় বসতে যাচ্ছে কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে। এর মধ্যেই মন্ত্রণালয় বিশ্ববাজারে তেলের দামের বিশ্লেষণ করেছে। তাতে উঠে এসেছে, বর্তমান দামই বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ; ফলে তেলের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন নেই।

বাজারের যে অবস্থা

সেগুনবাগিচা বাজার ও আশপাশে প্রায় আটটি বড় মুদি দোকান রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র একটি দোকানে শুধুমাত্র পাঁচ লিটার সয়াবিন তেলের কয়েকটি বোতল রয়েছে। কোথাও আধা লিটার, এক লিটার ও দুই লিটারের তেলের বোতল নেই।

ওই বাজারে কথা হয় সাহেদা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘পাঁচটি দোকান ঘুরলাম, তেল পাচ্ছি না। বাসায় তেল নেই, সেজন্য কিনতে এসেও পাচ্ছি না। বিপদে পড়ে গেছি।’

আরও পড়ুন নকল সস-ভোজ্যতেল বেশি দামে বিক্রি, ২ প্রতিষ্ঠানকে জরিমানাঅবৈধভাবে মজুত ২২ হাজার লিটার ভোজ্যতেল জব্দ, জরিমানা ৬০ হাজার

ওই বাজারে মাহিন জেনারেল স্টোরের ফারুক হোসেন বলেন, ‘কোম্পানি তেল দিচ্ছে না। গত ঈদের আগে থেকে তারা সংকট তৈরি করেছে, এখন সেটা চরমে গেছে। এখন অর্ডারই নিচ্ছে না।’

গত চার দিন ধরে তেল নেই আল্লাহর দান স্টোরের মোস্তাফিজুর রহমানের দোকানে। তিনি বলেন, ‘কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তারা বলেছে—দাম নিয়ে সরকারের সঙ্গে সমঝোতা হয়নি, তাই কারখানা থেকে তেল ছাড়ছে না; আমাদেরও দিচ্ছে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘কোম্পানির লোক আসে, পরিষ্কার বলে তেল নেই। অন্য পণ্যের অর্ডার নিয়ে চলে যায়। তেলের কোনো অর্ডার নিচ্ছে না।’

ব্যবসায়ীদের প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ২০৭ টাকা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে বাজারে এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের নির্ধারিত দাম ১৯৫ টাকা। এ ছাড়া পাঁচ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১,০২০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বর্তমানে ৯৫৫ টাকা।

খোলা তেলের দামও বেড়েছে

বাজারে বোতলজাত তেলের সংকটের কারণে খোলা তেলের দামও বেড়েছে। খোলা সয়াবিন তেলের দাম বেড়ে ১৯৫ থেকে ২১০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া খোলা পাম তেল বিক্রি হচ্ছে ১৭০ থেকে ১৯০ টাকায়, যা এক মাস আগের চেয়ে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেশি।

দাম বাড়ানোর প্রস্তাব

বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) থেকে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে রেখেছে মিলমালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। কয়েক দিন আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে তারা এ প্রস্তাব দেয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি) প্রস্তাবটি যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

আরও পড়ুন ভোজ্যতেলের বেচাকেনা দেখতে হঠাৎ বাজার পরিদর্শনে বাণিজ্যমন্ত্রী পাইকারিতে বেসামাল পাম অয়েল-সয়াবিন তেলের দাম 

তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে এরইমধ্যে বিটিটিসিসহ আরও দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। তারা দামকে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মত দিয়েছে। ফলে তেলের দাম বাড়বে না।

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আগামী রোববার এ বিষয়ে কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক হবে।

বাজার থেকে সয়াবিন তেল উধাও করে সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। দেশের কিছু পরিশোধনকারী কোম্পানির বিরুদ্ধে সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে ভোক্তা অধিদপ্তরের কার্যক্রম কমে গেছে।

প্রস্তাবিত নতুন দাম

ব্যবসায়ীদের প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ২০৭ টাকা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে বাজারে এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের নির্ধারিত দাম ১৯৫ টাকা। এ ছাড়া পাঁচ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১,০২০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বর্তমানে ৯৫৫ টাকা।

এ ছাড়া খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৭৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৮৫ টাকা করতে চায় কোম্পানিগুলো। পাম তেলের বর্তমান নির্ধারিত দাম ১৬৪ টাকা থেকে বেড়ে হবে প্রতি লিটার ১৭৭ টাকা।

ভোক্তাদের উদ্বেগ

নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্যের বাজারে ভোজ্যতেলের এই নতুন প্রস্তাব সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। রাজধানীর সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজারে আসা এক ক্রেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘কয়েক মাস পরপরই তেলের দাম বাড়ে, কিন্তু আমাদের বেতন তো বাড়ে না। পাঁচ লিটার তেলের দাম যদি এক হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়, তবে সেটা আর নিত্যপণ্য থাকবে না, বিলাসপণ্যে পরিণত হবে।’

অন্যদিকে, বাজারে খোলা সয়াবিন তেল নির্ধারিত দামের চেয়ে অন্তত ৩০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী সরবরাহ সংকট তৈরি করে সয়াবিন তেলের দাম বাড়িয়েছে বলে দাবি করে বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেছে ভোক্তাদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)।

সেখানে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবীর ভূঁইয়া বলেন, ‘অসাধু ব্যবসায়ীদের কারণে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘বাজার থেকে সয়াবিন তেল উধাও করে সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। দেশের কিছু পরিশোধনকারী কোম্পানির বিরুদ্ধে সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে ভোক্তা অধিদপ্তরের কার্যক্রম কমে গেছে।’

বক্তব্য দিচ্ছে না কোম্পানিগুলো

তেলের দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকট প্রসঙ্গে গণমাধ্যমকে কোনো বক্তব্য দিচ্ছে না কোম্পানিগুলো। তারা যেন এ বিষয়ে মুখে কুলুপ এঁটে বসেছে। একাধিক কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হলেও তারা বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

অবশেষে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বলেন, ‘যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি সংকট এবং বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার কারণে এখন তেল বিপণন করে আমরা লোকসানে রয়েছি। দাম সমন্বয় না করলে সম্ভব নয়। বারবার তেলের দাম সমন্বয়ের চেষ্টা করেছি, কিন্তু সরকার তা মানছে না।’

তিনি বলেন, ‘দাম সমন্বয় না হলে লোকসান দিয়ে ব্যবসা করা সম্ভব নয়।’

এনএইচ/এসএইচএস