পাইকারিতে বেসামাল পাম অয়েল-সয়াবিন তেলের দাম

ইকবাল হোসেন
ইকবাল হোসেন ইকবাল হোসেন , নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
প্রকাশিত: ১১:০৫ এএম, ০৬ এপ্রিল ২০২৬
ভোজ্যতেলের অস্বাভাবিক দাম বাড়ার পেছনে ডিও প্রথাকে দায়ী করেছেন ব্যবসায়ীরা/জাগো নিউজ গ্রাফিক্স

চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে হু হু করে বাড়ছে ভোজ্যতেলের দাম। পাম অয়েল ও সয়াবিন তেল দুটির দামই অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। মাসের ব্যবধানে পাম অয়েল মণপ্রতি ৫-৬শ টাকা ও সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে দুইশ থেকে আড়াইশ টাকা।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব ছাড়াও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ছে। পাশাপাশি ডিও হাত বদলের নামে অব্যবসায়ী পন্থায় লেনদেনের কারণে খাতুনগঞ্জের বাজারে দাম বাড়ছে ভোজ্যতেলের।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যেও গত বছরের তুলনায় এ বছর ভোজ্যতেল কম আমদানি হয়েছে। এনবিআরের তথ্য বলছে, চলতি (২০২৫-২৬) অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসে অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানি হয়েছে ৯ লাখ ৯৯ হাজার ৩৭ টন, অপরিশোধিত পাম অয়েল আমদানি হয়েছে ২০ লাখ ৪০ হাজার ৭৯২ টন।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হু হু করে পাইকারি বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে। অন্য ভোগ্যপণ্যের দাম তেমন বাড়েনি। এক মাসের ব্যবধানে প্রতি মণে ৮শ টাকার মতো বেড়েছে।-চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন

গত অর্থবছরের একই সময়ে অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানি হয়েছিল ১৩ লাখ ১৮ হাজার ৩৪৭ টন এবং অপরিশোধিত পাম অয়েল ১৯ লাখ ৬ হাজার ১৭৬ টন। পরিশোধিত পাম অয়েল আমদানি হয়েছিল ৬০৯ টন। একই সময়ে গত বছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে ১ লাখ ৮৫ হাজার ৩০২ টন ভোজ্যতেল কম আমদানি হয়।

রোববার (৫ এপ্রিল) খাতুনগঞ্জে ভোজ্যতেল ব্যবসায় জড়িত ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে সিটি গ্রুপ ও টিকে গ্রুপের বে-ফিশিং সয়াবিন তেল রয়েছে। এসব সয়াবিন তেল মণপ্রতি ৭ হাজার ৩২০ থেকে ৭ হাজার ৩৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একইভাবে বাজারে আবুল খায়ের গ্রুপের বাটারফ্লাই, টিকে গ্রুপের বে-ফিশিং এবং মেঘনা গ্রুপের পাম অয়েল বিক্রি হয়েছে মণপ্রতি ৬ হাজার ৫৩০-৬ হাজার ৫৪৫ টাকা। এক মাস আগেও প্রতি মণ পাম অয়েলের দাম ছিল ৫ হাজার ৯শ টাকার কম। সয়াবিন তেলের দামও মণপ্রতি আড়াইশ টাকার মতো কম ছিল।

আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান টিকে গ্রুপের ম্যানেজার জসিম উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে পাম অয়েল কিংবা সয়াবিন তেলের বুকিং রেট অনেক বাড়তি। বাজারে ভোজ্যতেলের সহজলভ্যতা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে জাহাজ ভাড়াও অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এর প্রভাব দেশের বাজারে পড়েছে, এতে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ছে।’

আরও পড়ুন

খোলা ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে, ৮০০ টাকা ছুঁয়েছে দেশি মুরগি
নিম্নআয়ের মানুষদের জন্য কেনা হচ্ছে ৩ কোটি লিটার ভোজ্যতেল

খাতুনগঞ্জের ভোজ্যতেল ও চিনি সরবরাহকারী ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘এক মাস আগে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর সয়াবিন ৭ হাজার ১শ টাকা এবং পাম অয়েল ছিল ৫ হাজার ৯শ টাকা।’

ভোজ্যতেলের অস্বাভাবিক দাম বাড়ার পেছনে ডিও প্রথাকে দায়ী করেন খাতুনগঞ্জের মেসার্স এমকে ট্রেডিংয়ের মালিক রফিকুল আলম। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাজারে অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে ভোজ্যতেলের দাম। রোববার পাম অয়েল বিক্রি হয়েছে মণপ্রতি ৬ হাজার ৫৩০-৬ হাজার ৩৪৫ টাকা, সয়াবিন তেল বিক্রি হয়েছে ৭ হাজার ৩২০ টাকা। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে খাতুনগঞ্জে প্রতিদিন ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে। খাতুনগঞ্জে ডিও ব্যবসার নামে জুয়া চলে। শুধু কাগজ বেচাকেনার মাধ্যমে তেলের দাম বাড়ানো হচ্ছে। এতে সাধারণ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।’

পর্যাপ্ত মজুত আছে, ভোজ্যতেলের দাম একটুও বাড়বে না: বাণিজ্যমন্ত্রী

আন্তর্জাতিক পণ্যবাজার নিয়ে বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত মাসভিত্তিক পিংক শিট পর্যালোচনায় দেখা যায়, মার্চ মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে পাম অয়েলের গড় দাম প্রতি মেট্রিক টন ১১শ ০৩ মার্কিন ডলার। একই তেল ফেব্রুয়ারিতে ১০৩৯ ডলার এবং জানুয়ারিতে ছিল গড়ে ১০০৫ ডলার। পিংক শিটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত গড় মূল্য ছিল প্রতি টন ১ হাজার ৪৯ ডলার। তবে আগের বছরের একই সময়ে গড় মূল্য ছিল ১ হাজার ৬৮ ডলার।

মার্চ মাসে সয়াবিন তেলের দাম বেড়ে দাঁড়ায় প্রতি মেট্রিক টন ১ হাজার ৪৮২ ডলার। আন্তর্জাতিক বাজারে ফেব্রুয়ারি মাসে সয়াবিন তেলের গড় দাম ছিল টনপ্রতি ১ হাজার ২৮২ ডলার। জানুয়ারি মাসে ছিল ১ হাজার ১৫৪ ডলার। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রথম তিন মাসে সয়াবিন তেলের গড় দাম ওঠে ১ হাজার ৩০৬ ডলার। কিন্তু গত বছরের একই সময়ে গড় মূল্য ছিল ১ হাজার ৪৩ ডলার।

পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বিশ্বব্যাংকের পিংক শিটের তথ্য অনুযায়ী গত বছরের তুলনায় এ বছর একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন তেলের দাম বাড়লেও পাম অয়েলের গড় দাম কমেছে। কিন্তু দেশের বাজারে উল্টো চিত্র। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) বাজারদর পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত বছরের তুলনায় বর্তমানে সয়াবিন তেল ও পাম অয়েল দুটোর দামই বেড়েছে।

বড় বড় ব্যবসায়ীর শক্ত সিন্ডিকেট রয়েছে বাজারে। খাতুনগঞ্জের বাজারেও কিছু কিছু পণ্যের দাম সিন্ডিকেটের হাতে নিয়ন্ত্রিত হয়। যুদ্ধের প্রভাবে আমদানি পণ্যের পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু খাতুনগঞ্জের বাজারে অস্বাভাবিকভাবে শুধু ভোজ্যতেলের দাম বাড়াটাও অস্বাভাবিক। প্রশাসনের উচিত বাজারে অস্বাভাবিক দাম বাড়ার বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করা।-ক্যাব চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন

টিসিবি বলছে, বর্তমানে বাজারে খোলা সয়াবিন তেল প্রতি লিটার বিক্রি হচ্ছে ১৮৫-১৯৬ টাকায়। গত বছর একই সময়ে খোলা সয়াবিন তেলের দাম ছিল প্রতি লিটার ১৬০-১৬৫ টাকা। একইভাবে বর্তমানে খোলা পাম অয়েল বিক্রি হচ্ছে প্রতি লিটার ১৬২-১৬৮ টাকা। গত বছর একই সময়ে খোলা পাম অয়েল বিক্রি হয়েছিল প্রতি লিটার ১৪৪-১৫০ টাকায়।

ভোজ্যতেলের অস্বাভাবিক দাম বাড়ার বিষয়ে চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হু হু করে পাইকারি বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে। অন্য ভোগ্যপণ্যের দাম তেমন বাড়েনি। এক মাসের ব্যবধানে প্রতি মণে ৮শ টাকার মতো বেড়েছে।’

অন্য ভোগ্যপণ্যের দাম তেমন না বাড়লেও ভোজ্যতেলের দাম কেন বাড়ছে- সে বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন এ ব্যবসায়ী।

ভোক্তাদের সংগঠন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন জাগো নিউজকে বলেন, ‘বড় বড় ব্যবসায়ীর শক্ত সিন্ডিকেট রয়েছে বাজারে। খাতুনগঞ্জের বাজারেও কিছু কিছু পণ্যের দাম সিন্ডিকেটের হাতে নিয়ন্ত্রিত হয়। যুদ্ধের প্রভাবে আমদানি পণ্যের পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু খাতুনগঞ্জের বাজারে অস্বাভাবিকভাবে শুধু ভোজ্যতেলের দাম বাড়াটাও অস্বাভাবিক। প্রশাসনের উচিত বাজারে অস্বাভাবিক দাম বাড়ার বিষয়টি হস্তক্ষেপ করা।

এমডিআইএইচ/এএসএ/এমএফএ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।