মতামত

গোজামিলের দেশ, গোজামিলের শাসন

গোজামিল—শব্দটা শুনলেই মনে হয়, কোথাও একটা হিসাব মিলছে না, কিন্তু মুখের জোরে সেটাকে মিলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যেন অঙ্কের খাতায় দুই আর দুই মিলে পাঁচ লিখে দিয়ে নিচে মোটা দাগ টেনে ঘোষণা—‘এইটাই চূড়ান্ত!’

এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে একটি পুরোনো গল্প। গ্রামের পাকা রাস্তার ধারে, বড় বটগাছের নিচে বসে ছিল এক বোকাসোকা মানুষ—আব্বাস।

সেখান দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল আবদুল কুদ্দুস নামে এক ফাজিল প্রকৃতির লোক। গ্রামের মানুষ তাকে একটু ভয়ও পায়, আবার মজাও পায়। কারণ কথার খেলায় মানুষকে কাবু করতে সে ওস্তাদ। সে আব্বাসের সামনে এসে, একটু তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘এই তোর নাম কি?’সরল মনে আব্বাস বলল, ‘আবু আব্বাস।’চালাক লোকটি চোখ কুঁচকে হেসে বলল, ‘আব্বাস? তোরে দিলাম গাবগাছ!’বলেই সে হেঁটে চলে গেল।আব্বাস কিছুই বুঝল না। ‘গাবগাছ’ দেওয়া মানে কী—কিছুই তার মাথায় ঢুকল না। অদূরে বসে ছিল গ্রামেরই আরেক চতুর লোক। সে অদূরে বসে ঘটনাটা লক্ষ করছিল। কাছে এসে আব্বাসকে বলল, ‘এই ব্যাটা, তোরে যে গাবগাছ দিয়া অপমান করল, তুই কিছু কইলি না?’আব্বাস চমকে উঠল। তার মাথায় যেন হঠাৎ করেই একটা বাতি জ্বলে উঠল—তাই তো! লোকটা তাকে অপমান করেছে!তারপর আর দেরি না করে আব্বাস উঠে দাঁড়াল। সে দৌড়াতে দৌড়াতে একটু দূরে গিয়ে সেই চালাক লোকটিকে ধরে ফেলল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ‘এই মিয়া, তোর নাম কি?’লোকটি একটু অবাক হলেও মুচকি হেসে বলল, ‘আবদুল কুদ্দুস।’

আব্বাস এবার বুক ফুলিয়ে বড় একটা প্রতিশোধের নেশায় বলে ফেলল, ‘তোরে দিলাম বারান্দা!’কুদ্দুস একবার তার দিকে তাকাল, তারপর ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বলল, ‘মিলল না তো!’এই এক কথায় আব্বাস যেন থমকে গেল। সত্যিই তো—মিলল না! কিন্তু সে এখন পিছু হটার মানুষ নয়। অপমানের জবাব সে নিজের মতো করে দিয়েছে—এটাই বড় কথা!

মিল ছাড়া যেমন অনেকে গোজামিল দেয়, মিল রেখেও কেউ কেউ গোজামিল দেয়। যেমন, এক শিক্ষিত টাউট একবার কিছু নিরক্ষর মানুষকে শুনিয়েছিল—‘চোখ যদি হয় আখি, পতঙ্গ কেন হবে না পাখি?’

দুনিয়াটাই আপাতত গোজামিলে চলছে। ট্রাম্প সাহেব কয়েকদিন আগে বলেছিলেন, তাকে নাকি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল এবং তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। এমন বক্তব্য শুনে পৃথিবীর বহু ঘোড়া হাসতে হাসতে পাগল হয়ে গেছে!

বাংলাদেশের রাজনীতি, আন্দোলন, প্রতিশ্রুতি, নেতাদের বক্তব্য তো পুরোই গোজামিলে ভরা। সম্প্রতি তেমনই এক গোজামিলের কথা শুনিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি সংসদে বলেছেন, ‘গোজামিল দিয়ে জনগণকে গণভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়ের এই বক্তব্য অনেকের কাছেই খটকা লেগেছে। গণভোটের আগে এর অসারতা নিয়ে তেমন কেউ মুখ খোলেনি। এমনকি বিএনপির নেতৃবৃন্দও তখন গণভোটের পক্ষে কথা বলেছেন। এখন সেই গণভোটকেই গোজামিলের ভোট বলা হচ্ছে। প্রশ্ন জাগে—তাহলে আসল কোনটি? গণভোট, না গোজামিল?

এখানে বলা ভালো যে, গোজামিলের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো—এটা পুরোপুরি যাচাইযোগ্য নয়, আবার সম্পূর্ণ অযৌক্তিকও নয়। এটি মাঝামাঝি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে, যেখানে সত্য-মিথ্যার সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যায়। বাংলাদেশে গোজামিলের চর্চা অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এখানে রাজনীতি যেন গোজামিলের অলিম্পিক। প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় এমন ভঙ্গিতে, যেন আগামীকাল সকালেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। আর যখন তা হয় না, তখন নতুন গোজামিল দিয়ে পুরনো গোজামিল ঢেকে দেওয়া হয়।

গোজামিলের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো—এটি পরিস্থিতি অনুযায়ী রঙ বদলায়। যখন ক্ষমতায় থাকেন, তখন আপনার গোজামিল হয় ‘কৌশল’। আর যখন বিরোধীতে যান, তখন অন্যের গোজামিল হয়ে যায় ‘প্রতারণা’।

একই কাজ, ভিন্ন অবস্থান—দুটি ভিন্ন ব্যাখ্যা।

ধরুন, একটি দল বলল—‘আমরা জনগণের কল্যাণে কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ আরেকটি দল বলল—’এটা জনগণের ওপর জুলুম।’ বাস্তবে দুই পক্ষ একই ঘটনাকে ভিন্ন ভিন্ন গোজামিল দিয়ে ব্যাখ্যা করছে। গোজামিলের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হলো সাধারণ মানুষ। তারা বুঝতে পারে না, কোনটা সত্য, কোনটা সাজানো। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, এই দেশে সবকিছুর শুরু হয় ‘মিল’ দিয়ে, আর শেষ হয় ‘গোজামিলে’। এখানে অঙ্কের খাতায় দুই আর দুই মিলে চার হয় না—পরিস্থিতি অনুযায়ী কখনো পাঁচ, কখনো সাড়ে তিন, আবার প্রয়োজনে শূন্যও হয়ে যায়। হিসাব মেলাতে না পারলে কেউ চিন্তিত হয় না; বরং বলা হয়—’হিসাবটা একটু ক্রিয়েটিভ হয়েছে!’

এই দেশের শাসনব্যবস্থাও বেশ আধুনিক। এখানে সিদ্ধান্ত আগে নেওয়া হয়, যুক্তি পরে তৈরি করা হয়। অর্থাৎ আগে ঘোষণা—‘আমরা ইতিহাসের সেরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ এরপর কয়েকজন বিশেষজ্ঞ বসে ভাবেন—‘এটার পক্ষে যুক্তি কী হতে পারে?’ কেউ বলেন—‘জনগণের কল্যাণ’, কেউ বলেন—‘দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন’, আর কেউ একটু দার্শনিক হয়ে বলেন—‘এটা আসলে মানসিক স্বাধীনতা।’ শেষ পর্যন্ত এমন এক যুক্তি দাঁড়ায়, যা শুনে সবাই মাথা নাড়ে, কিন্তু কেউ পুরোপুরি বুঝতে পারে না।

এই দেশে ভাষারও আলাদা ব্যাকরণ আছে। এখানে ‘সমস্যা’কে বলা হয় ‘চ্যালেঞ্জ’, ‘ব্যর্থতা’কে বলা হয় ‘শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা’, আর ‘ভুল’কে বলা হয় ‘গঠনমূলক পদক্ষেপ।’ ফলে কোনো কিছুই আর খারাপ থাকে না—সবই ইতিবাচক!

একবার এক মন্ত্রী সাংবাদিকদের বললেন, ‘আমাদের দেশে কোনো সংকট নেই।’ সাংবাদিক সাহস করে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কিন্তু স্যার, মানুষ তো কষ্টে আছে?’ মন্ত্রী মুচকি হেসে বললেন, ‘ওটা সংকট না, ওটা ‘কষ্টের অভিজ্ঞতা’—যা মানুষকে শক্তিশালী করে।’ সাংবাদিক চুপ। কারণ এই দেশে প্রশ্ন করাও এক ধরনের বিলাসিতা, যার মূল্য মাঝে মাঝে বেশ চড়া।

গোজামিলের দেশে নির্বাচনও বেশ চমৎকারভাবে হয়। ভোটের আগে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়—সব সমস্যার সমাধান হবে, সবাই সুখে থাকবে, আর দেশের উন্নয়ন এমন গতিতে এগোবে যে প্রতিবেশী দেশগুলো দূরবীন দিয়ে তাকিয়ে থাকবে। ভোটের পর যখন মানুষ জিজ্ঞেস করে—‘কোথায় সেই উন্নয়ন?’ তখন উত্তর আসে—‘আপনারা বুঝতে পারছেন না, উন্নয়নটা ইনভিজিবল!’

এই ‘অদৃশ্য উন্নয়ন’ এই দেশের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার। এটি দেখা যায় না, ছোঁয়া যায় না, কিন্তু সর্বত্র বিরাজমান—ঠিক বাতাসের মতো, তবে একটু বেশি রাজনৈতিক।

শিক্ষাব্যবস্থাও এখানে গোজামিলময়। পরীক্ষার ফলাফল এমনভাবে প্রকাশ করা হয়, যেন সবাই সফল। কেউ ফেল করলে বলা হয়—‘সে এখনো তার সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারেনি।’ আর কেউ খুব ভালো করলে বলা হয়—‘সে দেশের গর্ব’—যদিও সেই ছাত্র পরের বছরই বিদেশে পাড়ি জমায়।

এই দেশে ইতিহাসও বেশ নমনীয়। এখানে ইতিহাস বইয়ে যা লেখা থাকে, তা সময় অনুযায়ী বদলে যায়। আজ যে ব্যক্তি নায়ক, কাল সে খলনায়ক হতে পারে—আর পরশু আবার নায়ক। ইতিহাস এখানে স্থির কিছু নয়; এটি যেন এক লাইভ প্রোগ্রাম, যার স্ক্রিপ্ট প্রতিদিন আপডেট হয়। গোজামিল এখানে শুধু শাসনের অংশ নয়; এটি জীবনের অংশ।

এই দেশের নাগরিকরাও যথেষ্ট বিচিত্র স্বভাবের। তারা জানে, সবকিছু নিখুঁত না হলেও চলে—যতক্ষণ পর্যন্ত গল্পটা ভালো শোনায়। তারা জানে, বাস্তবের চেয়ে বর্ণনাই বেশি প্রভাবশালী। তাই কেউ যখন জোর গলায় বলে—‘আমরা বিশ্বের সেরা’—তখন তারা একটু হাসে, একটু ভাবে, তারপর মাথা নাড়ে—‘হতে পারে!’

গোজামিলের দেশে সত্য আর মিথ্যার মাঝখানে একটি বিশাল এলাকা আছে—যার নাম ‘ব্যাখ্যা।’ এখানে সবকিছু ব্যাখ্যা দিয়ে ঠিক করা যায়। আপনি যদি বলেন, ‘এইটা ভুল’—তখন কেউ বলবে, ‘না, আপনি ঠিকভাবে বুঝতে পারেননি।’ আপনি যদি বলেন, ‘এটা কাজ করছে না’—তখন উত্তর আসবে, ‘এটা অন্যভাবে কাজ করছে।’

এইভাবে সবকিছু ঠিক হয়ে যায়—অন্তত কথার জগতে।

শেষ পর্যন্ত, ‘গোজামিলের দেশ, গোজামিলের শাসন’ কোনো সাধারণ বিষয় নয়; এটি এক ধরনের দর্শন। এখানে সত্যকে একটু বাঁকানো হয়, যুক্তিকে একটু সাজানো হয়, আর বাস্তবতাকে একটু পালিশ করা হয়—যাতে সবকিছু দেখতে সুন্দর লাগে।

আর আমরা, এই দেশের নাগরিকরা, সেই সাজানো বাস্তবতার মধ্যেই বাস করি—মাঝে মাঝে হাসি, মাঝে মাঝে বিরক্ত হই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মেনে নিই। কারণ আমরা জানি—এই দেশে সবকিছুই মিলে,না মিললেও—মিলিয়ে দেওয়া হয়!

এইচআর/এমএস