জাতীয়

ভোজ্যতেল নিতে ‘শর্তের চাপে’ ব্যবসায়ীরা, বিপাকে ক্রেতা

প্রায় এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চাহিদা মতো সয়াবিন তেল পাচ্ছেন না খুচরা ব্যবসায়ীরা। কোনো কোনো কোম্পানির বোতলজাত সয়াবিন তেল নিতে মানতে হচ্ছে অন্য পণ্য নেওয়ার শর্ত। তেল নিয়ে এমন তেলেসমাতির সুযোগে ক্রেতা পড়েছেন বিপাকে। কেউ কিনছেন চাহিদার অতিরিক্ত তেল, কেউ আবার সয়াবিন তেলের জন্য দোকানে দোকানে ঘুরছেন।

বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) সকাল ১১টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত মিরপুরের তিনটি কাচাঁবাজারে ঘুরেছেন জাগো নিউজের এই প্রতিবেদক। বেশিরভাগ দোকানে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দেখা মিলেছে। খোলা সয়াবিন তেলেও দেখা গেছে একই চিত্র। তবে তেল নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন ক্রেতা ও বিক্রেতারা।

ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, চাহিদামতো তেল দিচ্ছেন না ডিলাররা। তেল চাইলে খারাপ ব্যবহার করছেন কিছু ডিলার। কেউ আবার বাকিতে তেল দেওয়া বন্ধ করেছেন। কেউ দোকান পর্যন্ত তেল পৌঁছে দিচ্ছেন না। ডিলার পয়েন্ট থেকে তেল আনতে বাড়তি পরিবহন খরচ হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, যে কোম্পানির তেল নিচ্ছেন সেখান থেকে বাধ্য হয়ে অন্য পণ্যও নিতে হচ্ছে তাদের।

যে কোম্পানির তেল নিচ্ছেন সেখান থেকে বাধ্য হয়ে অন্য পণ্যও নিতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের/ছবি: জাগো নিউজ

বাজারে প্রতি লিটার খোলা পাম তেল বিক্রি হচ্ছে ১৭০ থেকে ১৯০ টাকায়। খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ১৯৫ থেকে ২১০ টাকা পর্যন্ত। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ২০-২৫ টাকা বেশি দামে খোলা তেল বিক্রি হচ্ছে। তবে নির্ধারিত দামেই বিক্রি হচ্ছে বোতলজাত সয়াবিন তেল।

৬ নম্বর বড় মসজিদ সংলগ্ন কাঁচাবাজার। বাজারে ঢুকতেই চোখে পড়ে ভাইয়া জেনারেল স্টোর। দোকানে ডালের বস্তার ওপরে রাখা ৫ লিটার সয়াবিন তেলের একটি বোতল। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে এ প্রতিবেদক জানতে চান, তেল ঠিকমতো পাচ্ছেন কি না। ধমকের সুরে বিক্রেতা বলেন, ‘যেখানে তেল উৎপাদন হয়, সেখানে গিয়ে খবর নেন।’

বাজারে ঢুকতেই প্রায় সব দোকানে কমবেশি সয়াবিন তেলের বোতল দেখা যায়। বিক্রমপুর জেনারেল স্টোরে দেখা মেলে একাধিক তেলের বোতল। দোকানের ক্যাশিয়ার রিয়াজ জানান, তেলের কোনো সংকট তিনি দেখছেন না। চাহিদা মতোই তেল পাওয়া যাচ্ছে। কোনো শর্ত ছাড়াই তেল পাওয়া যাচ্ছে। 

‘আমাদের বড় দোকান। সব কোম্পানির সব পণ্য রাখি। কোনো শর্ত মেনে তেল কিনতে হচ্ছে না। তবে ক্রেতা চাহিদার চেয়ে বেশি তেল কিনছে। যে তেল বিক্রি করতে ১৫-২০ দিন লাগতো, তা এখন এক সপ্তাহের মধ্যেই বিক্রি হচ্ছে।’

এক গলি পরেই নজরুল এন্টারপ্রাইজ। যেখান থেকে বিক্রমপুর জেনারেল স্টোর দেখা যায়। নজরুল এন্টারপ্রাইজে সরিষার তেলের বোতল দেখা গেলো। এই দোকানের মালিক নজরুল ইসলাম বলেন, রোজার ঈদের আগ থেকেই সয়াবিন তেলের সংকট।

তিনি বলেন, চাহিদা মতো তেল পাচ্ছি না। হঠাৎ ২-৩ কার্টন তেল দেয়, তারপর আবার কয়েকদিন খবর নাই। কিছু দোকানে কোম্পানি বেশি সুবিধা দেয়, সেই সব দোকানে তেল আছে।

ওই এলাকার বাসিন্দা সুলতানাকে কয়েকটি দোকানে তেল খুঁজতে দেখা যায়। তিনি বলেন, তেলের দাম ঠিক আছে। কিন্তু এক লিটারের তেলের বোতল পাচ্ছি না। ২ লিটার ও ৫ লিটার আছে। এ জন্য দোকানে দোকানে খুঁজছি।

ওই বাজারের নর্থ বেঙ্গল স্টোরের ক্যাশিয়ার মোরসালিন বলেন, রূপচাঁদার ৫ লিটার বোতল তিন কার্টুন নিতে এক বস্তা পোলাউয়ের চাল নিতে হচ্ছে। অন্য ব্র‍্যান্ডের তেলেরও সংকট আছে।

ছবি: জাগো নিউজ

৬ নম্বর কাঁচাবাজার থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার দূরে মিরপুর ১১ নম্বর কাঁচাবাজার। রিকশায় যেতে লাগে ৪০ টাকা ভাড়া। দুই বাজারের দৃশ্যপট একই রকমের।

মেসার্স মাহবুব ট্রেডার্স নামের দোকানে স্টারশিপ ও রূপচাদা ব্র‍্যান্ডের ২ ও ৫ লিটার সয়াবিন তেলের বোতল দেখা যায়। যদিও দোকানটির স্বত্বাধিকারী ফরিদ আলম বলেন, তেলের সঙ্গে সুগন্ধি চাল নেওয়ার শর্তে তিনি পণ্য পেয়েছেন। 

তিনি বলেন, গায়ের রেটেই তেল বিক্রি করছি। ১ লিটার সয়াবিন তেল ১৯৫ আর ৫ লিটার ৯৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কোম্পানিগুলোর কাছে তেল চাইলে তাদের ডিলাররা খারাপ ব্যবহার করছেন। তেল দোকানে পৌঁছে দিচ্ছেন না। পরিবহন খরচ হচ্ছে আমাদের। এক বোতল তেলে ২-৩ টাকা লাভ হয়।  

মাহবুব ট্রেডার্সের পাশেই আক্তার স্টোর। এই দোকানে আবার তেল নেই। দোকানের মালিক আক্তার হোসেনও তেল নিতে শর্তের বেড়াজালের কথা স্বীকার করলেন। বললেন, ঈদের পর কোম্পানিগুলো তেলের দাম বাড়িয়েছে। আমাদের কমিশন কমেছে। এখন তেল পাই না, আমার দোকানে তেল নাই।

আক্তার হোসেনের মতো একই কথা জানান মতিন স্টোরের মালিক আব্দুল মতিন। তার দোকান কাঁচাবাজারের ভেতরে। তিনি বলেন, কবে এ সংকট কাটবে এ নিয়ে ডিলাররা কিছু বলছে না। 

১ লিটার করে দুই লিটার তেল ও কিছু সবজি কিনে বাড়ি ফিরছিলেন সুমন আহমেদ। তিনি বলেন, যে কোম্পানির ২ লিটার তেলের বোতল খুঁজছিলাম সেটা পাইনি। অন্য কোম্পানির ১ লিটার করে ২ লিটার তেল নিলাম।

পল্লবীর মুসলিম বাজারের দেখা গেলো একই চিত্র। বড় দোকানে তেল পাওয়া গেলেও ছোট দোকানে তেলের সংকট দেখা গেছে।

মারজানা স্টোরের বিক্রয় কর্মী সোহাগ বলেন, কেবল ২ লিটার তেল আছে। গায়ের রেটেই বিক্রি করছি। পরিচিত কাস্টমারদের ফিরিয়ে দিচ্ছি না।

বিক্রির জন্য দোকানে রাখা তেলের বোতল/ছবি: জাগো নিউজ

ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করছেন, ভোজ্যতেল সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো বাজারে বোতলজাত তেলের সরবরাহ সীমিত করে দিয়েছে। একইসঙ্গে তারা প্রতি লিটারে ১২ টাকা দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে।

বর্তমানে এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের নির্ধারিত দাম ১৯৫ টাকা। প্রস্তাব অনুযায়ী এটি ২০৭ টাকা এবং ৫ লিটার বোতলের দাম ৯৫৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,০২০ টাকা করার কথা বলা হয়েছে। আর খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৭৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৮৫ টাকা, পাম তেল বর্তমান নির্ধারিত দাম ১৬৪ টাকা থেকে বাড়িয়ে প্রতি লিটার ১৭৭ টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন।

ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবীর ভূঁইয়া বলেন, অসাধু ব্যবসায়ীদের কারণে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

তিনি অভিযোগ করেন, বাজার থেকে তেল উধাও করে সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা চলছে। কিছু পরিশোধনকারী কোম্পানির বিরুদ্ধে সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

এসএম/এমএমকে