মধ্যপ্রাচ্যের চলতি যুদ্ধ দিন দিন গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। তেলের ভয়াবহ সংকট থেকে নানা দেশে অয়েল শক শুরু হয়ে গেছে। অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালি সচলে সহযোগিতা না করায় মিত্র দেশগুলোর ওপর আবারও চটেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, ‘যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোর উচিত এখন সাহস সঞ্চয় করে হরমুজ প্রণালিতে যাওয়া এবং সেখান থেকে নিজেদের প্রয়োজনীয় জ্বালানি ছিনিয়ে নেওয়া’—এর কথা।
নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প এই বিতর্কিত মন্তব্য করেন। হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় বর্তমানে অনেক দেশই তীব্র জ্বালানি সংকটে ভুগছে। এ প্রসঙ্গ টেনেই সরাসরি যুক্তরাজ্যকে লক্ষ্য করে ক্ষোভ ঝাড়েন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাজ্যের মতো যেসব দেশ ইরানের শাসনব্যবস্থা নির্মূল করার লড়াইয়ে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হতে অস্বীকার করেছিল এবং এখন হরমুজ প্রণালির কারণে জেট ফুয়েল পাচ্ছে না, তাদের জন্য আমার একটি পরামর্শ আছে। প্রথমত, আপনারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি কিনুন, আমাদের প্রচুর আছে। আর দ্বিতীয়ত, কিছুটা সাহস সঞ্চয় করুন, হরমুজে যান এবং আপনাদের যা প্রয়োজন তা ছিনিয়ে নিন।
বিশ্ব রাজনীতিতে শক্তির প্রদর্শন নতুন কোনো বিষয় নয়। ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়েই আমরা দেখেছি, ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো নিজেদের স্বার্থে নানা কৌশল গ্রহণ করেছে। তবে সেই কৌশলের মধ্যেও এক ধরনের ন্যূনতম শালীনতা, আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখার চেষ্টা ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে, বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে, সেই সীমারেখা বারবার অতিক্রম করা হয়েছে বলেই মনে হয়। আর যখন হরমুজ প্রণালির মতো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথে তেলবাহী জাহাজ জব্দ বা ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা সামনে আসে, তখন মনে হয়—এটা কি কূটনীতি, নাকি পেশিশক্তির বেপরোয়া ব্যবহার?
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ। পারস্য উপসাগর থেকে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহের একটি বড় অংশ এই সরু জলপথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে সামান্য উত্তেজনাও বৈশ্বিক অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দিতে পারে। তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়া, জ্বালানি সংকট, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি—সবকিছুই একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। তাই এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা শুধু আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক প্রয়োজন।
এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে যদি কোনো শক্তিধর রাষ্ট্র এমন পদক্ষেপ নেয়, যা এই জলপথের নিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, তাহলে সেটা হবে এক ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। আন্তর্জাতিক জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজের অবাধ চলাচল একটি মৌলিক অধিকার। এই অধিকার লঙ্ঘিত হলে তা শুধু একটি দেশের ক্ষতি করে না, বরং পুরো বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তোলে।
এর পেছনে যে রাজনৈতিক ও কৌশলগত হিসাব-নিকাশ রয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু সেই হিসাব কি এতটাই জরুরি যে আন্তর্জাতিক নিয়মকানুনকে উপেক্ষা করতে হবে? কোনো রাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইলে তার জন্য স্বীকৃত নানা উপায় রয়েছে—যেমন, নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক আলোচনা, আন্তর্জাতিক জোট গঠন ইত্যাদি। কিন্তু সরাসরি জাহাজ জব্দ করা বা শক্তিপ্রয়োগের মাধ্যমে বার্তা দেওয়া এক ধরনের বিপজ্জনক খেলা।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তির ব্যবহার কখনোই একমাত্র সমাধান হতে পারে না। বরং সংলাপ, সহযোগিতা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাই হতে পারে টেকসই পথ। হরমুজ প্রণালীর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সবার দায়িত্ব। সেখানে হঠকারী সিদ্ধান্ত শুধু সমস্যাকে বাড়ায়, সমাধান দেয় না। বিশ্ব আজ একটি আন্তঃনির্ভরশীল বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে। এখানে এক দেশের সিদ্ধান্ত অন্য দেশের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। তাই দায়িত্বশীল আচরণই হওয়া উচিত প্রতিটি রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার। অন্যথায়, তাই বলে হরমুজে তেল ছিনতাই? ছি: ট্রাম্প! বৈশ্বিক জনগণের এই ক্ষোভই একদিন বৃহত্তর অস্থিরতার পূর্বাভাস হয়ে উঠতে পারে।
ইতোপূর্বে ভেনেজুয়েলার নিকোলাস মাদুরোকে কেন্দ্র করে যে ধরনের আগ্রাসী মনোভাব দেখা গিয়েছিল, সেটিও এই প্রেক্ষাপটে উল্লেখযোগ্য। একটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটে বাইরের শক্তির সরাসরি হস্তক্ষেপ বা অপহরণের মতো চিন্তাভাবনা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক ধরনের নৈতিক সংকট তৈরি করে। সেই একই মানসিকতার প্রতিফলন যদি হরমুজ প্রণালীর মতো স্পর্শকাতর অঞ্চলে দেখা যায়, তাহলে তা উদ্বেগজনকই বটে।
এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। এই ধরনের পদক্ষেপ শুধু প্রতিপক্ষ রাষ্ট্র নয়, তার মিত্রদেরও অস্বস্তিতে ফেলে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমন্বয় ও পরামর্শ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একতরফা সিদ্ধান্ত, বিশেষ করে এমন সংবেদনশীল বিষয়ে, সেই সমন্বয়কে ভেঙে দেয়। ফলে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বিভক্তি তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে কোনো পক্ষের জন্যই ভালো নয়।
হরমুজ প্রণালীর মতো একটি অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়ানোর আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনা। এই অঞ্চলে ইরানসহ একাধিক শক্তিশালী রাষ্ট্রের উপস্থিতি রয়েছে, যাদের স্বার্থ সরাসরি এই জলপথের সঙ্গে জড়িত। ফলে একটি ছোট ঘটনা খুব সহজেই বড় আকার ধারণ করতে পারে। একটি জাহাজ জব্দের ঘটনা থেকে শুরু হয়ে তা পূর্ণাঙ্গ সংঘাতে রূপ নিতে পারে, যার প্রভাব হবে খুবই ভয়াবহ।
এ ছাড়া এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় উন্নয়নশীল দেশগুলো। তেলের দাম বাড়লে তাদের অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব পড়ে। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পায়, মূল্যস্ফীতি বাড়ে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায়। অর্থাৎ, একটি শক্তিধর রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বোঝা বহন করতে হয় বিশ্বের দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীকে।
কিন্তু তাই বলে কি হরমুজে তেল ছিনতাই করতে হবে? এই প্রশ্নের মধ্যে শুধু ক্ষোভ নয়, বরং এক ধরনের হতাশাও রয়েছে। কারণ বিশ্ব রাজনীতিতে আমরা আশা করি দায়িত্বশীলতা, সংযম এবং দূরদর্শিতা। কিন্তু যখন সেই জায়গায় হঠকারিতা ও শক্তির বেপরোয়া ব্যবহার দেখা যায়, তখন তা হতাশাজনকই মনে হয়।
বলা যায়, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তির ব্যবহার কখনোই একমাত্র সমাধান হতে পারে না। বরং সংলাপ, সহযোগিতা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাই হতে পারে টেকসই পথ। হরমুজ প্রণালীর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সবার দায়িত্ব। সেখানে হঠকারী সিদ্ধান্ত শুধু সমস্যাকে বাড়ায়, সমাধান দেয় না।
বিশ্ব আজ একটি আন্তঃনির্ভরশীল বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে। এখানে এক দেশের সিদ্ধান্ত অন্য দেশের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। তাই দায়িত্বশীল আচরণই হওয়া উচিত প্রতিটি রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার। অন্যথায়, তাই বলে হরমুজে তেল ছিনতাই? ছি: ট্রাম্প! বৈশ্বিক জনগণের এই ক্ষোভই একদিন বৃহত্তর অস্থিরতার পূর্বাভাস হয়ে উঠতে পারে।
লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন।fakrul@ru.ac.bd
এইচআর/জেআইএম