খেলাধুলা

মেসির পাশে আলভারেজ: বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার নতুন সমীকরণ

২০২২ বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনা দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন হুলিয়ান আলভারেজ। তবে লিওনেল মেসির সঙ্গে জুটিটা ছিল অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়ার। বিশ্বকাপের পর অবসরে চলে গেছেন ডি মারিয়া। মেসির পাশে এবার হুলিয়ান আলভারেজের জুটি নিয়ে তৈরি হচ্ছে নতুন সমীকরণ। বিশেষ করে আলভারেজের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সের পর।

হুলিয়ান আলভারেজের ধারাবাহিক উন্নতি আর্জেন্টিনা ফুটবলের জন্য দারুণ ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের জার্সিতে এফসি বার্সেলোনার বিপক্ষে অসাধারণ এক ফ্রি-কিক গোল করে নিজের খেলায় নতুন মাত্রা যোগ করার প্রমাণ দিয়েছেন এই ফরোয়ার্ড।

২০২১ সালে রিভার প্লেটের হয়ে লিগ শিরোপা জয়ের পথে মাত্র ২১ বছর বয়সে ২১ ম্যাচে ১৮ গোল করে আলোচনায় আসেন আলভারেজ। দূরপাল্লার শট, ওয়ান-অন-ওয়ান এবং হেড- সব ধরনের গোল করার দক্ষতায় তিনি দ্রুতই আর্জেন্টিনার অন্যতম প্রতিশ্রুতিশীল তারকা হিসেবে পরিচিতি পান। সেই পারফরম্যান্সের ভিত্তিতেই তাকে ২ কোটি ১০ লাখ ইউরোর বেশি ট্রান্সফার ফিতে দলে ভেড়ায় ম্যানচেস্টার সিটি।

রিভার প্লেটের বিখ্যাত একাডেমি থেকে উঠে আসা আলভারেজ সেই ধারারই আরেক উজ্জ্বল উদাহরণ, যেখান থেকে পাবলো আইমার, হ্যাভিযের সাভিওলা এবং অ্যারিয়েল ওরতেগাদের মতো তারকার জন্ম হয়েছে। তবে শুরুতে প্রশ্ন ছিল- তার প্রতিভা ঠিক কতদূর যেতে পারবে? পাঁচ বছর পর সেই প্রশ্নের উত্তর মিলছে ধীরে ধীরে। প্রতিটি ম্যাচেই নিজেকে আরও উন্নত করে তুলছেন আলভারেজ।

চ্যাম্পিয়ন্স লিগের কোয়ার্টার ফাইনালের প্রথম লেগে বার্সেলোনার বিপক্ষে ২-০ গোলের জয়ে বিরতির ঠিক আগে দারুণ এক ফ্রি-কিক থেকে গোল করেন আলভারেজ। নিখুঁত শটে বল জালে জড়ালে গোলরক্ষক হুয়ান গার্সিয়ার কিছুই করার ছিল না। যদিও সেট-পিস বিশেষজ্ঞ হিসেবে এখনও তাকে ধরা হয় না, তবুও তার উন্নতি স্পষ্ট। ২০২৫ সালে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে ৪-২ জয়ের ম্যাচেও ফ্রি-কিক থেকে গোল করেছিলেন, একই বছরে রিয়াল বেটিসের বিপক্ষেও সফল হন।

আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি আলভারেজ সম্পর্কে বলেন, ‘হুলিয়ান যেকোনো দলে মানিয়ে নিতে পারে। সে যেমন পেপ গার্দিওলার অধীনে ম্যানচেস্টার সিটিতে ভালো খেলেছে, তেমনি এখন দিয়েগো সিমিওনের অধীনে অ্যাটলেটিকোতেও খেলছে। বার্সেলোনা বা রিয়াল মাদ্রিদ- যে কোনো দলই তাকে চাইবে।’

২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে অ্যাটলেটিকো যোগ দেওয়ার পর আলভারেজ এখন এমন এক স্কোয়াডের অংশ, যেখানে আর্জেন্টিনার শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে- হুয়ান মুসো, নাহুয়েল মোলিনা, জিউলিয়ানো সিমিওনে, নিকো গঞ্জালেজ ও থিয়াগো আলমাদাদের সঙ্গে।

২০২২ ফিফা বিশ্বকাপে আলভারেজ শুরুতে লওতারো মার্টিনেজের বিকল্প হিসেবে দলে ছিলেন। কিন্তু সৌদি আরব জাতীয় দলের বিপক্ষে হারের পর এবং মার্টিনেজের ফিটনেস সমস্যার কারণে সুযোগ পান তিনি। এরপর গ্রুপ পর্বে পোল্যান্ড জাতীয় দলের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ গোল এবং সেমিফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করে টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ে পরিণত হন।

স্কালোনি বলেন, ‘সে (আলভারেজ) কোচ যা চায় তাই করে, কখনও অস্বস্তি হলেও দায়িত্ব পালন করে এবং ভালোভাবেই করে।’ লিওনেল মেসির সঙ্গে আক্রমণে খেলতে গিয়ে আলভারেজ কেবল গোলদাতা নন, বরং দলের প্রেসিং, শারীরিক শক্তি এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণ ভাঙার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন।

বার্সেলোনার বিপক্ষে ম্যাচসেরা হওয়ার পর আলভারেজ বলেন, ‘বল মারার সময়ই বুঝেছিলাম শটটা ভালো হয়েছে। নেওয়ার আগেই আত্মবিশ্বাস ছিল। আগের দিন অনুশীলনে পাঁচ-ছয়টা নিয়েও গোল পাইনি, কিন্তু আজ পেরেছি।’

তার ফ্রি-কিক গোলের আগে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে তিনি বল বাড়ান জিউলিয়ানো সিমিওনের দিকে, যাকে ফাউল করে লাল কার্ড দেখেন পাও কুবার্সি। আলভারেজের ফ্রি-কিক নেওয়ার স্টাইলও আলাদা- ছোট রান-আপ, পায়ের ভেতরের অংশ দিয়ে নিখুঁত শট এবং দেয়ালের ওপর দিয়ে বল তোলার দক্ষতা।

শুধু গোল নয়, আলভারেজের বিশেষত্ব তার বহুমুখী খেলায়। তীব্র প্রেসিং, পেছন ফিরে বল ধরে খেলা গড়া, ফাঁকা জায়গায় দ্রুত দৌড় এবং ট্যাকটিক্যাল বুদ্ধিমত্তা- সব মিলিয়ে তিনি একাধিক আক্রমণভাগের পজিশনে খেলতে পারেন। দিয়েগো সিমিওনের অধীনে অনেক সময় তাকে নিচে নেমে বা ডান-বাম প্রান্তে খেলতে দেখা যায়, বিশেষ করে অ্যারেকজান্ডার সোরলথের সঙ্গে জুটি গড়লে।

সব মিলিয়ে, আলভারেজ এখন শুধু বিশ্বকাপজয়ী একজন ফুটবলার নন, বরং প্রতিটি ম্যাচে নিজেকে আরও উন্নত করে চলা এক সম্পূর্ণ ফরোয়ার্ড- যার বিকাশ আর্জেন্টিনার ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।

আইএইচএস/