ড. আলী মুহাম্মদ সাল্লাবি বিশ্বখ্যাত আলেম, ইতিহাসবিদ ও লেখক। তিনি ১৯৬৩ সালে লিবিয়ার বেনগাযি শহরে জন্মগ্রহণ করেন। মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উসুল আদ-দ্বীন বিভাগ এবং দাওয়া বিভাগ থেকে ব্যাচেলরস অব আর্টসে ডিগ্রি লাভ করেন। পরে ১৯৯৬ সালে উসুল আদ-দ্বীন বিভাগ থেকে তাফসীর, উলুমুল কোরআন বিষয়ে মাস্টার ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি ১৯৯৯ সালে উম্মে দুরমান ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সুদান থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তারপর তিনি যুগশ্রেষ্ঠ আলেম ড. ইউসুফ আল-কারযাভীর (রহ.) অধীনেও পড়াশোনা করেন।
আরবি ভাষায় তার রচিত সিরাত ও ইসলামের ইতিহাস বিষয়ক বেশ কিছু গ্রন্থ বাংলা, ইংরেজিসহ বহু ভাষায় অনূদিত হয়ে সারা পৃথিবীতে জনপ্রিয় হয়েছে।
মঙ্গলবার (৮ এপ্রিল ২০২৬) ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড পেজে ‘মানুষের প্রাচীনতম ধর্ম’ নিয়ে লিখেছেন ড. আলী মুহাম্মদ সাল্লাবী। তার আরবি ফেসবুক পোস্টটির বাংলা অনুবাদ জাগো নিউজের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।
ড. আলী মুহাম্মদ সাল্লাবি লিখেছেন:
“তাওহিদ বা একত্ববাদ মানুষের প্রথম ধর্ম। তারপর মানুষের মধ্যে বিচ্যুতি শুরু হয় এবং ধীরে ধীরে অবস্থার পরিবর্তন ঘটে, অনেক রকম পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর এক পর্যায়ে মানুষ শিরকে জড়িয়ে পড়ে। কোরআন ও সুন্নাহর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ এই মতটি মুসলমান ও আসমানী কিতাবসমূহের অনুসারীদের বিশ্বাস তো বটেই, পশ্চিমা ও অন্যান্য অঞ্চলের কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক ও ধর্ম গবেষকগণও এর পক্ষে প্রমাণ খুঁজে পেয়েছেন। এখানে আমরা তাদের বক্তব্যের কিছু উদাহরণ উল্লেখ করছি:
১. আদিম ধর্মসমূহ গবেষণায় বিশেষজ্ঞ অ্যাডামসন হোবেল (Adamson Hoebel) বলেন, ‘সেই যুগ চলে গেছে যখন প্রাচীন মানুষকে পবিত্র সত্তা বা মহান ঈশ্বর সম্পর্কে চিন্তা করতে অক্ষম বলে অভিযুক্ত করা হতো। এডওয়ার্ড বার্নেট টাইলরের (Edward Burnett Tylor) এই চিন্তা ভুল যে, একত্ববাদ সভ্যতার অগ্রগতি ও উচ্চতর জ্ঞানের ফল এবং মানুষের চিন্তার এমন বিবর্তনের ফল যা শুরু হয়েছিল আত্মা ও ভূতের পূজা থেকে, তারপর বহুত্ববাদ এবং সবশেষে একত্ববাদের ধারণায় পৌঁছেছে।’
২.গত শতাব্দীর অন্যতম গবেষক অ্যান্ড্রু ল্যাং (Andrew Lang) বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা এবং ভারতের মানুষের মহান ঈশ্বরে বিশ্বাস খ্রিষ্টীয় বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি।’ এই মতটি অস্ট্রেলীয় বিজ্ঞানী উইলিয়াম স্মিথও (Wilhelm Schmidt) সমর্থন করেছেন। তিনি তার ‘দ্য অরিজিন অফ দ্য আইডিয়া অফ গড’ গ্রন্থে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এমন একগুচ্ছ প্রমাণ সংগ্রহ করেছেন যা নিশ্চিত করে যে, মানুষের আদি ইবাদত ছিল এক আল্লাহর ইবাদত।
৩. ইন্দোনেশিয়ার মালয় অঞ্চলের পণ্ডিত ড. হাজি অরাং কাই বলেন, ‘আমাদের মালয় দ্বীপপুঞ্জে (আর্চিপেলাগো) এমন নিশ্চিত প্রমাণ রয়েছে যে, আমাদের এই অঞ্চলের অধিবাসীরা এক আল্লাহর ইবাদত করত—আর তা এই ভূখণ্ডে ইসলাম প্রবেশের আগে এবং খ্রিষ্টধর্ম প্রবেশের অনেক আগের কথা। ইন্দোনেশিয়ার কালিমান্তান দ্বীপের মানুষের আকিদায় হিন্দুধর্মের কিছু প্রভাব এবং ইসলামের কিছুটা সুবাস রয়েছে; যদিও হিন্দুধর্ম বা ইসলাম পৌঁছানোর আগে তাওহিদই ছিল এ অঞ্চলের মানুষের আদি ধর্ম। আমরা যদি সংস্কৃত ভাষার ব্যবহার বা হিন্দু অভিবাসন এবং ইসলাম আগমনের পূর্বের প্রচলিত কথ্য ভাষায় ফিরে যাই, তবে আমাদের পূর্বপুরুষের আকিদাগত এই বিশ্বাস সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, তাদের বিশ্বাসে আল্লাহ ছিলেন এক ও একক, তার কোনো রকম শরিকানায় তারা বিশ্বাস করতো না।’
এই বিজ্ঞানীগণ এবং তাঁদের মতো আরও অনেকে—যেমন ল্যাং, ফ্রেজার, স্মিথ, পেটাজ্জোনি—তাঁদের গবেষণার মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, মানুষের আদি ধর্ম তাওহিদ, শিরক নয়। বহু সংখ্যক বিজ্ঞানী এই মতকে সমর্থন করেছেন এবং প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার ও খননকার্যের মাধ্যমে একে শক্তিশালী করেছেন। এসব আবিষ্কার প্রমাণ করে, এমন অনেক প্রাচীন জাতি ছিল যারা বহুঈশ্বরবাদ চিনত না এবং এক ঈশ্বরে বিশ্বাসী ছিল। এর ওপর ভিত্তি করেই তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, একত্ববাদই হলো মানুষের জানা প্রাচীনতম ধর্ম; আর বহুত্ববাদ ও মূর্তিপূজা হলো তাওহিদের আকিদার পরে আসা বিচ্যুতি মাত্র।
মানুষের আদি তাওহিদ হওয়ার বিষয়টি ওইসব মানুষের মিথ্যাচারকে খণ্ডন করে যারা বলে—ধর্ম মানুষের তৈরি, মানুষ প্রথমত বহু উপাস্যের উপাসনা শুরু করে, যা পরবর্তীতে দুই উপাস্যের (যেমন: আলো ও অন্ধকারের দেবতা, ভালো ও মন্দের দেবতা) উপাসনায় উন্নীত হয় এবং সবশেষে এক উপাস্যের ধারণায় পৌঁছায়।
নিশ্চয়ই তাওহিদই হলো মানুষের আদি ধর্ম যা মানুষের ফিতরত বা সহজাত প্রকৃতিতে গেঁথে দেওয়া হয়েছে। মানবজাতি তাওহিদ নিয়েই যাত্রা শুরু করেছিল, তারপর ধীরে ধীরে শিরক ও বহুত্ববাদের দিকে ধাবিত হয়েছে।
এই সত্যগুলো অগাস্ট কোঁত (Auguste Comte)-এর তত্ত্বকে পুরোপুরি উল্টে দেয়। কোঁত মনে করতেন মানবজাতি বহুত্ববাদ ও শিরক নিয়ে যাত্রা শুরু করে তাওহিদে পৌঁছেছে। এই তত্ত্ব আধুনিক গবেষণার সামনে টিকতে পারেনি, বরং এটি সেভাবেই ভেঙে পড়েছে যেভাবে এই চিন্তাবিদের অন্যান্য তত্ত্বগুলো ভেঙে পড়েছে। এক সময় চিন্তাবিদদের মধ্যে অগ্রগণ্য থাকলেও বর্তমানে তাঁর মতামতগুলো কেবল ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবেই পঠিত হয়।”
ওএফএফ