লেবাননে ইসরায়েলের হামলায় নিহত হয়েছেন ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার পূর্ব শালেপুর মুন্সিরচর গ্রামের মেয়ে দিপালী খাতুন। এখনও মরদেহ আসেনি দেশে। এ ঘটনায় দিপালীর পরিবারে চলছে স্বজনদের আহাজারি।
বুধবার (৮ এপ্রিল) লেবাননের বৈরুতের হামরা এলাকায় তার কফিলের পরিবারের সঙ্গে অবস্থানকালে ইসরায়েলের হামলায় তিনি নিহত হন।
দিপালী খাতুন চরভদ্রাসন উপজেলার হরিরামপুর ইউনিয়নের চর হাজিগঞ্জ গ্রামের চর শালেপুর ওয়ার্ডের শেখ মোফাজ্জলের মেয়ে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দিপালীর বাবা মোফাজ্জল শেখ পেশায় একজন দিনমজুর। তাদের নিজস্ব কোনো জমি নেই। মা রাজিয়া বেগম মারা গেছেন আট বছর আগে। মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও সরকারি খাস জমি। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় শেফালী, এরপর দিপালী, তারপর দুই ভাই ওবায়দুর ও সেকেন্দার এবং সবার ছোট লাইজু খাতুন।
২০১১ সালে অভাবের সংসারের ঘানি টানতে জীবিকার তাগিদে ১৯ বছর বয়সে প্রথম লেবানন যান দিপালী। মাঝে বাড়িতে বেড়াতে আসেন। সর্বশেষ ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে লেবাননে যান দিপালী। সেখানে গৃহপরিচারিকার কাজ করে বাড়িতে টাকা পাঠাতেন। সেই টাকা দিয়ে দুটি ভাঙা ঘর থেকে তোলা হয় দুটি চারচালা টিনের ঘর। দিপালী বাদে সব ভাইবোন বিবাহিত। সব ভাইবোনের বিয়েও হয়েছে তার পাঠানো টাকায়। কিন্তু নিজেই বিয়ে করেননি।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘ সময় প্রবাস জীবনে থেকেও দিপালির মন পড়ে থাকত দেশের বাড়িতে। ২০২০ এবং ২০২৩ সালে দুইবার দেশে এলেও শেষবার তার ফিরে যাওয়া ছিল কিছুটা অভিমানের। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে যখন তিনি দেশে আসেন, পরিবার তাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য পাত্র ঠিক করেছিল। কিন্তু স্বাবলম্বী দিপালী জানিয়ে দেন, তিনি বিয়ে করবেন না। পরে অনেকটা জোর করে তাকে বিয়ের পিঁড়িতে বসানোর চেষ্টা করা হলে তিনি একপ্রকার জেদ করেই ২০২৪ সালের এপ্রিলে পাড়ি জমান লেবাননে।
দিপালীর ছোট বোন লাইজু বেগম বলেন, একে একে সব ভাইবোনের বিয়ে হয়ে গেলেও বিয়ের কথা ভাবেননি আমার বোন। তিনি কেবল আমাদের কথা ভেবে গেছেন। প্রতিমাসে বাড়িতে খরচের জন্য লেবানন থেকে টাকা পাঠাতেন। ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছিল সংসারের চেহারা। দিপালী তার জীবন দিয়ে আমাদের ভালো রাখার চেষ্টা করে গেছে।
কাঁদতে কাঁদতে লাইজু বলেন, অভাবের কারণে স্কুলে যেতে পারেনি আমার বোন। পড়ালেখার বয়সে সংসারের বোঝা চাপে তার ওপর। নিজের সুখের কথা না ভেবে শুধুমাত্র বাবা, ভাই-বোনের মুখে হাসি ফোটাতে চলে যায় লেবাননে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আমার বোনের প্রাণ কেড়ে নিলো। তার ঋণ আমরা শোধ করবো কিভাবে? অন্তত আমার বোনের মরদেহ চাই।
বড় বোন শেফালি বেগম বলেন, ছোট বোনের সঙ্গে অনেক স্মৃতি মনে পড়ে। অভাবের কারণে পড়াশোনা করতে পারেনি আমার বোন। সে সারাজীবন শুধু পরিবারের জন্যই ভেবেছে। বিদেশ থেকে যখন দেশে আসত, তখন আমাদের সবার জন্য কিছু না কিছু নিয়ে আসতো। তার নিজের জন্য কিছু কিনতো না।
ফরিদপুর প্রবাসী কল্যাণ সেন্টারের সহকারী পরিচালক আশিক সিদ্দিকী বলেন, পরিবারের কাছে দিপালীর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চেয়েছি, পেলে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দ্রুতই মরদেহ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে।
বিষয়টি নিয়ে চরভদ্রাসন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুরাইয়া মমতাজ বলেন, মরদেহ দেশে আসার পরে বিমানবন্দর থেকে বাড়ি নিয়ে আসার এবং দাফন কাফনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে প্রবাসী কল্যাণ সেন্টার থেকে। মন্ত্রণালয়ে কথা বলে জেনেছি দ্রুতই মরদেহ চলে আসবে।
এন কে বি নয়ন/এনএইচআর/এমএস