অর্থনীতি

বিমার দাপটে বাড়লো সূচক-লেনদেন

দীর্ঘদিন পর দেশের শেয়ারবাজারে দাম বাড়ার ক্ষেত্রে দাপট দেখিয়েছে বিমা খাতের কোম্পানিগুলো। সিংহভাগ বিমা কোম্পানির শেয়ার দাম বাড়ায় সার্বিক বাজারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। মূল্য সূচক বাড়ার পাশাপাশি বেড়েছে লেনদেনের গতি।

রোববার (১২ এপ্রিল) প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) প্রায় সবকটি বিমা কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়েছে। এতে সার্বিকভাবে দাম বাড়ার তালিকা বড় হওয়ার পাশাপাশি প্রধান মূল্য সূচক বেড়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে লেনদেনের পরিমাণ। অন্য শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) দাম বাড়ার তালিকা বড় হওয়ার পাশাপাশি মূল্য সূচক বেড়েছে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিমা কোম্পানিগুলোর হিসাব বছর শেষ হয় ডিসেম্বরে। সামনে কোম্পানিগুলোর ২০২৫ সালের সমাপ্ত বছরের লভ্যাংশ সংক্রান্ত ঘোষণা আসবে। এ কারণেই হয়তো বিমা খাতের শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেড়েছে। এতে দামেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

তারা বলছেন, হঠাৎ কোনো কোম্পানির শেয়ার দাম বাড়লেই বিনিয়োগকারীদের সেই শেয়ারে ঝুঁকে পড়া উচিত না। বিনিয়োগের আগে অবশ্যই সার্বিক তথ্য ভালো করে পর্যালোচনা করা উচিত। সঠিকভাবে তথ্য পর্যালোচনা করে বিনিয়োগ করতে পারলে শেয়ারবাজার থেকে ভালো মুনাফা পাওয়া সম্ভব। অপরদিকে ভুল সিদ্ধান্ত নিলে লোকসানের মধ্যে পড়ে বিনিয়োগ করা পুঁজি হারাতে হবে।

বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, রোববার ডিএসইতে লেনদেন শুরু হয় অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমার মাধ্যমে। এতে লেনদেনের শুরুতেই সূচক ঋণাত্মক হয়ে পড়ে। তবে লেনদেনের সময় আধাঘণ্টা গড়ানোর আগেই দাম বাড়তে থাকে বিমা কোম্পানির শেয়ারের।

লেনদেনের সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বিমা কোম্পানির শেয়ার দাম বাড়ার প্রবণতা অব্যাহত থাকে। লেনদেনের শেষ পর্যন্ত এই ধরা অব্যাহত থাকে। ফলে প্রায় সবকটি বিমা কোম্পানির শেয়ার দাম বাড়ার পাশাপাশি দাম বাড়ার তালিকা বড় হয়েই দিনের লেনদেন শেষ হয়।

দিনের লেনদেন শেষে ডিএসইতে সব খাত মিলে দাম বাড়ার তালিকায় নাম লিখিয়েছে ১৮৮টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট। বিপরীতে দাম কমেছে ১৪৫টির। আর ৬৬টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। অপরদিকে বিমা খাতের ৫৬টি কোম্পানির শেয়ার দাম বাড়ার বিপরীতে মাত্র দুটির দাম কমেছে।

ভালো কোম্পানি বা ১০ শতাংশ অথবা তার বেশি লভ্যাংশ দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ১০৬টির শেয়ার দাম বেড়েছে। বিপরীতে ৭৩টির দাম কমেছে এবং ৩৩টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। মাঝারি মানের বা ১০ শতাংশের কম লভ্যাংশ দেওয়া ৫০টি কোম্পানির শেয়ার দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ২০টির এবং ১০টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।

বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ না দেওয়ার কারণে ‘জেড’ গ্রুপে স্থান হওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে ৩২টির শেয়ার দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ৫২টির এবং ২৩টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। আর তালিকাভুক্ত মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে সাতটির দাম বেড়েছে এবং সাতটির দাম কমেছে ও ২০টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।

অধিকাংশ বিমা কোম্পানির শেয়ার দাম বাড়ার বিষয়ে ডিএসইর এক সদস্য বলেন, বিমা কোম্পানিগুলোর ২০২৫ হিসাব বছর শেষ হয়েছে। কোম্পানিগুলো এখন এই হিসাব বছরের লভ্যাংশ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে। এ কারণে হয়তো এই খাতে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশের আগ্রহ বেড়েছে। সে কারণে এই দাম বাড়ার প্রবণতা দেখা গেছে। তবে একদিনের দাম বাড়ার চিত্র দেখেই সবকিছু জাজমেন্ট করা ঠিক হবে না।

তিনি বলেন, বাজার এখন অনেক অস্থির আচরণ করছে। তাই বিনিয়োগকারীদের সতর্কতার সঙ্গে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বাজারে এখন বিনিয়োগযোগ্য অনেক শেয়ার রয়েছে। কোম্পানির সার্বিক চিত্র ভালোভাবে পর্যালোচনা করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। ভালো কোম্পানি বাছাই করে বিনিয়োগ করতে পারলে এই বাজার থেকে ভালো মুনাফা পাওয়া সম্ভব।

ডিএসইর অপর এক সদস্য বলেন, আমাদের শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে গুজবে বিনিয়োগ করার একটা প্রবণতা রয়েছে। হঠাৎ একটু দাম বাড়লেই একটি অংশ সেই দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। এতে কিছু বিনিয়োগকারী মুনাফা পেলেও বড় অংশ ধরা খায়। বিনিয়োগকারীদের মনে রাখতে হবে, নিজের বিনিয়োগ নিজেকেই রক্ষা করতে হবে। তাই বিনিয়োগের আগে অবশ্যই বাজার পরিস্থিতি, কোম্পানির আর্থিক চিত্র, অতীত ইতিহাস এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করা উচিত।

তিনি বলেন, বিমা খাতে বেশ কিছু ভালো শেয়ার আছে। তবে সব কোম্পানিই যে ভালো তা কিন্তু নয়। সুতরাং বিনিয়োগকারীদের ভালো শেয়ার বাছাই করে বিনিয়োগ করতে হবে, তাহলে ভালো মুনাফা পাওয়া যাবে। আর ভুল সিদ্ধান্ত নিলে বিনিয়োগ করা পুঁজি হারাতে হবে।

এদিকে দাম বাড়ার তালিকা বড় হওয়ায় ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ১৩ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ২৭১ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। অন্য দুই সূচকের মধ্যে বাছাই করা ভালো ৩০ কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক আগের দিনের তুলনায় দশমিক ১৪ পয়েন্ট বেড়ে ২ হাজার ২ পয়েন্টে অবস্থান করছে। তবে ডিএসই শরিয়াহ সূচক ২ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ৬১ পয়েন্টে নেমে গেছে।

প্রধান মূল্য সূচক বাড়ার পাশাপাশি ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণও বেড়েছে। বাজারটিতে লেনদেন হয়েছে ৮৩৭ কোটি ১০ লাখ টাকা। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় ৭৭৬ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। এ হিসাবে আগের কার্যদিবসের তুলনায় লেনদেন বেড়েছে ৬০ কোটি ২৪ লাখ টাকা।

এই লেনদেনে সব থেকে বড় ভূমিকা রেখেছে খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগের শেয়ার। কোম্পানিটির ৪৬ কোটি ৪৬ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা সিটি ব্যাংকের শেয়ার লেনদেন হয়েছে ৩২ কোটি ৮৮ লাখ টাকার। ২৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেনের মাধ্যমে তৃতীয় স্থানে রয়েছে একমি পেস্টিসাইড।

এছাড়া ডিএসইতে লেনদেনের দিক থেকে শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে—লাভেলো আইসক্রিম, প্যারামাউন্ট টেক্সটাইল, কেডিএস এক্সসরিজ, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ,  ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং, বিডিকম অনলাইন এবং গোল্ডেন সন।

অন্য শেয়ারবাজার সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই বেড়েছে দশমিক ৯৩ পয়েন্ট। বাজারটিতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ১৭৯ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৮০টির দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ৭৮টির এবং ২১টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। লেনদেন হয়েছে ৫৪ কোটি টাকা। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় ১১০ কোটি ৫৭ লাখ টাকা।

এমএএস/এমএমকে