রাজনীতি

একসময়ের নিস্তব্ধ বিএনপি কার্যালয় এখন মুখরিত রাজনৈতিক উৎসবে

রাজধানীর নয়াপল্টনের বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়। একসময় যেখানে ছিল সুনসান নিস্তব্ধতা, আজ সেখানে ফটকের বাইরে দীর্ঘ সারি, ভেতরে ঠাসাঠাসি ভিড় আর চারপাশে ক্যামেরার ঝলকানি। সব মিলিয়ে চারপাশ মুখরিত রাজনৈতিক উৎসবে।

জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির মনোনয়ন ফরম বিতরণকে কেন্দ্র করে কয়েক দিন ধরে এভাবেই বদলে গেছে নয়াপল্টন কার্যালয়ের চিত্র। সেখানে সংসদে যাওয়ার টিকিট সংগ্রহ করতে একদিকে যেমন দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেত্রীরা জড়ো হচ্ছেন, অন্যদিকে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অনেক পরিচিত মুখ আসছেন। এ নিয়ে তৈরি হচ্ছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।

তীব্র প্রতিযোগিতামনোনয়ন ফরম সংগ্রহ ও জমাদানের শেষদিন রোববার (১২ এপ্রিল) দলীয় কার্যালয়ের সামনে দাঁড়ানো এক প্রবীণ নেত্রীর মন্তব্য- এত বছর পর মনে হচ্ছে দলটি আবার নিশ্বাস নিতে শিখেছে। তবে দলের এই নিশ্বাসের মধ্যেই রয়েছে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তীব্র প্রতিযোগিতা। আবার কারও কাছে এটি মনোনয়ন উৎসব। যেখানে দীর্ঘ রাজনৈতিক ত্যাগের পাশাপাশি পরিচিত মুখ ও জনপ্রিয়তাও গুরুত্ব পাচ্ছে। 

শিল্পী বনাম রাজনীতি

নয়াপল্টনে মনোনয়ন ফরম বিতরণকালে উত্তাপ সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে কণ্ঠশিল্পী কনকচাঁপাকে ঘিরে। ফরম নিতে গেলে কিছু নেত্রীর তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়েন তিনি। এ ঘটনাই এখন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

একাংশের ব্যাখ্যা, এ ঘটনা ত্যাগী বনাম তারকা দ্বন্দ্বের প্রতিফলন। অন্যদিকে ভিন্ন মতও আছে। অনেকে মনে করছেন, রাজনীতিতে পরিচিত মুখ আসা নতুন কিছু নয়, বরং এতে ভোটের মাঠে বাড়তি সুবিধাই পাওয়া যায়।

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি

শুধু কনকচাঁপাই নন, এবারের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তালিকায় আরও কয়েকজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের উপস্থিতিও আলোচনায় আছে।

কণ্ঠশিল্পী রিজিয়া পারভীন নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে বলেন, ‘আমি দলীয় সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থাশীল। আজীবন দলের সঙ্গে থাকার দাবি আমার অবস্থানের ভিত্তি।’

অন্যদিকে অভিনেত্রী রিনা খান বলেন, ‘মনোনয়ন দেওয়া না দেওয়া দলের সিদ্ধান্ত, আমি কাজ করে দেখাতে চাই।’

এই দুই বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নতুন প্রশ্ন উঠেছে- এটা কি সত্যিকারের কাজের রাজনীতি, না কি পরিচিতির ওপর দাঁড়ানো নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা।

দুই শিবিরে বিভক্ত মাঠ

দীর্ঘদিনের মাঠকর্মী নেত্রীরা বলছেন, আন্দোলনের কঠিন সময়ে যারা রাজপথে ছিলেন, তাদের উপেক্ষা করা হলে সংগঠনের ভিত দুর্বল হয়ে যেতে পারে। এক নেত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘১৭ বছর রাজপথে ছিলাম। এখন হঠাৎ এসে কেউ লাইনে দাঁড়ালেই সমান হয়ে যাবে?’

এই প্রশ্ন এখন নয়াপল্টনের ভেতরে-বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে বারবার।

রুহুল কবির রিজভীর বার্তা

দলীয় অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, সংগঠন করার দক্ষতা এবং মেধা ও মননশীলতা সব মিলিয়েই একজন প্রার্থী বিবেচিত হবেন বলে তিনি বিশ্বাস করেন।

তবে মাঠের বাস্তবতা ও চাপের মধ্যে এই মানদণ্ড কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ হবে, তা নিয়েই এখন মূল আলোচনা।

সিদ্ধান্তের অপেক্ষা

সব বিতর্ক, ভিড় আর মতভেদের ভেতর একটি বিষয় স্পষ্ট- এই মনোনয়ন প্রক্রিয়া এখন শুধু বিএনপির বিষয় নয়, বরং এটি দেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক ঘটনারও অংশ। যেখানে কে পাবেন টিকিট, কে থাকবেন বাইরে, তা নির্ধারণ করবে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। তার আগে নয়াপল্টনের এই কয়েকদিন তৈরি করেছে নতুন রাজনৈতিক উৎসব।

কেএইচ/একিউএফ