আর মাত্র একদিন পরই পহেলা বৈশাখ। বাঙালির চিরায়ত ঐতিহ্যের অংশ না হলেও এ দিনটিতে অনেকেই পান্তা ভাতের সঙ্গে ইলিশ মাছ রাখতে চান খাবার তালিকায়। পহেলা বৈশাখ ঘিরে ইলিশ নিয়ে মাতামাতিও কম হয় না। তবে বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন। বাংলা বছরের প্রথম দিনে পান্তা-ইলিশ মুখে তোলা এখন বেশ দুরুহ। বিশেষত, সীমিত আয়ের মানুষের জন্য। এর প্রধান কারণ বৈশাখ ঘিরে বাজারে ইলিশের আকাশচুম্বী দাম।
রোববার (১২ এপ্রিল) সন্ধ্যায় রাজধানীর সেগুনবাগিচা আগোরা সুপার শপে গিয়ে দেখা গেলো, এক কেজি সাইজের প্রতিটি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার ৫০০ টাকায়।
সেখানে দাম শুনে হতবাক ক্রেতাদের কেউ কেউ জাগো নিউজকে বলেন, বৈশাখের আগে ইলিশ যে দামে বিক্রি হচ্ছে, তা শুনে যে কারও চোখ চড়কগাছ হয়ে যাবে। মাছটি এখন গরিবের দূরের কথা, মধ্যবিত্তেরও নাগালের বাইরে চলে গেছে।
আবু আলী নামের এক ক্রেতা বলেন, ভেবেছিলাম সাধ্যের মধ্যে হলে একটা ইলিশ নেবো; বাচ্চারা জেদ ধরেছে বৈশাখে ইলিশ খাবে। কিন্তু এখানে এসে দাম শুনে হতবাক হয়ে গেছি।
আগোরায় বিক্রয় প্রতিনিধি মেহেদী হাসান জানান, বড় ইলিশ একদম পাওয়া যাচ্ছে না। যে কারণে দাম বেশি।
এদিন আগোরায় ৭০০ গ্রাম ওজনের প্রতিটি ইলিশ ২ হাজার ২০০ টাকা, ৫০০ গ্রামের ইলিশ ১ হাজার ২০ টাকা ও ৩০০ গ্রামের ইলিশ ৩৮০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, শুধু আগোরা নয়, অন্য সুপারশপগুলোতেও ইলিশের দাম চড়া। একই ঊর্ধ্বমুখী ভাব দেখা গেছে ঢাকার বিভিন্ন বাজারে।
খিলগাঁও রেলগেট বাজারে দেখা গেছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সেখানে এক কেজি ওজনের ইলিশ ৩ হাজার ৭০০ থেকে ৪ হাজার টাকা দাম চাচ্ছিলেন বিক্রেতারা। এছাড়া ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার টাকা ও ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা কেজি হাঁকছেন বিক্রেতারা।
ওই বাজারে ৩০০ গ্রাম বা এর চেয়ে কম ছোট ইলিশ মিলছে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা কেজি। এটিই সর্বনিম্ন দাম। এসব ইলিশ কেজিতে তিন থেকে চারটি পাওয়া যাচ্ছে।
আবার মালিবাগ বাজারে ইলিশের দাম খিলগাঁওয়ের চেয়ে আরও ১০০ থেকে ২০০ টাকা বেশি মনে হয়েছে। এমন কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মাছের আকারভেদে দামের ব্যাপক পার্থক্যও রয়েছে।
মালিবাগ বাজারে বিক্রেতা বিজয় বলেন, আসলে পহেলা বৈশাখ ঘিরে এখন যে পরিমাণ চাহিদা, সে তুলনায় ইলিশের সরবরাহ অনেক কম। যে কারণে দাম বেশি।
এদিকে, বাজারেও অনেককে ইলিশের দাম শুনে ফিরে যেতে দেখা গেছে। মল্লিকা ইয়াসমিন নামের এক ক্রেতা জাগো নিউজকে বলেন, সবারই ইচ্ছে থাকে বৈশাখে একটু পান্তা-ইলিশ খেতে। কিন্তু কয়েকদিন বাজারে এলেও সাধ্যের মধ্যে ইলিশ পাইনি। দিন দিন দাম বাড়ছে। আজও ফিরে যাচ্ছি। আজ দাম আরও বেশি মনে হচ্ছে।
ক্রেতারা বলছেন, বৈশাখ আসার আগেই গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে রাজধানীর বাজারগুলোতে ইলিশের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। শেষ মুহূর্তে সেটা চরম আকার ধারণ করেছে, যা বেশিরভাগ মানুষের সাধ্যের বাইরে। সাধারণ মানুষের দাবি, উৎসবের আমেজ ধরে রাখতে বাজার মনিটরিং আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
ইলিশ না কিনতে পেরে ক্রেতাদের অনেককে ক্ষোভ প্রকাশ করতেও দেখা যায়। মুনমুন নামের একজন বলেন, বৈশাখ এলেই এ সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু এসব সরকার দেখে না। বাজার তদারকি হয় ‘নামকাওয়াস্তে’। আজ ইলিশ কিনতে এসে মনে হচ্ছে স্বর্ণ কিনতে এসেছি।
বিক্রেতারাও বলছেন, গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে ইলিশের দাম কেজিপ্রতি বেড়েছে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা। খিলগাঁও বাজারে মাছ বিক্রেতা ফারুক হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, আড়ত থেকেই তাদের চড়া দামে মাছ কিনতে হয়েছে। বৈশাখ ঘিরে বাজারে প্রচুর চাহিদা, কিন্তু এবার নদীতে মাছ ধরা পড়ছে কম। তার ওপর জাটকা ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
‘সরবরাহ কম থাকায় আড়তদাররা দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। আমরা বেশি দামে কিনে কম দামে তো আর বেচতে পারি না’—বলেন এ বিক্রেতা।
এনএইচ/এমকেআর