ছোঁয়াচে ব্যাধি হামের সংক্রমণে শিশুদের আক্রান্ত ও মৃত্যু ঘিরে সারাদেশে উদ্বেগ বেড়েই চলেছে। প্রতিদিনই দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুদের ভিড় বাড়ছে। চিকিৎসকরা উপসর্গের ভিত্তিতে হামে আক্রান্ত সন্দেহে অনেককে হাসপাতালে ভর্তি করছেন। ভর্তিদের মধ্যে কেউ কেউ মৃত্যুবরণও করছে। তবে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় নিশ্চিত না হলেও ‘হাম সন্দেহে’ ভর্তি হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই এসব মৃত্যুকে প্রাথমিকভাবে হামের মৃত্যু হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।
হাম পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে এসেছে—সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা এবং নিশ্চিত সংক্রমণের মধ্যে রয়েছে বড় ব্যবধান। একই সঙ্গে সুস্থতার হার আশাব্যঞ্জক হলেও মৃত্যুর সংখ্যা এবং নতুন রোগী শনাক্তের প্রবণতা পরিস্থিতিকে এখনো উদ্বেগমুক্ত হতে দিচ্ছে না।
সন্দেহজনক বনাম নিশ্চিত: বড় ব্যবধানগত ১৫ মার্চ থেকে ১২ এপ্রিল সকাল ৮টা পর্যন্ত মোট ১৫ হাজার ৬৫৩ জনকে সন্দেহজনক হাম রোগী হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় হাম নিশ্চিত হয়েছে ২ হাজার ৬৩৯ জন। অর্থাৎ, প্রায় ১৬ দশমিক ৮৬ শতাংশ রোগীর হাম শনাক্ত হয়েছে। প্রায় ৮৩ দশমিক ১৪ শতাংশ রোগী উপসর্গ নিয়ে এলেও তারা হামে আক্রান্ত নয়।
আরও পড়ুনচট্টগ্রামে আরও ১ জনের হাম শনাক্ত, হাসপাতালে ভর্তি ২১হামের লক্ষণ শুরু হলে কী করবেন?
জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, এই ব্যবধান ইঙ্গিত দেয় যে দেশে হামসদৃশ উপসর্গযুক্ত অন্যান্য ভাইরাল সংক্রমণও ছড়িয়ে থাকতে পারে। কিন্তু সরকারি প্রতিবেদনে রুবেলা, চিকেন পক্স বা অনুরূপ রোগের কোনো উল্লেখ না থাকায় প্রকৃত রোগ চিত্র কিছুটা অস্পষ্ট থেকে যাচ্ছে।
মৃত্যুতেও একই ধারামৃত্যুর ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। মোট ১৫১ জন সন্দেহজনক হাম রোগীর মৃত্যু হলেও নিশ্চিতভাবে হামের কারণে মৃত্যু হয়েছে মাত্র ২৮ জনের। বাকি ১২৩ জনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম ও রুবেলার উপসর্গ অনেকাংশে এক হওয়ায় ল্যাবরেটরি পরীক্ষা ছাড়া নির্ভুলভাবে রোগ শনাক্ত করা কঠিন। ফলে নিশ্চিত নয় এমন মৃত্যুগুলোর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান জরুরি।
সুস্থতার হার আশাব্যঞ্জকহাসপাতালভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে কিছুটা স্বস্তির চিত্র পাওয়া যায়। মোট ১০ হাজার ২২৫ জন ভর্তি রোগীর মধ্যে ৭ হাজার ৬৫৬ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন, যা প্রায় ৭৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। তবে মোট সন্দেহজনক ১৫ হাজার ৬৫৩ জন রোগীর তুলনায় এই হার প্রায় ৪৮ দশমিক ৯১ শতাংশ।
আরও পড়ুনরামেক হাসপাতালে হামের উপসর্গে আরও এক শিশুর মৃত্যুহাম ও হামের উপসর্গে দুইজনের মৃত্যু
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক রোগী হাসপাতালে ভর্তি না হয়ে বাড়িতেই চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হচ্ছে, যা এই পরিসংখ্যানে প্রতিফলিত হয়নি।
বিভাগভিত্তিক চিত্র: ঢাকায় চাপ সবচেয়ে বেশিপরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশের হাম পরিস্থিতির কেন্দ্রবিন্দু এখন ঢাকা বিভাগ। এই বিভাগে হামে আক্রান্ত হয়ে সর্বোচ্চ ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। সন্দেহজনক হাম রোগে মারা গেছে সর্বোচ্চ ৬৪ জন। নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৪৭৩ জন। সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ৬ হাজার ৬৫৮ জন।
হামে আক্রান্ত হয়ে সারা দেশে মোট নিশ্চিত মৃত্যুর অর্ধেকের বেশি এবং সন্দেহজনক মৃত্যুরও বড় অংশ ঢাকা বিভাগেই ঘটেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে উচ্চ জনঘনত্ব, সারা দেশ থেকে রোগীর ঢাকায় রেফারাল এবং উন্নত রিপোর্টিং ব্যবস্থার প্রভাব থাকতে পারে।
অন্যান্য বিভাগের চিত্ররাজশাহী: রাজশাহী বিভাগে সন্দেহজনক হাম রোগী ২ হাজার ৯৩১ জন। হাম নিশ্চিত হয়েছে ৭৮০ জনের। নিশ্চিত হামে মারা গেছে ৩ জন। সন্দেহজনক হাম রোগে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৬২ জন মারা গেছে।
চট্টগ্রাম: এই বিভাগে সন্দেহজনক হাম রোগী ২ হাজার ১৫০ জন। হাম নিশ্চিত হয়েছে ১৭৪ জনের। হাম আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৩ জন। সন্দেহজনক হাম রোগে মারা গেছে ১০ জন।
খুলনা: খুলনা বিভাগে সন্দেহজনক হাম রোগী ১ হাজার ২৬৮ জন। হাম নিশ্চিত হয়েছে ৬৩ জনের। সন্দেহজনক হাম রোগে মারা গেছে ১০ জন। এই বিভাগের কেউ নিশ্চিত হাম রোগে মারা যায়নি।
সিলেট: সিলেট বিভাগে সন্দেহজনক হাম রোগী ৬৯৩ জন। হাম নিশ্চিত হয়েছে ৪২ জনের। সন্দেহজনক হাম রোগে মারা গেছে ৩ জন। এই বিভাগের কেউ নিশ্চিত হাম রোগে মারা যায়নি।
রংপুর: রংপুর বিভাগে সন্দেহজনক হাম রোগী ৫৮৭ জন। হাম নিশ্চিত হয়েছে ১৪ জনের। নিশ্চিত হামে বা সন্দেহজনক হাম রোগে কারও মৃত্যু হয়নি।
বরিশাল: বরিশাল বিভাগে সন্দেহজনক হাম রোগী ৯৮৪ জন। হাম নিশ্চিত হয়েছে ৭৩ জনের। হাম আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৫ জন। সন্দেহজনক হাম রোগে মারা গেছে ২ জন।
ময়মনসিংহ: ময়মনসিংহ বিভাগে সন্দেহজনক হাম রোগী ৩৮২ জন। হাম নিশ্চিত হয়েছে ২০ জনের। হাম আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ২ জন। সন্দেহজনক হাম রোগে কারও মৃত্যু হয়নি।
কী বলছে এই পরিসংখ্যান?এই তথ্য থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা স্পষ্ট হয়, হামসদৃশ অন্যান্য রোগের উপস্থিতি থাকতে পারে, যা আলাদাভাবে শনাক্ত করা জরুরি। ল্যাবরেটরি সক্ষমতা ও রোগ নির্ণয় প্রক্রিয়া আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
আরও পড়ুনটাঙ্গাইলে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি ১৪ জনহামে আক্রান্ত হয়ে আরও দুই মৃত্যু, নতুন রোগী ৭৮৭
ঢাকায় স্বাস্থ্যসেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ পরিস্থিতিকে জটিল করছে। সন্দেহজনক মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ণয় না হওয়া বড় উদ্বেগের বিষয়।
সুস্থতার হার আশাব্যঞ্জক হলেও মৃত্যুর সংখ্যা, সন্দেহজনক রোগীর আধিক্য এবং নতুন সংক্রমণের প্রবাহ ইঙ্গিত দেয়—পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন সবচেয়ে জরুরি হলো দ্রুত ও নির্ভুল রোগ শনাক্তকরণ বিকল্প রোগগুলোর ওপর নজরদারি, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টিকাদান জোরদার এবং তথ্যের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি। নয়তো পরিসংখ্যানে থাকা এই ‘ফারাক’ ভবিষ্যতে বড় জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রূপ নিতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মুশতাক হোসেন হামের সার্বিক পরিস্থিতি এবং এর শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া নিয়ে জাগো নিউজকে বলেন, শিশুদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ‘হার্ড ইমিউনিটি’ তৈরি হতে সময় লাগে। টিকা দেওয়ার পর বা আক্রান্ত হওয়ার পর উপযুক্ত স্তরের ইমিউনিটি তৈরি হতে সাধারণত তিন থেকে চার সপ্তাহ বা ন্যূনতম এক মাস সময় প্রয়োজন হয়।
বর্তমানে হামের ক্ষেত্রে ‘সন্দেহজনক’ রোগীর সংখ্যা বেশি এবং ‘নিশ্চিত’ রোগীর সংখ্যা কম হওয়ার কারণ প্রসঙ্গে ড. মুশতাক বলেন, যদিও ক্লিনিক্যালি বা লক্ষণ দেখে এগুলো হাম হিসেবে শনাক্ত করা যায়, কিন্তু দাপ্তরিক বা অফিসিয়াল সংজ্ঞার কারণে ল্যাব পরীক্ষার আগে এদের ‘নিশ্চিত’ বলা হয় না।
আরও পড়ুনহাম ও উপসর্গ নিয়ে আরও ১০ জনের মৃত্যুহামের উপসর্গ নিয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেলে আরও দুই শিশুর মৃত্যু
তিনি বলেন, হাম নিশ্চিত শনাক্ত করার জন্য আরটি-পিসিআর বা আইজিএম পরীক্ষা করা হয়। তবে সব রোগীর ক্ষেত্রে এই পরীক্ষা করা সম্ভব হয় না বলে অনেক সময় শুধু লক্ষণ দেখেই চিকিৎসা দেওয়া হয়।
ড. মুশতাক হোসেনের মতে, আগে সন্দেহজনক রোগীর তথ্য সঠিকভাবে দেওয়া হতো না, কিন্তু বর্তমানে বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা ও লক্ষণের ভিত্তিতে এই তথ্যগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল ১২ এপ্রিল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় হাম ও রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে বর্তমান হাম পরিস্থিতি মোকাবিলায় চলমান টিকাদান কর্মসূচি চলাকালে শিশুদের হামের টিকা প্রদান নিশ্চিতের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
এমইউ/এমআরএম/এমএমএআর