পহেলা বৈশাখ বাঙালির সবচেয়ে বড় সার্বজনীন উৎসব। বড়দের পাশাপাশি শিশুদের জন্যও এই দিনটি নিয়ে আসে দারুণ উত্তেজনা। একসময় বৈশাখী মেলা মানেই ছিল শিশুদের কাছে মাটির পুতুল, কাঠের ঘোড়া বা বাঁশের বাঁশির এক জাদুকরি জগৎ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্লাস্টিকের খেলনা আর ভিডিও গেমের ভিড়ে আমাদের দেশজ খেলনাগুলো যেন কিছুটা জৌলুস হারাচ্ছে।
এখনকার শিশুরা রিমোট কন্ট্রোল গাড়ি যতটা চেনে, বাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলনা টমটম সহ খেলনাগুলোর সঙ্গে তাদের পরিচয় ততটা নেই। এবারের নববর্ষে শিশুদের নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়া যেতে পারে এই ঐতিহ্যবাহী খেলনাগুলোর সঙ্গে। তাদের হাতে তুলে দেওয়া যেতে পারে মাটির তৈরি নানা পুতুল আর রঙিন কাঠের ঘোড়া।
মাটির পুতুলের জাদুকরি জগৎবৈশাখী মেলার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো মাটির তৈরি টেপা পুতুল। কারিগরদের নিপুণ হাতে তৈরি এসব পুতুলে খুব সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের প্রতিচ্ছবি। বউ পুতুল, কৃষক, জেলে বা নানা রকম পশুপাখির আকৃতিতে তৈরি এসব পুতুল শিশুদের কল্পনার জগৎকে আরও বিস্তৃত করে। বিদেশি প্লাস্টিকের সুপারহিরোদের চেয়ে এই সাধারণ মাটির পুতুলগুলো শিশুদের শেখায় কীভাবে চারপাশের সাদামাটা জীবনের মাঝেও গল্প লুকিয়ে থাকে। একটি মাটির পুতুল হাতে নিয়ে শিশু যখন নিজের মতো করে গল্প বানায়, তখন তার সৃজনশীলতা অন্য যে কোনো যান্ত্রিক খেলনার চেয়ে অনেক বেশি বিকশিত হয়। এই পুতুলগুলো শুধু খেলার সামগ্রী নয়, এগুলো আমাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
রঙিন কাঠের ঘোড়া ও তালপাতার সেপাইলাল, নীল, হলুদ, সবুজ রঙে রাঙানো কাঠের ঘোড়া দেখলে আজও অনেক বড় মানুষের নিজের সোনালি শৈশবের কথা মনে পড়ে যায়। চাকার ওপর দাঁড় করানো এই কাঠের ঘোড়া সুতোয় বেঁধে টেনে নিয়ে যাওয়ার যে নির্মল আনন্দ, তা আজকের দামি রিমোট কন্ট্রোল গাড়িতে খুব একটা পাওয়া যায় না। কাঠের ঘোড়ার পাশাপাশি মেলার আরেক আকর্ষণ বাঁশের বাঁশি বা তালপাতার সেপাই। শিশুদের জন্য এগুলো শুধু খেলনা নয়, বরং নিজের সংস্কৃতিকে চেনার একটি দারুণ মাধ্যম। বাঁশির শব্দ আর কাঠের ঘোড়ার চাকার আওয়াজ শিশুর মনে যে আনন্দময় স্মৃতি তৈরি করে, তা মোবাইল স্ক্রিনের কোনো গেমে পাওয়া একেবারেই অসম্ভব।
আধুনিক যুগের প্লাস্টিকের খেলনাগুলোতে অনেক সময়ই ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান থাকে, যা শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হতে পারে। অন্যদিকে মাটি, কাঠ বা বাঁশের তৈরি খেলনাগুলো সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও পরিবেশবান্ধব। এগুলো নষ্ট হয়ে গেলে বা ফেলে দিলেও প্রকৃতির কোনো ক্ষতি হয় না, খুব সহজেই মাটির সঙ্গে মিশে যায়। প্রকৃতির কাছাকাছি থেকে বেড়ে ওঠার যে আনন্দ, এসব খেলনা শিশুদের অবচেতনভাবেই সেই অনুভূতি দেয়। পরিবেশ রক্ষার প্রাথমিক শিক্ষাও তারা পেতে পারে এসব প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি খেলনার মাধ্যমে।
শেকড়ের সঙ্গে পরিচয়নাগরিক ব্যস্ততায় আমরা হয়তো শিশুদের সবসময় গ্রামে নিয়ে যেতে পারি না। তবে শহরের যে কোনো ছোট-বড় বৈশাখী মেলা থেকে একটি মাটির পুতুল বা কাঠের ঘোড়া কিনে দিয়ে তাদের খুব সহজেই পরিচয় করিয়ে দিতে পারি আমাদের নিজস্ব লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে। এর মাধ্যমে আমাদের দেশীয় কারুশিল্পীরা যেমন বেঁচে থাকার এবং কাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা পাবেন, তেমনি নতুন প্রজন্মও জানবে তাদের নিজস্ব শেকড়ের কথা। দেশীয় কারিগরদের এই চমৎকার শিল্প বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার।
এবারের বৈশাখ আমাদের শিশুদের জন্য হয়ে উঠুক আরও বেশি আনন্দময় এবং ঐতিহ্যে ভরপুর। মেলা থেকে কেনা একটি ছোট্ট মাটির পুতুল বা কাঠের ঘোড়াই হয়তো আপনার সন্তানের মনে বুনে দেবে দেশপ্রেম ও সংস্কৃতির প্রথম বীজ। আসুন, এই চমৎকার বৈশাখে শিশুদের হাতে তুলে দিই আমাদের শেকড়ের অমূল্য স্মৃতি, তাদের আগামীর শৈশব হোক আরও সুন্দর, রঙিন ও খাঁটি।
আরও পড়ুননববর্ষ ও বর্ষ গণনার একাল-সেকালচৈত্রসংক্রান্তি: মর্মান্তিক ইতিহাস-হারিয়ে যাওয়া বাংলার উৎসব
কেএসকে