নববর্ষ ও বর্ষ গণনার একাল-সেকাল

ড. মো. ফোরকান আলী
ড. মো. ফোরকান আলী ড. মো. ফোরকান আলী , গবেষক ও সাবেক অধ্যক্ষ
প্রকাশিত: ০৮:৫০ এএম, ১৪ এপ্রিল ২০২৬
বর্তমান বিশ্বের যতগুলো অব্দ বিদ্যমান তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেশে প্রচলিত হলো খ্র্রিস্টাবাদ

 

নববর্ষ বলতে বোঝায় নতুন বছর বা বছরান্তকে। পৃথিবীর সবদেশে এবং সব জাতির মাঝেই নববর্ষ পালন রীতি বিদ্যমান। তেমনি ইউরোপ-আমেরিকায় বিশেষ করে খ্র্রিস্টান দেশসমূহে পালিত নববর্ষের নাম ‘নিই ইয়ার্স ডেম্ব’। ইংরেজি নববর্ষ এখন বিশ্বের প্রায় সব দেশেই নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদযাপন করা হয়। প্রতি বছর ৩১ ডিসেম্বর রাত ১২টা এক মিনিটে ইংরেজি নববর্ষ বরণ করা হয়। খ্র্রিস্টান বিশ্বের এ দিন সরকারি ছুটি পালিত হয়। অবিরাম গতিতে ছুটে চলা সময়ের চাকা ঘুরে ঘুরে আবারও আমাদের সামনে নিয়ে এসেছে ইংরেজি নববর্ষকে। তাই নববর্ষের সাত-সতেরো নিয়ে আমাদের এ আয়োজন।

খ্র্রিস্টাব্দের জন্মকথা

বর্তমান বিশ্বের যতগুলো অব্দ বিদ্যমান তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেশে প্রচলিত হলো খ্র্রিস্টাবাদ। ৫৩০ খ্র্রিস্টাব্দে দিউনিসউথ প্রথম এ অব্দের প্রচলন  করেন। তখন ২৫ ডিসেম্বর থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত (খ্র্রিস্টাব্দে) বছরের প্রথম দিনটি পড়ত। বর্তমান বিশ্বের অধিকাংশ দেশে জানুয়ারি ১ তারিখকে নববর্ষ হিসেবে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে।

জানুয়ারি থেকে বছর গণনা

৪৫১ অব্দে রোমের শাসনকার্য চালাতো ১০ জন ম্যাজিস্ট্রেটের একটি পরিষদ, যা দিসেসভিরস’ নামে পরিচিত ছিল। এ পরিষদই প্রথম’ মার্চের পরিবর্তে জানুয়ারি থেকে বছর গণনা শুরু করার নির্দেশ দেন। এ পদ্ধতিটি চালু হতে সময় লাগলেও পৃথিবীর সব দেশই পরবর্তীতে এ পদ্ধতি গ্রহণ করে।

jagonews

ইংরেজি ১২ মাস

পন্ডিত পন্ডিফোরাই ৭৫৬ অব্দে ক্যালেন্ডার আবিষ্কার করেন। চাষাবাদের ওপর ভিত্তি করে এ ক্যালেন্ডার পস্তুত করা হয় বলে এতে মাসের সংখ্যা ছিল ১০। ১০ মাসের ক্যালেন্ডারে দিনের সংখ্যা ছিল ৩০৪ এবং বছর শুরু হতো মার্চ মাস থেকে। রোমান রাজা নুমাপাম পিলিয়াস ৭০০ অব্দে ঐ ক্যালেন্ডারে জানুয়ারিয়াস এবং ফেব্রুয়ারিয়াস দুটি মাস সংযুক্ত করেন এবং কিছু কিছু মাসের দিনের সংখ্যাও পরিবর্তন করেন। ফলে মাসের সংখ্যা দাঁড়ায় ১২।

মাসের নামকরণ

প্রাচীন রোমানদের হাতে ক্যালেন্ডারের জন্ম এবং বিকাশ লাভ করেছে। ফলে বারটি মাসের বেশির ভাগই রোমান দেবতা বা সম্রাটদের নামে নামকরণ করা হয়েছে। যেমন-

  • জানুয়ারি:রোমান দেবতা জানো’স এর নামানুসারে। জানোস অর্থ দু’টি মুখ। জুলিয়াস সিাজরের সংস্কারের পূর্ব পর্যন্ত জানুয়ারি মাস ছিল ২০ দিন (বর্তমানে ৩১ দিন)
  • ফেব্রুয়ারি: ল্যাটিন শব্দ ফেব্রæয়া থেকে নামকরণ করা হয়েছে। ফেব্রুয়া অর্থ হলো পবিত্র।
  • মার্চ: রোমান দেবতা মার্স- এর নামানুসারে। মার্স হলো রোমানদের যুদ্ধের দেবতা। মার্চ ছিল রোমানদের বর্ষ শুরুর মাস।
  • এপ্রিল: ল্যাটিন এপ্রিলিস থেকে এর নামকরণ হয়েছে।
  • মে: বসন্তের দেবী মায়া’স এর নামানুসারে নামকরণ হয়েছে।
  • জুন: বিবাহ এবং নারীদের কল্যাণের দেবী জুনোর নামানুসারে।
  • জুলাই: এটি জুলিয়াস সিজার’স মাস। জুলিয়াস সিজার ৪৬ অব্দে রোমান ক্যাল্ডোর সংস্কার করেন এবং তার নামানুসারে জুলাই মাসের নামকরণ করা হয়।
  • আগস্ট: জুলিয়াস সিজারের পুত্র আগাস্টাস সিজারের নামনুসারে।
  • সেপ্টেম্বর: ল্যাটিন সংখ্যা সপ্তম (ল্যাটিন সেপ্টেম-সেভেন+বার) থেকে নামকরণ হয়েছে। 
  • অক্টোবর: ল্যাটিন সংখ্যা অষ্টম থেকে অক্টোবর মাসের নামকরণ করা হয়েছে।
  • নভেম্বর: ল্যাটিন সংখ্যা নবম (নভেমব্রিস) থেকে নামকরণ করা হয়েছে।
  • ডিসেম্বর: ল্যাটিন শব্দ ডিসেম+দশম+বার থেকে ডিসেম্বর শব্দের উৎপত্তি।

লিপইয়ারের প্রচলন

লিপইয়ারের প্রচলন হয় রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজারের শাসনামল থেকে। জুলিয়াস সিজার আলেকজেন্দ্রিয়া থেকে গ্রিক জ্যোতির্বিদ মোসাজিনিসকে নিয়ে আসেন ক্যালেন্ডার সংস্কারে জন্য। মোসাজিনিস দেখতে পান পৃথিবী সূর্যের চারদিকে প্রদক্ষিণে সময় নেয় ৩৫৬ দিন ৬ ঘণ্টা। ৩৬৫ দিনে বছর হিসাব করা হলে এবং প্রতি চতুর্থ বছরে ৩৬৬ দিনে বছর হিসাব করা হলে কোনো গরমিল থাকে না। মোসাজিনিস অতিরিক্ত একদিন যুক্ত এ বছরটির নামকরণ করেন ‘লিপইয়ার’।

সময়ের বিবর্তনে আমরা এখন ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের শেষে দাঁড়িয়ে। মানব জাতির সৃষ্টির সূচনা থেকে সময় নিরূপণের জন্য অব্দ বা বর্ষ গণনার প্রচলন হয়। সব যুগে একই ধরনের বর্ষ গণনা পদ্ধতি না থাকলেও কোনো না কোনো ধরনের বর্ষ গণনার পদ্ধতি সব যুগেই চালু ছিল। এ সব অব্দ বা বর্ষ গণনার ধারাবাহিকতায় বর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন নামে বর্ষ গণনা করা হয়ে থাকে। এসব বর্ষে মধ্যে কোনটি আর্ন্তজাতিকভাবে, কোনটি অঞ্চল বিশেষে এবং কোনটি দেশ বা জাতি ভিত্তিক। কেবল খ্রিস্টাব্দ ও হিজরি সাল বিশ্বব্যাপী প্রচলিত। আর অন্যান্য যত অব্দ বা বর্ষ চালু আছে তা দেশ বা জাতিকেন্দ্রীক। অবশ্য পূর্বে প্রচলিত বহু অব্দের নাম জানা যায় যা এখন আর চালু নেই। ২০২৫ সালে পদার্পণ উপলক্ষে বিশ্বে প্রচলিত খ্রিস্টাব্দ ও হিজরী অব্দসহ অন্যান্য অব্দ বা বর্ষের পরিচিতি উপস্থাপন করা হলো- 

  • খ্রিস্টাব্দ- পৃথিবীর সর্বত্র খ্রিস্টাব্দ বহুল প্রচলিত। দিওনিসিউস্ এক্সিগিউয়ুস ৫৩০ থ্রিস্টাব্দে এর প্রথম প্রচলন করেন।
  • খ্রিস্টাব্দ গণনার সূচনা-হযরত ঈসা আ. (খ্রিস্ট মতে যিশু খ্র্রিস্টের) এর জন্মের বছর থেকে। পরে জানা যায় যে বছর খ্রিস্টাব্দ গণনা করা হয়, যিশু সম্ভবত তার ৪ বছর আগে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।
  • খ্রিস্টাব্দাদের প্রসার-১৪০০ সালের আগে খ্রিস্টাব্দদের প্রচলন ছিল সীমিত এলাকায়। পঞ্চদশ শতাব্দীতে খ্রিস্ট অধ্যুষিত দেশগুলো এ রীতি গ্রহণ করে।
  • বছরের প্রথম দিন-বর্তমানে  প্রথম দিন ১ জানুয়ারি। এর আগে বছরের প্রথম দিনটি ডিসেম্বরের ২৫ থেকে ২৫ মার্চ তারিখের মধ্যে বিভিন্ন দিনে পড়ত।
  • মাস সংখ্যা-১২
  • বছর হয়-৩৬৫ দিনে। প্রতি চতুর্থ বছরে অধিবর্ষ বা লিপইয়ার হয় ৩৬৬ দিনে বছর। 
  • দিবসের শুরু-রাত ১২টার পর থেকে।

jagonews

হিজরি সন

বিশ্বের সব দেশে হিজরি সন প্রচলিত। এটি মুসলমানদের ধর্মীয় সন। কারণ রোযা, হজ¦, উমরা, কুরবানী, ঈদের নামাযসহ প্রভৃতি বিধান হিজরি সন অনুযায়ী পালিত হয়। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) হিজরতের বছরকে ভিত্তি ধরে হিজরি সনের প্রচলন করা হয়। সূচনা হয় হযরত উমর (রা:) সময় থেকে। মুহররমকে বছরের প্রথম মাস হিসেবে ধরা হয়। হিজরি সনের শুরু ধরা হলো ঠিক হিজরতের দিন থেকে নয়। তার পরিবর্তে ঐ বছরের ১ মুহররম থেকে। প্রথম দিনটি ছিল শুক্রবার ১৬ জুলাই ৬২২ খ্রিস্টাব্দ।

খলিফা উমর (রা) ৬৩৮-৩৯ খ্রিস্টাব্দে এ অব্দের প্রচলন করেন। হিজরি সন হচ্ছে চন্দ্রবর্ষ। দিনের শুরু হয় সূর্যাস্ত থেকে।

হিজরি বার মাসের নাম-মুহররম, সফর, রবিউল আউয়াল, রবিউস সানি, জমাদিউল আউয়াল, জমাদিউস সানি, রজব, শাবান, রমজান, শাওয়াল, জিলকদ ও জিলহজ্জ্ব।

সমময় গণনা করা হয় সূর্যাস্তের পর থেকে। হিজরি সনে বছর হয় ৩৫৪ দিনে। নববর্ষের প্রথম দিন ১ মুহররম। সপ্তাহের দিনের নাম-ইয়াওমুস সাবত ইয়াওমুল আহাদ, ইয়াত্তমুল ইসনাইন, ইয়াওমুস ছালাছা, ইয়াওমুল আরবায়া, ইয়াওমুল খামসা ও ইয়াওমুল জুম’য়া।

অব্দ সূচনাকাল

কল্যাব্দ ৩১০২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। মিশরীয় অব্দ ৪২৩৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। যুধিষ্ঠিরাব্দ ২৪৪৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। বুদ্ধাব্দ ৫৪৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। বিক্রমসংবৎ ৫৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। শকাব্দ ৭৮ খ্রিস্টাব্দ। ইলাহী সন ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে। কলচুরি অব্দ ২৪৮-৪৯ খ্রিস্টাব্দ । গুপ্তাব্দ ৩১৯ খ্রিস্টাব্দ। হর্ষাব্দ ৬০৬ খ্রিস্টাব্দ। ভাটিক অব্দ ৬২৪ খ্রিস্টাব্দ। রোমাক অব্দ ৭৩৮ খ্রিস্টাপূর্বাব্দ। গ্রিক অব্দ ৭৭৬ খ্রিস্টাপূর্বাব্দে। মাঘাব্দ ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দ। ব্রহ্মাব্দ ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দ। নেওয়ার অব্দ ৮৭৯ খ্রিস্টাব্দ। 

বিভিন্ন দেশে বর্তমানে প্রচলিত

বর্ষ-বাংলাদেশ: বঙ্গাব্দ ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে। ইরান: নওরোজ ৮০০ খ্রি. পূর্বাব্দে। ইসরাইল: হিব্রু ৩৭৬১ খ্রি. পূর্বাব্দে। জাপান: জাগানিজ ইয়ার ৬৬১ খ্রিস্টাব্দে। চীন: চায়না ইয়ার  ৭৪০ খ্রিস্টাব্দে। বিশ্বব্যাপী খ্রিস্টাব্দ ৫৩০ খ্রিস্টাব্দে। বিশ্বব্যাপী হিজরি ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে থেকে প্রচলন হয়ে আসছে।

দেশ ও নববর্ষ

স্কটল্যান্ড: হগমানে। কম্বোডিয়া: চৌল চেয় থে। ইরান: নওরোজ। ভিয়েতনাম: টেট নরেন দা। স্পেন:    এনো নুয়েভো। আমেরিকা: নিউ ইয়ার। ভারত: দিওয়ালি। ওয়েলস: নসগালাম। বাংলাদেশ: পহেলা বৈশাখ।

 তথ্যসূত্র: বিবিসি ও উইকিপিডিয়া

 

কেএসকে

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।