রাতে গুলির শব্দে ঘুম ভাঙ্গে আড়াই বছর বয়সি জয়িতার। সারা রাত আর ঘুমাতে পারেনি। শুধু কেঁদেছে। বুধবার যখন বাসায় গিয়ে কথা হয় তার মা ও ফুফাতো বোনের সঙ্গে। তখনও দেখা যায় জয়িতার চোখে মুখে আতঙ্কের ছাপ।গত সোমবার রাত সাড়ে ১২টায় রাজধানীর কল্যাণপুরের ৫নং রোডের জাহাজ বিল্ডিংয়ের (তাজ মঞ্জিল) পঞ্চম তলায় ছিল জঙ্গিদের আস্তানা। ওই বাসার বিপরীত পাশের বাসাটির পঞ্চম তলার বাসিন্দা মাহিলা হক প্রমি। এইচএসসি পরীক্ষার পর এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি জানান, সোমবার রাতে আমার নানীর চিকিৎসার জন্য বাসায় আসেন দুই মামা, মামী। বাসায় ছিলেন বাবা-মা, দুই ভাই, ভাবি ও ছোট তিনটি বাচ্চা।রাত আনুমানিক ১২টা ৫ মিনিটের দিকে বাসার নিচে চেচামেচি। চিৎকারে মনে হলো নিচে চোর ধরা পড়েছে। কিন্তু বেলকুনিতে গিয়ে দেখি পুলিশ বলছে, ‘ওই যে দৌড় দিছে, ওয়াল ডিঙ্গাচ্ছে। ওই সময় দৌড়াদৌড়ির দৃশ্য দেখে মনে হয়নি জঙ্গি কোনো ঘটনা।’মাহিলা বলছিলেন, ১২টা ১৫ মিনিটের দিকে আল্লাহু আকবর ধ্বনি শোনা যায়। তখনই গুলশানের হামলাকারীদের কথা মনে পড়ে। পুলিশও পেছন থেকে গুলি ছুড়ে। পরে বুঝতে পারি শুরুতেই গলির মুখে পালাতে গিয়ে গুলিতে আহত হয় হাসান নামে বগুড়ার ওই জঙ্গি সদস্য। এরপর থেমে থেমে গুলির শব্দ চলে রাত ৩টা পর্যন্ত।তিনি বলেন, গোলাগুলির এতো শব্দ যেন মনে হচ্ছে আমাদের বাসায় এটি ঘটছে। ওই বাসা থেকে চার হাত দূরত্ব থাকায় বারান্দায় যাওয়ার সাহসই করতে পারিনি। গোলাগুলির শব্দে রাতেই ঘুম ভাঙ্গে মামাতো বোন জয়িতার। সারারাত মায়ের বুক চেপে বসে ছিল। আজও সে আতঙ্ক কাটেনি।ভোর ৫টার দিকে আবারো আল্লাহ আকবর ধ্বনি শোনা যায়। জঙ্গিরা চিৎকার করে বলছিল, ‘মা-বোনদের বলছি আমরা আল্লাহ’র পথে, আমরা শহীদ হচ্ছি।’পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে জঙ্গিরা চিৎকার করে বলে, তোমাদের সঙ্গে কেউ নেই। আমাদের সাঙ্গে আল্লাহ আছে। তোমাদের সন্তানরাও এক সময় আমাদের পথে আসবে। মালিহা বলেন, ওই রাতে ইন্টারনেট, মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক সবই ছিল। তবুও কোনো স্ট্যাটাস দেইনি। ভিডিও করিনি। ভয়ে না জানি আবার কোনো বিপদে পড়তে হয়।জয়িতার মা জানান, জয়িতা খুব ভয় পেয়েছে। ও আর বারান্দায় যাচ্ছে না। আতঙ্ক কাটতে কতো সময় যে লাগবে কে জানে।কল্যাণপুরে কমপক্ষে ২০টি স্কুল রয়েছে। এছাড়া কলেজ ও মাদরাসাও রয়েছে। রাতে গোলাগুলিতে হাজারো কোমলমতি শিক্ষার্থী ছিল আতঙ্কে। পরবর্তীতে অভিভাবক ও পুলিশের অনুরোধে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়। বুধবার সকালে জামেয়াদিনা ইসলামিয়া মাদরাসার শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট এলাকার জামে মসজিদের ঈমাম মাসুদুর রহমান জানান, সোমবার রাতে মসজিদের নামাজ পড়াতে গেলে নিরাপত্তাজনিত কারণে পুলিশ ফিরিয়ে দেয়। আজও ফিরিয়ে দেয়া হয়। ফজর নামাজ পড়াতে পারিনি। মাদরাসায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে গেছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক সবার মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে।উল্লেখ্য, গত সোমবার জাহাজ বিল্ডিংয়ের পঞ্চম তলায় সন্ধান মেলে জঙ্গি আস্তানার। রাতে পুলিশ-জঙ্গির মধ্যে থেমে থেমে দফায় দফায় চলে গুলি। অবশেষে সকাল ৫টা ৫১ মিনিট থেকে ৬টা ৫১ মিনিট পর্যন্ত ঢাকা মহানগর পুলিশের সোয়াত টিম, বোম ডিসপোজাল ইউনিট এবং ডিবি পুলিশ অপারেশন স্টার্ম-২৬ চালায়। ঘণ্টাব্যাপী সমন্বিত চেষ্টায় অভিযান শেষ হয়। এতে নিহত হয় ৯ সন্দেহভাজন জেএমবি সদস্য। এছাড়া হাসান নামে একজনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেলে নেয়া হয়। তার মাধ্যমে উঠে আসে নিহতদের নাম।ইতোমধ্যে তিন জঙ্গির পরিচয় জানিয়েছে পুলিশ। গত রাতে নিহত জঙ্গিদের পরিচয় চেয়ে অফিশিয়াল ফেসবুকে পোস্টও করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ।জেইউ/এএইচ/আরআইপি